জাতীয়

সংযোগ কাটা-জব্দের পরও গোপনে চলছে অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং

অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জিং বন্ধে রাজধানীর তেজগাঁও ও হাতিরঝিলে যৌথ অভিযান চালিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, সরঞ্জাম জব্দ এবং অটোরিকশা আটক করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকাশ্যে চার্জিং অনেকটাই কমলেও অলিগলি ও আড়ালে এখনো চলছে অবৈধ চার্জিং।

Advertisement

চালকদের দাবি, জীবিকার তাগিদে তারা গোপনে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে অটোরিকশা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একদিনের অভিযান কি অবৈধ চার্জিং বন্ধে কার্যকর হচ্ছে, নাকি কার্যক্রম শুধু স্থান বদল করেছে?

গত রোববার (৫ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টা থেকে সোমবার (৬ জুলাই) ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এ যৌথ অভিযান চালায় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগ। অভিযানে একাধিক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি পিকআপভর্তি বৈদ্যুতিক তার, মাল্টিপ্লাগ, সকেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। অটোরিকশাও আটক করা হয়। তবে অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পরই মাঠপর্যায়ের চিত্রে মিলেছে ভিন্ন বাস্তবতা।ফুটপাত দখল করে রাখা হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যান, ছবি: জাগো নিউজ

অভিযান শেষে বাইরে থেকে কার্যক্রমকে সফল মনে হলেও সরেজমিনের চিত্র ছিল ভিন্ন। নিয়ম অনুযায়ী চার্জিং পয়েন্ট বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ব্যাটারি চার্জের সংকটে ওই এলাকায় অটোরিকশার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অন্যদিনের তুলনায় সড়কের পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

Advertisement

অন্যদিনের মতো সড়কে প্রকাশ্যে অটোরিকশা বা ভ্যান চার্জ দিতে দেখা না গেলেও খোদ অটোরিকশা চালকদের দাবি, এখনো গোপনেই চলছে চার্জিং কার্যক্রম। জীবিকার তাগিদে তারা বিকল্প উপায়ে চার্জ দিয়ে অটোরিকশা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরেজমিনে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার ঢাকা পলিটেকনিক ল্যাবরেটরি স্কুল, ঢাকা পলিটেকনিক, বেগুনবাড়িয়া জামে মসজিদ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইল (বুটেক্স) সংলগ্ন সড়ক এবং আশপাশের এলাকায় দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে রিকশা ও ভ্যান রাখা রয়েছে। কোথাও কোথাও ফুটপাতও দখল করে রাখা হয়েছে, ফলে প্রধান সড়কে যান চলাচলেও কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।

আরও পড়ুন ঢাকার সড়কের ‘বিষফোড়া’ ব্যাটারিচালিত রিকশা

তবে এসব স্থানে প্রকাশ্যে অটোরিকশা চার্জিংয়ের দৃশ্য তেমন চোখে পড়েনি। ব্যতিক্রম ছিল বুটেক্স-সংলগ্ন একটি সড়ক, যেখানে প্রকাশ্যেই কয়েকটি অটোরিকশা চার্জ দিতে দেখা যায়। এছাড়া পাশের একটি সড়কে গাছের সঙ্গে স্থাপিত একটি চার্জিং পয়েন্টও দেখা গেছে। তবে সেটি তখন সচল ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তেজগাঁও এলাকার রিকশাচালক আজিজুল হক বলেন, অভিযানে ৫০টির মতো গাড়ি নিয়ে গেছে। চার্জিং পোর্ট কেটে দিয়ে গেছে। গাড়ি দেবো, না দেবো সেটা জানি না।

Advertisement

বর্তমান সড়কে চলাচল করা রিকশাগুলো চার্জের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চার্জ তো রিকশা মালিক দিয়ে দেন। যাদের চার্জিং পয়েন্ট কেটে দিয়েছে তারা এখন অন্য জায়গা থেকে গোপনে চার্জ দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন অবৈধ সংযোগে অটোরিকশা চার্জিং, পিকআপভর্তি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম জব্দ

