বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও বাংলাদেশের শহর, বন্দর, গ্রাম ও মফস্বলজুড়ে ছিল ফুটবলের উন্মাদনা। কোথাও আর্জেন্টিনার পতাকা, কোথাও ব্রাজিলের জার্সি, কোথাও রাতভর বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন। কোনো কোনো এলাকায় প্রিয় দলের জয়কে কেন্দ্র করে মিছিল হয়েছে, বাজি ফুটেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। মনে হয়েছে, ফুটবল যেন বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে।
Advertisement
কিন্তু বিশ্বকাপের উন্মাদনা শেষ হওয়ার পর যখন মাঠ ফাঁকা হয়, পতাকা নামানো হয়, জার্সি আলমারিতে উঠে যায়—তখন একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়। যে দেশের মানুষ ফুটবলকে এত ভালোবাসে, সেই দেশের ফুটবল কোথায়?
বাংলাদেশ বিশ্বকাপের মূল পর্বে কখনো খেলতে পারেনি। বিশ্ব ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে নিম্নসারিতে। সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০’র ঘরে। এশিয়ার ফুটবল মানচিত্রেও আমরা শক্তিশালী দেশগুলোর ধারেকাছে নেই। অথচ ফুটবলপ্রেমী মানুষের সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের কোনো দেশের চেয়ে কম নয়।
এই বৈপরীত্য কেবল দুঃখজনক নয়; এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।
Advertisement
কারণ, বাংলাদেশের ফুটবলের সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়। সমস্যা হলো—প্রতিভা তৈরি, খুঁজে বের করা এবং ধরে রাখার জন্য আমরা কার্যকর কোনো জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি।
ফুটবল উন্নয়নে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার প্রতিটি টাকার ব্যবহার পরিমাপযোগ্য হওয়া উচিত। কোনো প্রকল্পের সাফল্য কেবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ছবি দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। সাফল্যের প্রমাণ হবে মাঠে তৈরি হওয়া খেলোয়াড়, কোচ, দল এবং আন্তর্জাতিক ফলাফল।
একটি শিশু ফুটবল খেলছে—এটি প্রতিভার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু সেই শিশুকে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়ে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন মাঠ, প্রশিক্ষক, প্রতিযোগিতা, পুষ্টি, চিকিৎসা, ক্রীড়া বিজ্ঞান, মানসিক প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা। বাংলাদেশের ফুটবল ব্যবস্থায় এই ধারাবাহিকতার অধিকাংশই অনুপস্থিত।
আমরা ফল চাই, কিন্তু বীজ বপন করতে চাই না।
Advertisement
বিশ্বের ফুটবল শক্তিগুলো একদিনে শক্তিশালী হয়নি। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স—কেউই শুধু প্রতিভার ওপর নির্ভর করে বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেনি। তাদের পেছনে আছে ক্লাব, একাডেমি, স্কুল ফুটবল, বয়সভিত্তিক লিগ, প্রশিক্ষিত কোচ, স্কাউটিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
এশিয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। কয়েক দশক আগেও তারা বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ সারির দেশ ছিল না। কিন্তু তারা বুঝেছিল, জাতীয় দলকে ভালো খেলানোর জন্য শুধু ভালো কোচ নিয়োগ করলেই হবে না; খেলোয়াড় তৈরির পুরো কাঠামো বদলাতে হবে। পেশাদার লিগ, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ক্লাব একাডেমি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান বদলেছে।
বাংলাদেশ সেই শিক্ষা নেয়নি।
