আবেগকে সাময়িকভাবে দূরে রেখে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এই লেখাটি পড়ার অনুরোধ রইল। স্পেন ও আর্জেন্টিনার শক্তি, কৌশল, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং ফাইনালের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে পাঠকরাই বুঝতে পারবেন—কোন দল কোথায় এগিয়ে এবং কোন ব্যবধানগুলো শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করতে পারে। আমার বিশ্বাস, ফাইনালে যে দল নিজেদের মৌলিক শক্তিগুলো সবচেয়ে সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারবে এবং প্রতিপক্ষের প্রধান সুবিধাগুলো নিষ্ক্রিয় করতে পারবে, বিশ্বকাপের শিরোপা শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই উঠবে।
Advertisement
যেসব কারণে স্পেন এগিয়েবর্তমান স্পেন ২০১০ সালের টিকিটাকানির্ভর ঐতিহ্য পুরোপুরি অনুকরণ করছে না; বরং সেই ফুটবল-ডিএনএর সঙ্গে যুক্ত করেছে নিয়ন্ত্রিত আক্রমণ, পজিশনাল শৃঙ্খলা, তারুণ্যের গতি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। ফলে এই দলটি একই সঙ্গে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, আক্রমণের গতি বাড়াতে পারে এবং প্রয়োজন হলে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় বল থেকে দূরে রাখতে পারে।
স্পেনের অন্যতম বড় শক্তি তাদের সৃজনশীল ও অভিযোজনক্ষম কৌশল। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রতিভা যেমন উচ্চমানের, তেমনি কোচিং পরিকল্পনাও অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত। ম্যাচের ধরন, প্রতিপক্ষের শক্তি এবং মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা খেলার গতি ও আক্রমণের দিক বদলাতে পারে।
টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাসও তাদের বড় শক্তি। ধারাবাহিক সাফল্য দলকে শুধু আত্মবিশ্বাসীই করে না, কঠিন মুহূর্তে নিজেদের পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখতেও শেখায়। সব মিলিয়ে বর্তমান স্পেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, সংগঠিত, রেজিলিয়েন্ট এবং কৌশলগতভাবে পরিণত দলগুলোর একটি।
Advertisement
তারুণ্য স্পেনের বড় সম্পদ। লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো দুই উইঙ্গার মাঠের দুই প্রান্তে গতি, ড্রিবলিং, ওয়ান-অন-ওয়ান দক্ষতা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করেন। প্রতিপক্ষ একটি দিক বন্ধ করতে গেলে অন্য প্রান্ত খুলে যায়। এই দ্বিমুখী আক্রমণ স্পেনকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় আক্রমণাত্মক দলগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
স্পেনের মাঝমাঠও অসাধারণভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। রদ্রি, পেদ্রি, দানি ওলমো এবং তাদের সহযোগীরা আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেন। তারা শুধু পাস দেন না; জায়গা তৈরি করেন, প্রতিপক্ষের প্রেস ভাঙেন, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং বল হারানোর পর দ্রুত সেটি পুনরুদ্ধার করেন।
ইয়ামাল–ওলমো–পেদ্রি–পোরো–রদ্রিদের পারস্পরিক সংযোগ স্পেনের খেলার অন্যতম ভিত্তি। এই খেলোয়াড়েরা পাসিং ত্রিভুজ তৈরি করেন, লাইনের মাঝখানে জায়গা খুঁজে নেন এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে বল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ কার্যকর ভূমিকা রাখেন।
রক্ষণভাগেও স্পেন অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রতিপক্ষের expected goals বা xGA ম্যাচপ্রতি গড়ে মাত্র ০.৩১—যা প্রমাণ করে তারা শুধু কম গোল খাচ্ছে না; বরং প্রতিপক্ষকে ভালো মানের সুযোগ তৈরিই করতে দিচ্ছে না। এটি একটি সংগঠিত রক্ষণের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিসংখ্যানগত নির্দেশক।
