শেয়ারবাজারের নাম শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা একজন ট্রেডারের ছবি। কেউ মনে করেন, প্রতিদিন শেয়ার কিনে-বেচে যারা দ্রুত লাভ করেন, তারাই সবচেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করেন। আবার কেউ ভাবেন, কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পরপর শেয়ার কেনাবেচা করাই সফল হওয়ার একমাত্র উপায়। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। বিশ্বের অন্যতম সফল বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা, বহু দশকের গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজারের ইতিহাস বলছে—শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় লাভ সাধারণত করেন সেই ব্যক্তি, যিনি ভালো কোম্পানি বেছে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে বিনিয়োগ করে থাকেন।
Advertisement
বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট একবার বলেছিলেন, "The stock market is a device for transferring money from the impatient to the patient." অর্থাৎ, শেয়ারবাজার মূলত অধৈর্য মানুষের কাছ থেকে ধৈর্যশীল মানুষের কাছে সম্পদ স্থানান্তরের একটি মাধ্যম। এই কথাটি শুধু একটি অনুপ্রেরণামূলক উক্তি নয়; বরং গত কয়েক দশকের বাজারের বাস্তব অভিজ্ঞতার সারাংশ।
শেয়ারবাজারের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো এর ওঠানামা। প্রতিদিনই কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়বে, কিছু কমবে। কখনো অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কখনো রাজনৈতিক ঘটনা, কখনো সুদের হার, আবার কখনো শুধুই গুজবের কারণে বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। তাই প্রতিদিনের মূল্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নিলে অনেক সময় বিনিয়োগকারী আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ভয়ের সময় কম দামে বিক্রি করে দেন, আবার অতিরিক্ত আশাবাদের সময় বেশি দামে কিনে ফেলেন। এই আবেগই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা প্রতিদিনের ওঠানামাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। তারা মূলত কোম্পানির ব্যবসা, আয়, মুনাফা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং পরিচালনার মান বিবেচনা করে বিনিয়োগ করেন। যদি কোম্পানির ভিত্তি শক্তিশালী থাকে, তাহলে স্বল্পমেয়াদি মূল্য ওঠানামা তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা বড় হলে সেই কোম্পানির শেয়ারের মূল্যও সাধারণত বৃদ্ধি পায়।
Advertisement
শেয়ারবাজারে সফলতার সবচেয়ে বড় রহস্য কোনো গোপন ট্রেডিং কৌশল নয়। এটি হলো সঠিক কোম্পানি নির্বাচন, ধৈর্য, নিয়মিত বিনিয়োগ এবং সময়কে নিজের পক্ষে কাজ করতে দেওয়া। প্রতিদিন লাভের পেছনে ছোটা অনেক সময় মানসিক চাপ বাড়ায় এবং ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। কিন্তু ভালো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি, লভ্যাংশ এবং কম্পাউন্ডিং—এই তিনটি শক্তি একসঙ্গে কাজ করে সম্পদ গঠনের সুযোগ তৈরি করে।
এই বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত মতামত নয়, গবেষণার মাধ্যমেও প্রমাণিত হয়েছে। S&P Dow Jones Indices-এর নিয়মিত প্রকাশিত SPIVA (S&P Indices Versus Active) রিপোর্টে দেখা যায়, দীর্ঘ সময়ে অধিকাংশ সক্রিয় ফান্ড ম্যানেজারই বাজার সূচককে হারাতে পারেন না। অর্থাৎ, বারবার কেনাবেচা বা বাজারের সময় ধরার চেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হয় না। বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায় বিশ্বখ্যাত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান J.P. Morgan Asset Management-এর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাজারের সেরা কয়েকটি দিনের রিটার্ন যদি কোনো বিনিয়োগকারী মিস করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার মোট আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অর্থাৎ, বাজারে ধারাবাহিকভাবে উপস্থিত থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বাজারের প্রতিটি ওঠানামা ধরে লাভ করার চেষ্টা করার চেয়ে।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো কম্পাউন্ডিং বা চক্রবৃদ্ধি হারে সম্পদ বৃদ্ধি। ধরা যাক, আপনি ১ লাখ টাকা এমন একটি বিনিয়োগে রাখলেন যেখানে গড়ে বছরে ১২ শতাংশ হারে রিটার্ন পাওয়া যায়। প্রথম বছরের শেষে আপনার অর্থ হবে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা। দ্বিতীয় বছরে কিন্তু ১২ শতাংশ রিটার্ন শুধু মূল ১ লাখ টাকার ওপর নয়, বরং ১ লাখ ১২ হাজার টাকার ওপর হিসাব হবে। তৃতীয় বছরে আবার আগের বছরের মোট টাকার ওপর নতুন রিটার্ন যোগ হবে। এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থের বৃদ্ধি দ্রুততর হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় কম্পাউন্ডিং, যাকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন-এর সঙ্গে যুক্ত একটি জনপ্রিয় উক্তিতে "পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য" বলা হয়, যদিও গবেষকরা মনে করেন উক্তিটি তাঁর কিনা তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। তবে কম্পাউন্ডিংয়ের শক্তি নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