আমাদের ফুটবল উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ধারাবাহিকতার অভাব। সরকার বদলায়, ফেডারেশনের নেতৃত্ব বদলায়, কোচ বদলায়, পরিকল্পনা বদলায়। কিন্তু কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়িত হয় না। কিছুদিন পর নতুন কমিটি, নতুন ঘোষণা, নতুন প্রকল্প। ফলাফল? একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা।
ক্রীড়াঙ্গনে এই ‘ঘোষণানির্ভর উন্নয়ন’ বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দীর্ঘ কয়েক দশকে আমরা কী অর্জন করেছি? শুধু আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন, বিদেশি কোচ নিয়োগ কিংবা বিচ্ছিন্ন কিছু সাফল্য দিয়ে একটি দেশের ফুটবলের উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—কতজন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে? কতটি কার্যকর একাডেমি তৈরি হয়েছে? কতজন প্রশিক্ষিত কোচ তৈরি হয়েছে? জেলা পর্যায়ে কতটি নিয়মিত লিগ চালু আছে? বয়সভিত্তিক দল থেকে কতজন খেলোয়াড় জাতীয় দলে উঠে এসেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা উচিত।
কারণ ফুটবল এখন শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাত। বিশ্ব ফুটবলের বাজার বিশাল। খেলোয়াড়, কোচ, প্রশিক্ষণ, সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন, পর্যটন, পণ্য বিক্রি—সব মিলিয়ে ফুটবল একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প। বাংলাদেশে ফুটবলকে এখনো মূলত খেলা ও বিনোদন হিসেবে দেখা হয়; অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয় না।এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।
তবে সবচেয়ে বড় সংকট মাঠের।
ঢাকার মাঠের সংখ্যা গত কয়েক দশকে ভয়াবহভাবে কমেছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, ভবন বাড়ছে, সড়ক বাড়ছে; কিন্তু খেলার মাঠ বাড়ছে না। অনেক মাঠ দখল হয়েছে, অনেক মাঠ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও মাঠের জায়গায় স্থাপনা তৈরি হয়েছে। শিশুরা খেলবে কোথায়?
যে শহরে একটি শিশু প্রতিদিন মাঠে যেতে পারে না, সে শহর থেকে বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবতাবিবর্জিত।
আমরা একই সঙ্গে বলি, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে; আবার তাদের খেলার মাঠও দখল করি। আমরা বলি, শিশুদের শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে; আবার তাদের খেলাধুলার সুযোগ কমিয়ে দিই। আমরা বলি, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এগিয়ে যেতে হবে; অথচ খেলার জায়গা রক্ষার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাই না।
এটি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি অগ্রাধিকারের সংকট।
বাংলাদেশে উন্নয়নকে আমরা প্রায়ই কংক্রিট, সড়ক, সেতু ও ভবনের সঙ্গে মাপি। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়ন তার শিশুদের খেলার সুযোগ দিয়েও মাপা হয়। একটি মাঠ কেবল ঘাসের জমি নয়; এটি শারীরিক স্বাস্থ্য, সামাজিকতা, নেতৃত্ব, দলগত চেতনা ও স্বপ্ন তৈরির জায়গা।
একটি মাঠ হারালে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা হারায়।
ফুটবলের আরেকটি বড় সমস্যা হলো তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত প্রতিযোগিতার অভাব। প্রতিটি স্কুল, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় নিয়মিত ফুটবল প্রতিযোগিতা থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিযোগিতা হয় বিচ্ছিন্নভাবে, প্রকল্পভিত্তিকভাবে কিংবা কোনো বিশেষ উপলক্ষ কেন্দ্র করে।
একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে ১০ বছর বয়সে শনাক্ত করার পর তার ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক উন্নয়নপথ থাকা দরকার। বাংলাদেশে সেই পথ কোথায়?