Advertisement
বল হারানোর পর স্পেনের কাউন্টার-প্রেসিং অত্যন্ত কার্যকর। তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বল পুনরুদ্ধার করতে পারে। প্রায় ১৩ সেকেন্ডের মধ্যেই পুনরায় বলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সক্ষমতা তাদের প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই তা থামিয়ে দেয়।
স্পেনের ফুলব্যাকরাও শুধু রক্ষণে সীমাবদ্ধ নন। কুকুরেয়া, পোরো এবং কুবার্সির মতো খেলোয়াড়রা নিয়মিত আক্রমণে উঠে উইঙ্গারদের সহায়তা করেন। তাদের ওভারল্যাপিং দৌড় স্পেনকে মাঠের প্রস্থ ব্যবহার করতে সাহায্য করে এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে সংখ্যাগত চাপ সৃষ্টি করে। তাদের বিকল্প বেঞ্চও শক্তিশালী। মূল একাদশের কোনো খেলোয়াড় ক্লান্ত হলে বা কৌশল বদলানোর প্রয়োজন হলে বেঞ্চ থেকে প্রায় একই মানের খেলোয়াড় নামানো সম্ভব। বদলি খেলোয়াড়দের গোল ও অ্যাসিস্ট করার ধারাবাহিকতা স্পেনকে ম্যাচের শেষ পর্যায়েও বিপজ্জনক রাখে।
স্পেন বল নিয়ে যেমন ধৈর্যশীল, বল ছাড়া খেলতেও তেমনি সংগঠিত। তারা পজেশন হারালেই অস্থির হয়ে পড়ে না; বরং নির্দিষ্ট কাঠামোয় দ্রুত ফিরে যায়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের প্রধান খেলোয়াড়কে নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রেও তারা অত্যন্ত দক্ষ। দলটি খুব কম আনফোর্সড এরর করে। বড় ম্যাচে ছোট ভুলই অনেক সময় ফল নির্ধারণ করে। স্পেনের পাসিং শৃঙ্খলা, অবস্থানগত সচেতনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান তাদের সেই ঝুঁকি থেকে অনেকটাই রক্ষা করে।
টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাসও তাদের বড় শক্তি। ধারাবাহিক সাফল্য দলকে শুধু আত্মবিশ্বাসীই করে না, কঠিন মুহূর্তে নিজেদের পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখতেও শেখায়। সব মিলিয়ে বর্তমান স্পেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, সংগঠিত, রেজিলিয়েন্ট এবং কৌশলগতভাবে পরিণত দলগুলোর একটি।
যেসব কারণে আর্জেন্টিনা এগিয়েআর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের অভিজ্ঞতা। এই দলে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং অসংখ্য বড় নকআউট ম্যাচ খেলেছেন। তাঁরা জানেন কীভাবে চাপ সামলাতে হয়, কীভাবে প্রতিকূল মুহূর্তে টিকে থাকতে হয় এবং কীভাবে একটি সুযোগ থেকেই ম্যাচের ফল বের করে আনতে হয়।
তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ অবশ্যই লিওনেল মেসি—সর্বশ্রেষ্ঠদেরও শ্রেষ্ঠ একজন ফুটবলার। মেসি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি পুরো ম্যাচে তুলনামূলকভাবে নীরব থেকেও একটি পাস, একটি ড্রিবল, একটি ফ্রি-কিক কিংবা একটি শট দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ম্যাচ বের করে আনার ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনা অন্যতম সেরা দল। তাদের আক্রমণ সব সময় কাঠামোবদ্ধ পাসিংয়ের ওপর নির্ভর করে না; কখনও মেসির সৃজনশীলতা, কখনো আলভারেজের দৌড়, কখনো এনজোর দীর্ঘ পাস, আবার কখনো দে পলের নিরলস পরিশ্রম থেকে সুযোগ তৈরি হয়।
গত পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম সফল দল আর্জেন্টিনা। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের মানসিকভাবে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তারা জানে, বড় টুর্নামেন্টে সব ম্যাচে সুন্দর ফুটবল খেলতে হয় না; বরং প্রয়োজনের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
মেসিকে উইঙ্গার বা কিছুটা মুক্ত ভূমিকায় ব্যবহার করলে আর্জেন্টিনা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তখন তিনি মাঝমাঠের গভীরে আটকে না থেকে ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে শট, থ্রু-পাস অথবা কাট-ব্যাক দিতে পারেন।