Advertisement
এই কম্পাউন্ডিংয়ের প্রভাব আরও বাড়ে যখন একজন বিনিয়োগকারী ক্যাশ ডিভিডেন্ড পুনরায় বিনিয়োগ করেন অথবা স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে অতিরিক্ত শেয়ার অর্জন করেন। তখন শুধু শেয়ারের মূল্যই বাড়ে না, শেয়ারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘ সময় পরে দেখা যায়, একই বিনিয়োগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান Vanguard দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগকারীদের জন্য কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা অনুযায়ী, নিয়মিত বিনিয়োগ, বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফোলিও এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ ধরে রাখার কৌশল অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। যদিও দেশের শেয়ারবাজারে অনেক সময় অস্বাভাবিক ওঠানামা, গুজব বা তারল্য সংকট দেখা যায়, তবুও যেসব কোম্পানির ব্যবসা শক্তিশালী, নিয়মিত মুনাফা করে এবং ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ দেয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল ফল দিতে পারে। তাই শুধুমাত্র শেয়ারের দাম বাড়ছে দেখে বিনিয়োগ না করে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, আয়, ঋণের পরিমাণ, পরিচালনা পর্ষদের সুনাম এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা জরুরি।
অনেক বিনিয়োগকারী একটি সাধারণ ভুল করেন। কোনো শেয়ারের দাম ১০ বা ১৫ শতাংশ বাড়তেই তারা দ্রুত বিক্রি করে দেন। পরে সেই অর্থ দিয়ে আরেকটি শেয়ার কেনেন, যেটি হয়তো সাময়িকভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রথম কোম্পানিটির ব্যবসা আরও শক্তিশালী হতে থাকে এবং কয়েক বছর পর তার মূল্য দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যায়। অথচ তাড়াহুড়ো করে বিক্রি করার কারণে সেই দীর্ঘমেয়াদি লাভ থেকে তারা বঞ্চিত হন। অন্যদিকে, নতুন কেনা শেয়ারটি প্রত্যাশিত ফল দেয় না। ফলে অল্প লাভের আশায় বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।
অবশ্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ মানেই যে যেকোনো শেয়ার কিনে বছরের পর বছর বসে থাকা—এমন ধারণাও ভুল। সফল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ভালো কোম্পানি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে কোম্পানির ব্যবসার ধরন, বিক্রয় বৃদ্ধি, মুনাফা, নগদ প্রবাহ, ঋণের অবস্থা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সব অর্থ একটি কোম্পানিতে না রেখে বিভিন্ন ভালো খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কমানো যায়।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি বড় সুবিধা রয়েছে। বাজার প্রতিদিন দেখলে বিনিয়োগকারীর মধ্যে ভয়, লোভ এবং উদ্বেগ বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে প্রতিদিনের ওঠানামা নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা কম হয়। এতে আবেগের পরিবর্তে যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান Fidelity Investments-এর একটি বহুল আলোচিত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যেসব গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে দীর্ঘদিন কোনো লেনদেন হয়নি—অনেক ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক ভালো রিটার্ন পেয়েছেন। কারণ তারা বাজারের প্রতিটি ওঠানামায় আবেগপ্রবণ হয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। যদিও এটি একটি অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে পরিচিত এবং আনুষ্ঠানিক গবেষণাপত্র নয়, তবুও এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে শেয়ারবাজারে সফলতার সবচেয়ে বড় রহস্য কোনো গোপন ট্রেডিং কৌশল নয়। এটি হলো সঠিক কোম্পানি নির্বাচন, ধৈর্য, নিয়মিত বিনিয়োগ এবং সময়কে নিজের পক্ষে কাজ করতে দেওয়া। প্রতিদিন লাভের পেছনে ছোটা অনেক সময় মানসিক চাপ বাড়ায় এবং ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। কিন্তু ভালো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি, লভ্যাংশ এবং কম্পাউন্ডিং—এই তিনটি শক্তি একসঙ্গে কাজ করে সম্পদ গঠনের সুযোগ তৈরি করে।
তাই শেয়ারবাজারে যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে চান, তাহলে শুধু ট্রেডার হওয়ার চেষ্টা না করে একজন সচেতন বিনিয়োগকারী হওয়ার চেষ্টা করুন। বাজারের প্রতিটি গুজবে কান না দিয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিন, ভালো কোম্পানির ওপর আস্থা রাখুন এবং সময়কে আপনার সবচেয়ে বড় সহযোগী হিসেবে কাজ করতে দিন। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শেয়ারবাজারে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পুরস্কৃত হন সেই মানুষটিই, যিনি ধৈর্য হারান না।
লেখক: করপোরেট ট্রেইনার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
এইচআর/এএসএম