আজ একটি শিশু ভালো খেলল। আগামীকাল তার প্রশিক্ষণ নেই। পরের বছর কোনো প্রতিযোগিতা নেই। কয়েক বছর পর সে পড়াশোনা বা জীবিকার চাপে ফুটবল ছেড়ে দিল। এভাবেই প্রতিদিন শত শত প্রতিভা হারিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিভা জন্ম নেয় সর্বত্র; সুযোগ জন্ম নেয় না। রাষ্ট্রের কাজ হলো সুযোগকে প্রতিভার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এখানেই দরকার জাতীয় ফুটবল একাডেমি ও আঞ্চলিক একাডেমির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। প্রতিটি বিভাগে আবাসিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকতে পারে। জেলা পর্যায়ে স্কাউটিং ব্যবস্থা থাকতে পারে। স্কুল ও ক্লাবের মধ্যে সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য বৃত্তি চালু করা যেতে পারে।
কিন্তু এসবের জন্য দরকার পরিকল্পনা ও অর্থ। আর অর্থের সঙ্গে দরকার স্বচ্ছতা।
ফুটবল উন্নয়নে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার প্রতিটি টাকার ব্যবহার পরিমাপযোগ্য হওয়া উচিত। কোনো প্রকল্পের সাফল্য কেবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ছবি দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। সাফল্যের প্রমাণ হবে মাঠে তৈরি হওয়া খেলোয়াড়, কোচ, দল এবং আন্তর্জাতিক ফলাফল।
ফুটবল ফেডারেশন ও সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক কর্মদক্ষতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। কী লক্ষ্য ছিল, কী অর্জন হয়েছে, কোথায় ব্যর্থতা, কেন ব্যর্থতা—সবকিছু জনগণের সামনে থাকা দরকার।
ক্রীড়াক্ষেত্রে জবাবদিহি না থাকলে ব্যর্থতা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
আমাদের ফুটবলে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও নতুন নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিচয় থাকতেই পারে; কিন্তু ক্রীড়া প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্য যদি দক্ষতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ক্ষতি হয় খেলাটির। ফুটবল পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পর্কে জ্ঞান।
ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির সম্প্রসারিত ক্ষেত্র বানালে খেলাধুলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফুটবল ফেডারেশনের নেতৃত্বে যে-ই থাকুন না কেন, তাদের কাছে জনগণের প্রশ্ন থাকা উচিত—আপনার সময়কালে ফুটবল কোথায় এগিয়েছে? কী পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন এসেছে? কতজন নতুন খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে? কতটি নতুন মাঠ হয়েছে? কতজন কোচ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন?
এই প্রশ্ন করা মানেই কাউকে অসম্মান করা নয়। বরং এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ।
ক্রিকেটের দিকে তাকালে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই। ক্রিকেটে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছুটা সফল হয়েছে কারণ সেখানে ধীরে ধীরে একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, বয়সভিত্তিক দল, জাতীয় ক্রিকেট লিগ, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ, একাডেমি ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি হয়েছে।
ফুটবলেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো প্রয়োজন।
তবে ক্রিকেটের সাফল্য ফুটবলের ব্যর্থতার অজুহাত হতে পারে না। বরং ক্রিকেট দেখিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশ চাইলে একটি খেলাকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে পারে।
প্রশ্ন হলো, ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা কোথায়?
বাংলাদেশের ফুটবলকে ঢাকাকেন্দ্রিক রাখারও কোনো যুক্তি নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফুটবলের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। গ্রাম, চর, উপকূল, পাহাড়—সব জায়গায় ফুটবল খেলা হয়। অথচ প্রতিভা শনাক্ত করার কোনো শক্তিশালী জাতীয় ব্যবস্থা নেই।
