বিশ শতকের বেশিরভাগ সময় এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বৈশ্বিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় পশ্চিমা বিশ্বের এক ধরনের স্পষ্ট প্রাধান্য ছিল। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী বা গবেষকদের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি কিংবা ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী গবেষণাগারগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই চেনা চিত্রে এক বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে একক কোনো অঞ্চলের বদলে সামগ্রিকভাবে এশিয়া হয়ে উঠছে উদ্ভাবনের নতুন ভরকেন্দ্র।
Advertisement
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা এই রূপান্তরকে আরও স্পষ্ট করেছে এবং আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বৈশ্বিক শক্তির ভরকেন্দ্র এখন পশ্চিম থেকে নতুন গন্তব্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। বিশ্বখ্যাত রসায়নবিদ এবং ২০২৫ সালের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ড. ওমর ইয়াঘি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বার্কলে) ছেড়ে চীনের টিসিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। তিনি সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রসায়ন ও বস্তুবিজ্ঞানের সমন্বয়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এআই কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (AIMATRY)-এর নেতৃত্ব দেবেন। এই ঘটনাকে অনেকেই বৈশ্বিক মেধা প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হিসেবে দেখছেন, যা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নেতৃত্বের ভারসাম্য পশ্চিম থেকে পূর্বে পরিবর্তনের একটি বড় সংকেত।
পশ্চিমা বিশ্বের ‘ধাক্কা’ বনাম এশিয়ার ‘টান’মেধাবীদের এই স্থানান্তরের পেছনে মূলত দুটি দিক কাজ করছে—পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ নীতিগত ও অর্থায়ন সংকট (Push Factor) এবং এশীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ ও নীতিগত সুযোগ (Pull Factor)।
বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং মেধার ভরকেন্দ্র এখন বিশ্ব মানচিত্রে পুনর্লিখিত হচ্ছে। এশীয় দেশগুলো এখন আর কেবল পশ্চিমা প্রযুক্তির ভোক্তা বা উৎপাদক নেই, তারা নিজেরাই এখন নতুন নতুন প্রযুক্তির মূল উদ্ভাবক হয়ে উঠছে। আর তাই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ আর একক কোনো শক্তির হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক উদ্ভাবনের নেতৃত্ব ক্রমেই আরও বহুকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
Advertisement
গত কয়েক বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু দেশে বিজ্ঞান ও গবেষণার সরকারি অর্থায়নে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে। শীর্ষ মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট সংকুচিত হওয়া এবং কঠোর অভিবাসন নীতির মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক গবেষকদের সেখানে কাজ করার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করছে। বিপরীতে, এশিয়ার উদীয়মান এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পেছনে নিজেদের জিডিপির একটি বড় অংশ ব্যয় করছে। ফলে বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীরা এখন এশিয়ায় আরও বড় গবেষণা তহবিল, উন্নত অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনার সুযোগ পাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ‘ওয়ার্ক স্টেশন’ বা কর্মস্থল পছন্দের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে।
বৈজ্ঞানিক পুনর্বিন্যাসের নতুন মানচিত্রসাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্তর্জাতিক সূচকগুলো দেখায়, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে এশিয়ার দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে এবং তারা পশ্চিমা বিশ্বের সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে:
• চীন: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক র্যাংকিং বা সূচকগুলোতে এখন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য স্পষ্ট। বিশেষ করে খ্যাতনামা ‘নেচার ইনডেক্স’ এবং ‘হাইলি সাইটেড রিসার্চার্স’ তালিকায় চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও ল্যাবগুলো এখন সবার ওপরে অবস্থান করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ (CAS)-এর কথা। সারা বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও মানসম্মত গবেষণাপত্র তৈরির ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানটি এখন শীর্ষস্থান দখল করে আছে, যা এক যুগ আগেও কারও কল্পনাতে ছিল না। গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) চীনের ধারাবাহিক ও বিশাল বিনিয়োগই তাদের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। ফলে এআই গবেষণা, বিজ্ঞান সাময়িকী এবং আধুনিক বস্তুবিজ্ঞানে (মেটেরিয়াল সায়েন্স) চীনের এই দ্রুত অগ্রগতি এখন বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। রোবট ও ইলেকট্রনিক ভেহিকল শিল্পের পর এআই’তেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
• দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান: গলোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে দক্ষিণ কোরিয়া এখন অন্যতম শীর্ষ উদ্ভাবনী দেশ, যার মূল চালিকাশক্তি স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্সের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টদের গড়া সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম। অন্যদিকে, তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC) এককভাবে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মাইক্রোচিপ উৎপাদন করে বৈশ্বিক প্রযুক্তির স্নায়ু কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করছে।
Advertisement
• জাপান ও সিঙ্গাপুর: জাপান তাদের 'সোসাইটি ৫.০' (Society 5.0) ভিশন এবং রাষ্ট্রীয় চিপ স্ট্র্যাটেজি 'র্যাপিডাস' (Rapidus)-এর মাধ্যমে প্রযুক্তির বাজারে নিজেদের নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর অত্যন্ত আকর্ষণীয় তহবিল ও অনুকূল প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের মাধ্যমে বায়োটেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত গবেষণার জন্য বিশ্বসেরা মেধাবীদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
• ভারত: মহাকাশ গবেষণায় ইসরো (ISRO)-এর সাশ্রয়ী ও সফল অভিযান, শক্তিশালী ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI) এবং জাতীয় 'এআই মিশন'-এর মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক প্রযুক্তি অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান দ্রুত শক্তিশালী করছে।
• রাশিয়া, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া: ভূরাজনৈতিক নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও রাশিয়া মহাকাশ গবেষণা, নিউক্লিয়ার এনার্জি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে তুরস্ক এভিয়েশন ও আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রযুক্তি শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান জোরদার করছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে যৌথ বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্ক এবং ক্লিন এনার্জি প্রজেক্টগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। এশিয়ার আরেক দেশ মালয়েশিয়ার অর্জন বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ঈর্ষণীয়। পাশাপাশি ইরান ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোও প্রযুক্তির বৈশ্বিক মানচিত্রে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান জানান দিয়ে যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের প্রভাব ও বহুকেন্দ্রিক উদ্ভাবনযে অঞ্চল বা দেশগুলো আগামী দিনে এআই, সেমিকন্ডাক্টর এবং জলবায়ু প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে। পূর্ব এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর এবং এআই শিল্পের সাম্প্রতিক উল্লম্ফন মূলত নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার কথাই প্রমিাণ করে।
তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এশিয়ার দেশগুলোর উত্থান মানেই যে পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আকস্মিক পতন ঘটছে, তা কিন্তু নয়; বরং এমন ভাবনা অমূলক। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঠামো এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী, যার কারণে দীর্ঘসময় তারা একটি দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে। তাছাড়া ইউরোপের দেশগুলো প্রযুক্তিগত ও নীতিগতভাবে বেশ ঐক্যবদ্ধ এবং তাদের মধ্যে অনেক সমন্বিত পদক্ষেপ রয়েছে। এর বিপরীতে, এশিয়ার দেশগুলো প্রায়শই একে অপরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে। ভবিষ্যতে এই আঞ্চলিক উত্তেজনা যদি কোনোভাবে সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই সমস্ত অর্জন ও অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে। তাই বৈশ্বিক উদ্ভাবনের এই বহুকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক যুগে টিকে থাকতে এখনই সময় এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার এবং পারস্পরিক ক্ষোভ ও সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজার।
ড. ওমর ইয়াঘির মতো বিজ্ঞানীদের এশিয়ায় পাড়ি জমানো বিশ্বকে এই স্পষ্ট বার্তাই দেয় যে—বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং মেধার ভরকেন্দ্র এখন বিশ্ব মানচিত্রে পুনর্লিখিত হচ্ছে। এশীয় দেশগুলো এখন আর কেবল পশ্চিমা প্রযুক্তির ভোক্তা বা উৎপাদক নেই, তারা নিজেরাই এখন নতুন নতুন প্রযুক্তির মূল উদ্ভাবক হয়ে উঠছে। আর তাই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ আর একক কোনো শক্তির হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক উদ্ভাবনের নেতৃত্ব ক্রমেই আরও বহুকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক এইচআর/এএসএম