তিনি বলেন, আমাদের প্রতিদিন রিকশার জন্য ৪০০ টাকা জমা দিতে হয়। আর চার্জ বাবদ ১০০ টাকা মালিককে দিতে হয়। মালিক নিজেই চার্জ দিয়ে দেন, আর রিকশা জমা দেওয়ার সময় আমাদের ৫০০ কোটি টাকা দিতে হয়।

একই এলাকায় কথা হয় প্যাডেল চালিত রিকশাচালক আশরাফুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখন সব রিকশা গোপনে চার্জ দিচ্ছে। বিভিন্ন অলি-গলির মধ্যে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। সেসব জায়গায় গোপনে চার্জ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন অটোচালকরা।

তিনি বলেন, যেখানে কোনো অফিস আছে তার সীমানার ভেতর থেকে লাইন করে তার টেনে গোপনে ১০০-১৫০-২০০-৫০০ রিকশা চার্জ দেন। দিনের বেলায়ও চার্জ দিতো। কিন্তু অভিযানের পর এখন দিনের বেলায় সেভাবে চার্জ দিতে দেখা যাচ্ছে না। অলিগলির ভেতরে বেশি চার্জ দিচ্ছে।

আরও পড়ুন অটোরিকশায় চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু

প্যাডেলচালিত রিকশা চালানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অটো রিকশাগুলো প্রচুর অ্যাকসিডেন্ট হয়। আর অ্যাকসিডেন্ট হলে অধিকাংশ মানুষ মারা যায়। আর যারা বাঁচবো তাদের হাড়গোড় ভেঙে যায়। এছাড়া অটোরিকশার কারণে দেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। সরকারের বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।

আশরাফুলের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলেন অটোরিকশাচালক মিজান। তিনি বলেন, ‘কি করবো, আমরা গরিব মানুষ। সরকারেরও ক্ষতি হচ্ছে, সেটা বুঝি। কিন্তু আমাদের তো খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে। তাই এখন গোপনেই চার্জ দিতে হচ্ছে।’

সরেজমিনে আশপাশের এলাকায় আরও ১০ থেকে ১২ জন অটোরিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। তাদের সবারই দাবি, অভিযানের পর প্রকাশ্যে চার্জ দেওয়া কমেছে, তবে জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন স্থানে গোপনে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন তারা।

আরও পড়ুন খসড়া নীতিমালা / বাধ্যতামূলক হচ্ছে অটোরিকশার নিবন্ধন-চালকের লাইসেন্স

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো রাজধানীর প্রধান সড়কে যানজট সৃষ্টি করছে। বিষয়টি নিয়ে সবাই আলোচনা করলেও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন না করে শুধু পুলিশকে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাজধানীর প্রধান সড়কে যানজট সৃষ্টি করছে। তবে এ সমস্যার দায় শুধু পুলিশের নয়। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব বিদ্যুৎ বিভাগ ও ডিপিডিসির। তারা সহযোগিতা চাইলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে পুলিশ। — ডিএমপির ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম

ডিসি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কোথায় রয়েছে, সে বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও ডিপিডিসি সবচেয়ে ভালো জানে। অবৈধ সংযোগ শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্বও তাদের। এ কাজে তারা পুলিশের সহযোগিতা চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

অভিযানের পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আমি লোক পাঠিয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, যেসব স্থানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, সেখানে আপাতত কোনো চার্জিং পয়েন্ট নেই। তবে আরও অনেক জায়গায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে।

আরও পড়ুন রিকশা-অটোরিকশা নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে: ডিএসসিসি প্রশাসক

তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিপিডিসি কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ডিপিডিসি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। ডিপিডিসি সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ও হচ্ছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হলে সমস্যাটা কমে আসবে।

কেআর/এমএএইচ/