খেলাধুলা

৩৯তম জন্মদিনের একদিন আগেই না ফেরার দেশে শাপুর জাদরান

আফগানিস্তান ক্রিকেটের উত্থানের অন্যতম পথিকৃৎ, সাবেক বাঁ-হাতি ফাস্ট বোলার শাপুর জাদরান আর নেই। দীর্ঘদিন দুরারোধ্য ব্যাধি হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস (এইচএলএইচ)-এর সঙ্গে লড়াই শেষে দিল্লির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুর মাত্র একদিন পরই ছিল তার ৩৯তম জন্মদিন।

Advertisement

শাপুরের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তার ছোট ভাই ঘামাই জাদরান, যিনি জানুয়ারি মাসে চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে নেওয়ার পর থেকে সবসময় তার সঙ্গে ছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, শাপুর এইচএলএইচ রোগের জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এটি এমন একটি বিরল রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ না করে উল্টো শরীরের ওপরই আক্রমণ শুরু করে।

২০০০ থেকে ২০১০-এর দশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আফগানিস্তানের অভাবনীয় উত্থানের অন্যতম মুখ ছিলেন শাপুর জাদরান। প্রায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার এই বাঁ-হাতি পেসার তার লম্বা রান-আপ, ঝাঁকড়া চুল আর আগ্রাসী বোলিং অ্যাকশনের জন্য সহজেই পরিচিত ছিলেন।

২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের হয়ে তিনি খেলেছেন ৪৪টি ওয়ানডে ও ৩৬টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এই সময়ে দুই ফরম্যাট মিলিয়ে নিয়েছেন ৮০টি আন্তর্জাতিক উইকেট।

Advertisement

বিশেষ করে ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে দারুণ পারফরম্যান্স করেছিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই আসরে ১০ উইকেট নিয়ে আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন শাপুর। সেটিই ছিল তার একমাত্র ওয়ানডে বিশ্বকাপ।

এছাড়া ২০১০, ২০১২, ২০১৪ ও ২০১৬- টানা চারটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। এই চার আসরে মোট ৯ ম্যাচ খেলে নেন ৯টি উইকেট।

মাঠের বাইরে শাপুর জাদরান অত্যন্ত উদার ও সহৃদয় মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আফগান ক্রিকেটের তরুণদের জন্য তিনি ছিলেন একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব।

বিশ্বসেরা লেগ স্পিনার রশিদ খানসহ অনেক তরুণ ক্রিকেটারই শাপুরকে নিজেদের অনুপ্রেরণা ও পরামর্শদাতা হিসেবে দেখতেন। অসুস্থতার সময় রশিদ খান, সাবেক অধিনায়ক আসগর আফগানসহ অনেক বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটার নিয়মিত তার খোঁজখবর নিয়েছেন।

Advertisement

সম্প্রতি আফগানিস্তান দল ভারত সফরে গেলে অধিনায়ক হাশমতুল্লাহ শহিদি, প্রধান কোচ রিচার্ড পাইবাস, ক্রিকেটার কাইস আহমেদ ও জিয়া শরিফ দিল্লির হাসপাতালে গিয়ে শাপুরকে দেখে আসেন।

শাপুরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি)। এক বিবৃতিতে বোর্ড জানায়, শাপুর জাদরান ছিলেন আফগান ক্রিকেটের ভিত্তি নির্মাণকারীদের একজন। তার নিষ্ঠা, সাহস ও অবদান দেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বোর্ড আরও জানায়, মাঠে তার সাফল্যের পাশাপাশি তিনি অসংখ্য তরুণ ক্রিকেটারের অনুপ্রেরণা ছিলেন। তার লড়াকু মানসিকতা ও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা নতুন প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।

আফগানিস্তানের লোগার প্রদেশে জন্ম নেওয়া শাপুর শৈশবে যুদ্ধের কারণে পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানের পেশোয়ারে চলে যান। সেখানকার আরবাব নিয়াজ স্টেডিয়াম ও জিমখানা মাঠে তার ক্রিকেটের হাতেখড়ি। শুরুতে তার স্বপ্ন ছিল পাকিস্তানের হয়ে খেলা। পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার শোয়েব আখতার ছিলেন তার আদর্শ।

কিন্তু সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার ইকবাল সিকান্দার আফগানিস্তানে কোচিং শুরু করলে শাপুর নিজ দেশেই ফিরে আসেন। ২০১২ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আফগানিস্তানের ট্রায়ালে ৫০০ ক্রিকেটার দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ট্রায়াল দেন এবং ধাপে ধাপে সেরা ৫০, পরে সেরা ২৫-এ জায়গা করে নেন। এরপরই জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন সত্যি হয়।

২০০৯ সালের আগস্টে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় শাপুর জাদরানের। অভিষেক ম্যাচেই ২৪ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারের সেরা ওয়ানডে বোলিং করেন তিনি।

২০১০ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি অভিষেকের পর ২০১৮ সালে দেরাদুনে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪০ রানে ৩ উইকেট নিয়ে টি-টোয়েন্টিতে নিজের সেরা বোলিং করেন।

আফগানিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে শাপুর জাদরানের নাম চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে তুলে আনতে যে কজন ক্রিকেটার অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। মাঠের আগ্রাসী বোলার, ড্রেসিংরুমের প্রেরণাদাতা এবং নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক- এই তিন পরিচয় নিয়েই ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন শাপুর জাদরান।

আইএইচএস/