একজন কৃষকের সন্তান, একজন শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান কিংবা কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের শিশু—তার প্রতিভা যেন অর্থনৈতিক সামর্থ্যের অভাবে হারিয়ে না যায়। ফুটবলকে সত্যিকারের গণমানুষের খেলায় পরিণত করতে হলে এই সামাজিক বৈষম্য কমাতে হবে।
বাংলাদেশের ফুটবলে নারী ফুটবলের সাম্প্রতিক সাফল্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মেয়েরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। অর্থাৎ প্রতিভার অভাব নেই; প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, কাঠামো ও পৃষ্ঠপোষকতা।
এই অভিজ্ঞতা পুরুষ ফুটবলের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদেশি লিগ ও বিদেশি খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বিশ্ব ফুটবলের সঙ্গে যোগাযোগ অবশ্যই প্রয়োজন। বিদেশি কোচ, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও বিদেশে খেলার সুযোগ খেলোয়াড়দের উন্নত করতে পারে। কিন্তু বিদেশি খেলোয়াড় এনে সাময়িকভাবে ফল পাওয়ার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
নিজেদের খেলোয়াড় তৈরি না করলে কোনো দেশ ফুটবলে শক্তিশালী হয় না।
বাংলাদেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হলে একটি ১৫ বছরের জাতীয় ফুটবল রোডম্যাপ প্রয়োজন। এই পরিকল্পনায় থাকতে হবে মাঠ সংরক্ষণ ও নির্মাণ, স্কুল ফুটবল, বয়সভিত্তিক লিগ, জেলা একাডেমি, কোচ উন্নয়ন, ক্রীড়া বিজ্ঞান, ক্লাব লাইসেন্সিং এবং জাতীয় দলের লক্ষ্য।
পরিকল্পনাটি হতে হবে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। কোনো সরকার ক্ষমতায় এসে পরিকল্পনা বাতিল করবে, আরেক সরকার নতুন পরিকল্পনা করবে—এভাবে ফুটবল এগোবে না।
ক্রীড়ানীতি হতে হবে জাতীয় নীতি।
বিশ্বকাপের সময় আমরা অন্য দেশের পতাকা উড়াই। অন্য দেশের খেলোয়াড়কে নায়ক বানাই। এতে কোনো অপরাধ নেই। ফুটবল বিশ্বজনীন খেলা। কিন্তু যদি কয়েক দশক ধরে আমরা শুধু অন্যের সাফল্যে আনন্দ করি এবং নিজের দেশের ব্যর্থতা স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—আমরা কি সত্যিই ফুটবলপ্রেমী, নাকি কেবল ফুটবল-দর্শক?
ফুটবলপ্রেমী জাতি নিজের খেলাকেও ভালোবাসে।
বাংলাদেশের মানুষকে শুধু দর্শক হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। তাকে মাঠে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্থানীয় লিগের প্রচার বাড়াতে হবে। ক্লাবগুলোকে পেশাদার করতে হবে। খেলোয়াড়দের তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঘরোয়া ফুটবলের সম্প্রচার বাড়াতে হবে।
একটি শক্তিশালী ফুটবল সংস্কৃতি তৈরি করতে হলে দর্শক, খেলোয়াড়, কোচ, ক্লাব, ফেডারেশন, সরকার ও করপোরেট খাত—সবাইকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
তবে শেষ পর্যন্ত দায় এড়াতে পারে না রাষ্ট্র।
কারণ মাঠ রক্ষার আইন রাষ্ট্রের হাতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ক্রীড়া অবকাঠামো তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ফেডারেশন ও ক্রীড়া প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
আর রাষ্ট্র যদি ফুটবলকে কেবল বিশ্বকাপের সময় মানুষের আবেগের বিষয় হিসেবে দেখে, তাহলে এই দুর্দশা চলতেই থাকবে।
বাংলাদেশের ফুটবল এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আছে—মানুষের ভালোবাসা। কোটি কোটি মানুষ ফুটবল দেখে, আলোচনা করে, স্বপ্ন দেখে। এত বড় সামাজিক ভিত্তি পৃথিবীর সব দেশের নেই। কিন্তু ভালোবাসা নিজে নিজে গোল করে না। আবেগ নিজে নিজে খেলোয়াড় তৈরি করে না। পতাকা নিজে নিজে বিশ্বকাপে যায় না।
তার জন্য প্রয়োজন মাঠ, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অর্থ, প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহি।
বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের মানুষ অন্য দেশের জয়ে আনন্দ করে। একদিন এমন একটি সময় আসুক, যখন বিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষ বাংলাদেশের জয়ে আনন্দ করবে। সেই দিনটি অসম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্য আজকের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করতে হবে।আমাদের বলতে হবে—সমস্যা শুধু খেলোয়াড়ের নয়। সমস্যা শুধু কোচের নয়। সমস্যা শুধু ফেডারেশনের নয়। সমস্যা একটি ভঙ্গুর কাঠামোর। আর সেই কাঠামো গড়ে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্র, ক্রীড়া প্রশাসন ও সমাজ—সবার।
বিশ্বকাপ শেষ হলে ফুটবলপ্রেমী মানুষের উন্মাদনা কমে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলের সংকট তখনই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ তখন আর বিদেশি তারকার আলো আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে রাখে না। তখন দেখা যায়—নিজেদের মাঠ কোথায়, নিজেদের তারকা কোথায়, নিজেদের ভবিষ্যৎ কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সময় শেষ।
বাংলাদেশের ফুটবলকে বাঁচাতে হলে শুধু নতুন কোচ নয়, নতুন চিন্তা দরকার। শুধু নতুন দল নয়, নতুন কাঠামো দরকার। শুধু নতুন স্লোগান নয়, নতুন জবাবদিহি দরকার।
যে শিশু আজ খালি পায়ে গ্রামের মাঠে বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে, তার পায়ে একদিন জাতীয় দলের জার্সি উঠবে কি না—তা নির্ভর করবে আমাদের আজকের সিদ্ধান্তের ওপর।
আমরা যদি মাঠ রক্ষা না করি, প্রতিভা খুঁজে না নিই, প্রশিক্ষণ না দিই, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে আগামী বিশ্বকাপেও আমরা অন্যের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকব।
আর যদি সত্যিই বদলাতে চাই, তাহলে শুরু করতে হবে এখনই।
বিশ্বকাপের উন্মাদনা এক মাসের। কিন্তু একটি ফুটবল দল তৈরি করতে লাগে ১৫ বছর। যে জাতি এই দীর্ঘ অপেক্ষার ধৈর্য দেখাতে পারে না, সে জাতি শুধু অন্যের বিজয় উদ্যাপন করতে পারে; নিজের বিজয় নির্মাণ করতে পারে না।
বাংলাদেশ কি সেই জাতি হয়ে থাকবে?
নাকি একদিন আমরা বুঝব—ফুটবলকে ভালোবাসা মানে শুধু মেসি, নেইমার বা এমবাপ্পের জন্য রাত জাগা নয়; ফুটবলকে ভালোবাসা মানে নিজের শিশুকে মাঠে খেলতে দেওয়া, নিজের প্রতিভাবান তরুণকে সুযোগ দেওয়া এবং নিজের দেশের ফুটবল প্রশাসনের কাছে কঠিন প্রশ্ন করা।
শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ফুটবল তার স্টেডিয়ামে নয়, তার রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে তৈরি হয়।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষ বহু বছর ধরে আবেগ দিয়েছে। এখন তাদের প্রাপ্য ফলাফল। পতাকা ওড়ানোর আনন্দের পাশাপাশি তারা দেখতে চায় নিজেদের পতাকা। বিশ্বকাপ দেখার পাশাপাশি তারা দেখতে চায় নিজেদের দলকে। বিদেশি তারকার পাশাপাশি তারা চায় বাংলাদেশের ঘর থেকে উঠে আসা নায়ক।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব কারও একার নয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তাদের, যারা সিদ্ধান্ত নেন, বাজেট নির্ধারণ করেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং জনগণের নামে ক্ষমতা ব্যবহার করেন।
ফুটবলপ্রিয় জাতির দুর্দশা কোনো ভাগ্যের লিখন নয়। এটি নীতির ফল। আর নীতি বদলালে ফলও বদলাতে পারে।
তবে তার জন্য আমাদের একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে—
বাংলাদেশের ফুটবলকে সবচেয়ে বেশি হারিয়েছে প্রতিপক্ষ দল নয়; হারিয়েছে আমাদের অব্যবস্থা, স্বল্পমেয়াদি চিন্তা, মাঠ দখলের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহির অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অনুপস্থিতি।
এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করলে কোনো বিশ্বকাপই আমাদের ফুটবলকে উদ্ধার করবে না।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/এএসএম