বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সমাবর্তনের মঞ্চে তাঁদের মুখে থাকে স্বপ্নের হাসি, পরিবারের চোখে থাকে গর্বের দীপ্তি। কিন্তু সেই হাসির স্থায়িত্ব অনেকের ক্ষেত্রেই খুব বেশি দিন থাকে না। কয়েক মাস, কখনো কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি মেলে না।
Advertisement
কেউ সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন, কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যর্থ হন, আবার কেউ শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন। ফলে একটি প্রশ্ন আজ শুধু শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের নয়, পুরো জাতির সামনে দাঁড়িয়েছে—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সত্যিই কর্মসংস্থানের উপযোগী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, নাকি কেবল ডিগ্রিধারী নাগরিক?
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে উচ্চশিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারও আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু পরিমাণগত এই অগ্রগতির সঙ্গে গুণগত উন্নয়ন এবং কর্মবাজারের চাহিদার সমন্বয় একই গতিতে এগোয়নি। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনবলের অভাবের অভিযোগ করছে শিল্পখাত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এর অন্যতম কারণ হলো "স্কিল মিসম্যাচ"—অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত দক্ষতা এবং কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে অমিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বহু বছর ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটিকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। একই বাস্তবতা বাংলাদেশেও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
Advertisement
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা প্রাধান্য পায়। শ্রেণিকক্ষে তথ্য মুখস্থ করা, লিখিত পরীক্ষায় নম্বর অর্জন এবং নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করাই যেন শিক্ষার মূল লক্ষ্য। অথচ আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নিয়োগদাতারা শুধু জিপিএ দেখেন না; তাঁরা দেখেন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা, যোগাযোগের মান, প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Future of Jobs Report 2025 আরও গভীর একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে প্রায় ৯২ মিলিয়ন চাকরি বিলুপ্ত বা রূপান্তরিত হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান থাকবে, কিন্তু সেই কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিবেদনে বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতাকে আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সেই ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থী প্রস্তুত করছে?
সৎ উত্তর হলো—আংশিকভাবে, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়।
Advertisement
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা প্রাধান্য পায়। শ্রেণিকক্ষে তথ্য মুখস্থ করা, লিখিত পরীক্ষায় নম্বর অর্জন এবং নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করাই যেন শিক্ষার মূল লক্ষ্য। অথচ আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নিয়োগদাতারা শুধু জিপিএ দেখেন না; তাঁরা দেখেন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা, যোগাযোগের মান, প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। দেশে সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কাজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করছে, উপযুক্ত দক্ষতাসম্পন্ন জনবল খুঁজে পাওয়া কঠিন। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো দক্ষতা নিয়ে পর্যাপ্ত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে না।
একই চিত্র দেখা যায় উৎপাদনশিল্প, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, সাংবাদিকতা এবং উন্নয়ন খাতেও। বহু প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগের পর আবার মাসের পর মাস প্রশিক্ষণ দিতে বাধ্য হয়। এর অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মজীবনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত মানবসম্পদ বের হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতির জন্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করলে ভুল হবে। শিল্পখাত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি দৃশ্যমান দূরত্ব রয়েছে। অনেক দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে অংশ নেয়, যৌথ গবেষণা পরিচালনা করে এবং শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেয়। বাংলাদেশে এই সহযোগিতা এখনও সীমিত।
গবেষণার ক্ষেত্রেও আমাদের ঘাটতি স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে গবেষণার মান, উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখনও অপর্যাপ্ত। ফলস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার উচ্চশিক্ষার সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আজ একজন শিক্ষার্থী কয়েক সেকেন্ডে এআই ব্যবহার করে একটি প্রতিবেদন, প্রোগ্রামিং কোড কিংবা উপস্থাপনা তৈরি করতে পারে। তাই এখন মুখস্থবিদ্যার মূল্য দ্রুত কমছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হবে শিক্ষার্থীকে তথ্য দেওয়া নয়; বরং তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ, নৈতিক ব্যবহার এবং সৃজনশীল প্রয়োগ শেখানো। যে বিশ্ববিদ্যালয় এই পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হবে, তার পাঠ্যক্রম খুব দ্রুতই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। জার্মানির ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম-এ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নেন। সিঙ্গাপুরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত শিল্পখাতের সঙ্গে পরামর্শ করে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করে। ফিনল্যান্ডে সমস্যা-ভিত্তিক শিক্ষা ও আন্তঃবিষয়ক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় সেখানকার অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশেও এখন উচ্চশিক্ষাকে নতুনভাবে কল্পনা করার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা উচিত। শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে যুক্ত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল সাক্ষরতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষাকে সব বিষয়ে ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত-সরকারের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার থাকা উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষ থেকেই কর্মজীবনের প্রস্তুতি, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি, সাক্ষাৎকার দক্ষতা, পেশাগত নেটওয়ার্কিং এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পাবেন। শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা নয়, চাকরি সৃষ্টির মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য সমাবর্তনের আয়োজন কিংবা সনদ বিতরণের সংখ্যায় নয়; স্নাতকদের কর্মজীবনের সাফল্যে। কতজন শিক্ষার্থী অর্থবহ কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন, কতজন গবেষণা করছেন, কতজন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ছেন, কতজন সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধান করছেন—এসবই হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সূচক।
বাংলাদেশ এখন স্মার্ট অর্থনীতি, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের কথা বলছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। আর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রধান কারখানা হলো বিশ্ববিদ্যালয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয় সময়ের পরিবর্তনকে গ্রহণ করে, তবে সেখান থেকেই জন্ম নেবে আগামী দিনের বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও উদ্ভাবক। আর যদি বিশ্ববিদ্যালয় এখনও কেবল পরীক্ষার খাতা, নম্বর এবং ডিগ্রির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সমাবর্তনের কালো গাউনের আড়ালে আমরা ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকারত্বের এক নীরব সংকটকে লালন করব।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। সেই শ্রেণিকক্ষ যদি কর্মজীবনের বাস্তবতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে ডিগ্রি শুধু কাগজের সনদ থাকবে না; সেটিই হবে জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এএসএম