এই মানসিকতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ বড় অন্যায় অনেক সময় ছোট ছোট নীরবতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো অন্যায় ব্যবস্থা একদিনে শক্তিশালী হয়নি। বরং সাধারণ মানুষের নীরবতা, ভয় এবং উদাসীনতা ধীরে ধীরে তাকে শক্তিশালী করেছে।
Advertisement
ভয়ও বিবেককে নীরব করে দেওয়ার একটি শক্তিশালী কারণ। অনেক মানুষ সত্য জানেন, অন্যায় বুঝতে পারেন, কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস পান না। চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিক চাপ, ক্ষমতাবান মানুষের প্রতিক্রিয়ার ভয়, অনেক সময় মানুষকে নীরব করে রাখে।
তবে ভয়ের কারণে দীর্ঘদিন নীরব থাকা শুধু সমাজের ক্ষতি করে না, ব্যক্তির নিজের আত্মবিশ্বাসকেও দুর্বল করে। কারণ মানুষ যখন বারবার নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে যায়, তখন একসময় সে নিজের ভেতরের সেই কণ্ঠস্বর শুনতেই ভুলে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিক্ষার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা অনেক সময় শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল, ভালো চাকরি এবং অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষের মধ্যে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের প্রতি সম্মান তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
Advertisement
একজন মানুষ কত বড় পদে আছেন, কত অর্থ উপার্জন করেন, কত জ্ঞান অর্জন করেছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি সেই জ্ঞান ও ক্ষমতা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন। কারণ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার অর্জনে নয়, তার বিবেকের ব্যবহারে প্রকাশ পায়।
আরও পড়ুন মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট: বিবেকের নীরবতাতাই বিবেককে জাগিয়ে রাখতে হলে শুধু আইন বা শাস্তির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে সত্য বলা সম্মানের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সাহসের এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
একটি দেশের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, সামরিক ক্ষমতা বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে না। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার মানুষের নৈতিক ভিত্তির ওপর, বিশেষ করে যারা রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, তাদের বিবেকের ওপর।
কারণ ক্ষমতা নিজে ভালো বা খারাপ নয়, ক্ষমতার ব্যবহারই তাকে অর্থবহ করে তোলে। একজন নেতা যখন ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করেন, তখন সেই ক্ষমতা আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন ক্ষমতা ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রতিহিংসা বা সুবিধা রক্ষার হাতিয়ার হয়ে যায়, তখন তা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
Advertisement
রাষ্ট্র পরিচালনায় বিবেকের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। একজন নীতিনির্ধারক যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার সামনে শুধু পরিসংখ্যান বা রাজনৈতিক হিসাব থাকা যথেষ্ট নয়, তার সামনে থাকতে হয় সাধারণ মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ এবং আশা। একটি নীতির প্রভাব কেবল কাগজে লেখা সংখ্যায় প্রকাশ পায় না, তা প্রকাশ পায় মানুষের জীবনে।
একজন প্রশাসকের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা থাকে। সেই ক্ষমতা যদি ন্যায়বোধ দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়। কিন্তু যদি ক্ষমতা বিবেকহীন হয়ে পড়ে, তাহলে একই প্রতিষ্ঠান মানুষের নিরাপত্তার পরিবর্তে ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
একই কথা প্রযোজ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রেও। একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান বিতরণ করেন না, তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা গড়ে দেন। একজন ব্যবসায়ী শুধু পণ্য বিক্রি করেন না, তিনি সমাজের প্রতি একটি দায়িত্ব বহন করেন। একজন সাংবাদিক শুধু খবর প্রকাশ করেন না, তিনি সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার নৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু যখন প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত সুবিধা, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বা ক্ষমতার চাপ মানুষের নৈতিক দায়িত্বকে ছাপিয়ে যায়, তখন সমাজের ভেতরে একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন শুরু হয়। মানুষ তখন অন্যায় দেখে, কিন্তু প্রতিবাদ করে না। দুর্নীতি দেখে, কিন্তু নীরব থাকে। অবিচার দেখে, কিন্তু ভাবে, ‘এটি আমার সমস্যা নয়।’
এই নীরবতাই ধীরে ধীরে একটি জাতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে ওঠে।
চলবে...
রহমান মৃধাগবেষক ও লেখকসাবেক ফার্মাসিউটিক্যাল নির্বাহী, সুইডেন
এমআরএম