সেটপিস আর্জেন্টিনার বড় শক্তি। কর্নার, ফ্রি-কিক কিংবা বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই তারা বিপজ্জনক। মেসির ডেলিভারি, এনজোর শট এবং রোমেরোদের হেডিং ক্ষমতা স্পেনের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
মাঠের মধ্যেই তাৎক্ষণিক কৌশল পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনা অত্যন্ত দক্ষ। প্রতিপক্ষ অনুযায়ী তারা ফরমেশন বদলাতে পারে, অতিরিক্ত মিডফিল্ডার নামাতে পারে, দুই ফরোয়ার্ড ব্যবহার করতে পারে কিংবা নিচে নেমে কাউন্টার আক্রমণে যেতে পারে।
নকআউট ম্যাচে আর্জেন্টিনা বিশেষভাবে কৌশলী। তারা খেলার সৌন্দর্যের চেয়ে ফলকে অগ্রাধিকার দিতে জানে। ম্যাচ ধীর করা, প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করা, শারীরিক লড়াই বাড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করার মানসিকতা তাদের রয়েছে। ম্যাচ পেনাল্টি শুটআউটে গেলে আর্জেন্টিনা মানসিকভাবে এগিয়ে থাকবে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের উপস্থিতি এবং আগের সাফল্য দলটিকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে।
রক্ষণভাগে আর্জেন্টিনা শারীরিকভাবে শক্তিশালী। বক্সের ভেতরে বল ক্লিয়ার করা, হেডিং, ট্যাকল এবং এক-অন-এক লড়াইয়ে তাদের ডিফেন্ডাররা খুবই কার্যকর। তারা নানা উপায়ে গোল করতে পারে—সংগঠিত আক্রমণ, কাউন্টার আক্রমণ, সেটপিস, পেনাল্টি, দূরপাল্লার শট এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। এই বহুমাত্রিক গোল করার ক্ষমতাই আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিপজ্জনক রাখে।
ম্যাচটি কেমন হতে পারেআমার ধারণা, স্পেন সেমিফাইনালের কৌশল থেকে খুব বেশি সরে আসবে না। তারা নিয়ন্ত্রিত পজেশন, পজিশনাল প্লে, দ্রুত ছোট পাস এবং প্রয়োজনমতো আক্রমণের গতি বাড়ানোর সমন্বয়ে খেলবে। স্পেনের প্রথম লক্ষ্য হবে মেসির কাছে বল পৌঁছানোর পথ সংকুচিত করা। শুধু মেসিকে মার্ক করলেই হবে না; তাঁকে পাস দেওয়ার রাস্তাগুলো বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সেটপিসে সতর্ক থাকতে হবে এবং মেসি ও এনজোর দূরপাল্লার শট ব্লক করতে হবে।
এই কাজগুলো করতে পারলে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। আর্জেন্টিনা গত কয়েকটি ম্যাচে প্রথম ৫০ থেকে ৬০ মিনিট তুলনামূলক কম গতিতে খেলেছে। এতে প্রতিপক্ষকে আক্রমণে উঠে বেশি শক্তি খরচ করতে দেওয়া হয়। এরপর শেষ ২০ থেকে ৩০ মিনিটে আক্রমণের গতি বাড়িয়ে ক্লান্ত প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে এই কৌশল আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ স্পেন অযথা উন্মত্ত আক্রমণে যায় না। তারা নিয়ন্ত্রিতভাবে আক্রমণ করে, বল নিজেদের কাছে রাখে এবং খুব সহজে স্ট্যামিনা হারায় না।
ফলে আর্জেন্টিনাকে ভিন্ন পরিকল্পনা নিতে হতে পারে। আমার ধারণা, তারা তুলনামূলক দ্রুত এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে। একই সঙ্গে সময়মতো খেলোয়াড় পরিবর্তন করে ম্যাচের শেষ পর্যন্ত এনার্জি ধরে রাখার চেষ্টা করবে। কিন্তু এখানেই একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। আর্জেন্টিনার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় বয়সের দিক থেকে অভিজ্ঞ হলেও দীর্ঘ সময় উচ্চগতির ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে তাঁদের সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
দ্রুতগতির ফুটবল শুরু থেকেই খেলতে গেলে শেষ ১৫ থেকে ২০ মিনিটে এনার্জি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
আমার ধারণা, ম্যাচের এই পর্যায়েই স্পেন ব্যবধান তৈরি করতে পারে। আর্জেন্টিনার গতি কমে এলে স্পেন বলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে, জায়গা তৈরি করবে এবং গোল বের করে আনবে। এই কারণেই আমার পূর্বাভাস—স্পেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ম্যাচ জিততে পারে। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
মেসি, এমবাপে এবং গোল্ডেন বুটের শেষ সমীকরণতৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স কার্যত গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তাঁকে সবার সামনে নিয়ে গেছে। ফাইনালের আগে এমবাপের নামের পাশে ১০ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট, আর মেসির রয়েছে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। ফলে গোল্ডেন বুটের ভাগ্য এখন আর পুরোপুরি মেসির হাতে নেই। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে তাঁকে প্রায় অলৌকিক কিছু করে দেখাতে হবে।
সরাসরি এমবাপেকে অতিক্রম করতে হলে মেসির অন্তত হ্যাটট্রিক প্রয়োজন। দুটি গোল করলে দুজনের গোলসংখ্যা সমান হবে; তখন অ্যাসিস্ট ও অন্যান্য টাইব্রেকারের হিসাব সামনে আসবে। তাই দুটি গোলের সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট মেসিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিতে পারে। কিন্তু স্পেনের মতো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী রক্ষণভাগের বিপক্ষে এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে মেসির ক্ষেত্রে “কঠিন” মানেই “অসম্ভব”—এ কথা বলা যায় না। ফুটবল বিশ্ব তাঁর কাছ থেকে বহুবার অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখেছে। এখানে এক অদ্ভুত কাকতালীয় মিলও রয়েছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এমবাপে ৮ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। মেসি করেছিলেন ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট। মাত্র একটি গোলের ব্যবধানেই এমবাপে মেসিকে পেছনে ফেলেছিলেন।
চার বছর পর আবারও কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আবারও কি সামান্য একটি গোল, কিংবা একটি গোল-অ্যাসিস্টের ব্যবধানেই এমবাপে দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতে নেবেন? যদি তা-ই হয়, তাহলে বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেও মেসির ক্যারিয়ারে গোল্ডেন বুট না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে যাবে। আর সেই আক্ষেপের সামনে টানা দুই আসরেই দাঁড়িয়ে থাকবে একই নাম—কিলিয়ান এমবাপে। তবে গল্প এখানেই শেষ নয়।
গোল্ডেন বুট হাতছাড়া হলেও মেসির সামনে আরও বড় অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। ৩৯ বছর বয়সে অসাধারণ ফুটবল খেলে তিনি বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলে এবং ফাইনালে মেসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে তাঁর তৃতীয় গোল্ডেন বল জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হবে। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন না হলেও পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর প্রভাব, গোল, অ্যাসিস্ট এবং নেতৃত্ব তাঁকে পুরস্কারের দৌড়ে রাখবে।
এই সাফল্য তাঁকে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরেরও অন্যতম শক্তিশালী দাবিদারে পরিণত করতে পারে। যদিও ব্যালন ডি’অর বিশ্বকাপের সঙ্গে সরাসরি দেওয়া কোনো পুরস্কার নয়; এটি পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্স বিবেচনায় দেওয়া হয়। তবু মেসি যদি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেন, গোল্ডেন বল জেতেন এবং টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে শেষ করেন, তাহলে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে নবম ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে তিনিই হয়ে উঠবেন সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।
এখন সব হিসাব, সব পরিসংখ্যান এবং সব সম্ভাবনা এসে ঠেকেছে একটি ম্যাচে।
একদিকে এমবাপের দ্বিতীয় গোল্ডেন বুটের হাতছানি, অন্যদিকে মেসির সম্ভাব্য দ্বিতীয় বিশ্বকাপ, তৃতীয় গোল্ডেন বল এবং ইতিহাসের নবম ব্যালন ডি’অরের স্বপ্ন। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে নাটকীয় সমাপ্তি আর কী হতে পারে? ৩৯ বছর বয়সেও মেসির জাদুকরী ফুটবল দেখতে চায় তাঁর অগণিত ভক্ত। আর সেখান থেকেই মেসির প্রতি আমার এই খোলা চিঠি।
প্রিয় মেসিপ্রিয় লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচিত্তিনি,তোমার পুরো নামটি হয়তো বিশ্বের সবাই জানে না, কিন্তু তোমার ফুটবলশিল্পের জাদু জানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তের মানুষ।আরও একবার সেই জাদু দেখাও।মোহিত করো শত্রু-মিত্র, শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, গরিব-ধনী, দুঃখী-সুখী—ধর্ম, বর্ণ, দেশ ও মহাদেশের সব বিভাজন পেরিয়ে সবাইকে।৩৯ বছর বয়সেও তুমি অধরা, দুর্বার, দুর্দান্ত, দৃঢ়, নির্ভীক, ক্ষুরধার, বিধ্বংসী, দুর্ধর্ষ, দুর্নিবার, তীক্ষ্ণ, ক্ষিপ্র, অপ্রতিরোধ্য, অদম্য ও অবিচল।তোমার জন্য যেন কোনো উপাধিই যথেষ্ট নয়।তুমি মাঠের জাদুকর, ফুটবলের মহারথী, বিজয়ের স্থপতি, আক্রমণের তুরুপের তাস, দলের হৃদস্পন্দন, মাঠের সম্রাট, ফুটবলের সেনাপতি এবং শৈল্পিক ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক।তুমি না থাকলে কাবো ভার্দে, মিশর, সুইজারল্যান্ড কিংবা সদ্য ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পথ হয়তো আরও কঠিন হয়ে উঠত। প্রতিপক্ষের ঝড় থামিয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে তুমি সিদ্ধহস্ত।তুমি অনেক সময় নিঃশব্দে লড়ো, তারপর ঠিক সময়েই নির্ণায়ক আঘাতটি করো।জানি, তোমার পাওয়ার আর খুব বেশি কিছু বাকি নেই। হয়তো আরেকটি বিশ্বকাপের মুকুট। সেটি না পেলেও তোমার মাথায় অমরত্বের মুকুট অনেক আগেই উঠেছে।তবু আরও একবার বিশ্বকাপ জিতলে, আরও একটি গোল্ডেন বল পেলে, কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করে গোল্ডেন বুট জিতে নিলে—সেটি হবে তোমার অসাধারণ ক্যারিয়ারের আরেকটি মহাকাব্যিক অধ্যায়।হয়তো সামনে রয়েছে নবম ব্যালন ডি’অরের সম্ভাবনাও।তুমি রেকর্ড গড়ো, আবার নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙো। তারপর নতুন করে আরেকটি ইতিহাস তৈরি করো। এসব যেন কেবল তোমাকেই মানায়।আমরা শুধু মনের গভীর থেকে তোমার ফুটবলের সৌন্দর্য উপভোগ করি। চাই, এই সৌন্দর্য যেন আরও কিছুদিন আমাদের সামনে থাকে।তাই তোমার প্রতি বিশেষ অনুরোধ—এই বিশ্বকাপ শেষেই অবসরে যেও না।আরও কিছুদিন খেলো।সম্ভব হলে আরেকটি বিশ্বকাপ খেলো। আরও একটি অবিশ্বাস্য প্রেক্ষাপটের জন্ম দাও। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব।জানি, বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত খেলোয়াড়ের গতি ও সৌন্দর্য কমে যায়। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে যেন সেই নিয়মও পুরোপুরি খাটে না। তুমি সময়ের বিপরীতে হাঁটো, বয়সকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করো।এই বিশ্বকাপের মুকুট তোমার হাতে ধরা দিক কিংবা না-ই দিক, তুমি অন্তত আরও কিছুদিন খেলা চালিয়ে যাও। আরও একবার পৃথিবীর মানুষের মধ্যে শৈল্পিক ফুটবলের সৌন্দর্য বিলিয়ে দাও।২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর, আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠার পর আমি লিখেছিলাম—“I wish Messi to play another World Cup.”তুমি সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছ।এবারও আমাদের অনুরোধটি রেখো।আরও একবার থেকো, মেসি।আরও কিছুদিন আমাদের ফুটবলের জাদু দেখাও।
লেখক: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এইচআর/এএসএম