দেশজুড়ে

২০০ বছরের রংপুর জিলা স্কুলের মাঠজুড়ে সাজানো রঙিন শৈশব

‘ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত আমি রংপুর জেলা স্কুলে পড়েছি। আমার শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে এই স্কুলে। স্কুলটি আমাকে তৈরি করেছে। আমার ভাইবোনেরা সব সময় ফার্স্ট হতো। আমি ফাস্ট হতে পারতাম না। আমি হয়তো থার্ড হতাম। আমার ভেতরে ফার্স্ট হতে না পারার একটা চাপ ছিল। এটা আমি মোকাবিলা করলাম শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা দিয়ে। ক্লাস সিক্সেই আমি একটা হাতে লেখা পত্রিকা বানিয়ে ফেললাম। দেয়াল পত্রিকাও করলাম একটা। সেটা স্যাররা হেডস্যারের রুমে রেখে দিলেন। হাতে লেখা পত্রিকাটা হইচই ফেলে দিল। আমাদের যিনি ক্লাস টিচার ছিলেন, তিনি হেডস্যারকে দেখালেন, এটা আনিসুল করেছে। স্কুলে আমি বিতর্ক করতাম, বক্তৃতা করতাম, আবৃত্তি করতাম। এসব করে আমি ফার্স্ট হতে না পারার ঘাটতি পূরণ করতাম। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হয়ে গেলাম। প্রেসিডেন্ট আমাকে ডেকে পাঠালেন। ঢাকায় গেলাম, পড়ি ক্লাস নাইনে। ৭৯ সাল, প্রেসিডেন্ট তখন জিয়াউর রহমান। ক্লাস নাইন থেকে টেনে ওঠার সময় আমি ফার্স্ট হলাম।’

Advertisement

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে কথাগুলো বলছিলেন দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও সাহিত্যিক আনিসুল হক। রংপুর জিলা স্কুলের এই প্রাক্তন ছাত্র আজও তার স্কুলজীবন অনুভব করেন। সুযোগ হলেই ফিরে যান অতীত স্মৃতিতে।

তিনি বলেন, ‘ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, কালচারাল অ্যাক্টিভিটি। সেসবই আমার মনে পড়ে। আমাদের স্কুলে দুটো বিশাল বটগাছ ছিল। ওই গাছ দুটোর নিচে আমাদের সব অনুষ্ঠান হতো। সিরাজুল ইসলাম নামে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি সিক্স-সেভেন-এইটের বাচ্চাদের নিয়ে বাংলার ওপর একটা অনুষ্ঠান করেছিলেন। আমি এখনো স্বপ্ন দেখি, আমি যদি এ রকম একটা অনুষ্ঠান করতে পারতাম! ধরা যাক, তিনি একজনের বুকে লিখলেন উপসর্গ ‘প্রো’, আরেকজনের বুকে লিখলেন ‘কার’। প্রো যদি কারের পাশে বসে হয়ে যাবে ‘প্রকার’। আরেকজনের বুকের ওপর লিখলেন ‘আ’, আ যদি ‘কার’-এর পাশে বসে হয়ে যাবে আকার। বুকের ওপর ‘বি’ লেখা আরেকজন এসে বলবে, আমি যদি কারের পাশে বসি হয়ে যাব ‘বিকার’। পনেরো-বিশ মিনিটের কি যে একটা অনুষ্ঠান করলেন! আমার ষাট-একষট্টি বছর বয়স হয়ে গেছে, আমি মেরিল-প্রথম আলো করি, টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখি আমি নানান অনুষ্ঠান করি। কিন্তু সিরাজ স্যারের ওই অনুষ্ঠানের মতো কল্পনা ও প্রেজেন্টেশন আজও কোথাও পাইনি।’

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও প্রখ্যাত বিদ্যাপীঠ রংপুরে জিলা স্কুল। ১৮৩২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি প্রায় দু’শো বছর ধরে উত্তরবঙ্গের শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা হয়ে এগিয়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

Advertisement

গৌরবোজ্জ্বল অতীত, চোখ ধাঁধানো প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য আর হাজারো কৃতী শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এই স্কুলটি যেন মহাকালের এক নীরব সাক্ষী।

ঐতিহ্যের অতীত প্রেক্ষাপট

উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন এ অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি, তখন রংপুরের কিছু বিদ্যানুরাগী জমিদার ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে তৎকালীন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের শাসনামলে ১৮৩২ সালে ‘রংপুর জমিদার স্কুল’ নামে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৪৭ সালে সরকার এটি অধিগ্রহণ করে এবং ‘রংপুর জিলা স্কুল’ নামকরণ করা হয়।

ঐতিহ্যবাহী রংপুর জিলা স্কুলটি প্রায় ১৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশাল এই ক্যাম্পাসের ভেতরেই রয়েছে ঐতিহাসিক লাল ইটের মূল প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবনসমূহ, খেলার মাঠ, কম্পিউটার ল্যাব, লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, অডিটোরিয়াম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রাবাস (হোস্টেল)।

ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রাম-সব ইতিহাস ও পরিবর্তনের সাক্ষী এই বিদ্যাপীঠ।

Advertisement

সাফল্যের খতিয়ান: সেরাদের সেরা

রংপুর জিলা স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি মেধা ও মনন বিকাশের এক অনন্য কারখানা। এই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে লালমনিরহাটের কাকিনার জমিদার মহিমারঞ্জন রায় চৌধুরী, কবি শেখ ফজলল করিম, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা প্রফুল্ল চাকী, পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া, সাবেক বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, সাবেক সেনাপ্রধান মোস্তাফিজুর রহমান, ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ আফজাল, কবি, লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক আনিসুল হকসহ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রথিতযশা ব্যক্তি।

একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব

প্রতি বছর মাধ্যমিক (এসএসসি) ও প্রাথমিক এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান অধিকার করে আসছে।

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রতি বছরই পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে এই স্কুলটি শীর্ষস্থান ধরে রাখে। সবশেষ গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ২৪২ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ২৪০ জন। এরমধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫৮ জন।

এর আগের বছর ২৪৪ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এদের মধ্যে ২৪২ জন পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭৮ জন। ২০২৩ সালে ২৪৭ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ২৪৬ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮১ জন। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাতেও এবার ১০৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৮০ জন বৃত্তি পেয়েছে।

শুধু একাডেমিক শিক্ষায় নয়, জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান মেলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, স্কাউটিং এবং খেলাধূলাতেও রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রংপুরের নাম উজ্জ্বল করছে।

বর্তমান অবস্থা

৫৩টি শিক্ষক পদের বিপরীতে রয়েছেন ৫৭ জন শিক্ষক। চারটি অফিস সহকারী পদের বিপরীতে রয়েছেন চারজন, ১০ জন অফিস সহায়ক পদের বিপরীতে রয়েছেন সাতজন, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন কর্মীর পদ দুটি করে থাকলেও রয়েছেন একজন করে।তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে ৪টি করে শাখা। প্রতিটি শাখায় ৬০টি করে আসন। সেই হিসাবে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯২০ জন। তবে বর্তমানে সেখানে শিক্ষার্থী রয়েছে ২১৫৯ জন। একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর গড় ৩৭ জন। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ১২টা এবং ১২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দুই শিফটে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রথম ক্লাসের সময় থাকে ৫০ মিনিট এবং পরবর্তী ক্লাসের সময় ৪০ মিনিট। প্রতিটি বেঞ্চে চারজন করে শিক্ষার্থী বসতে পারে।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিমুল ও আবু তালহা বলেন, একটি ক্লাসে ৫৫-৬০ জন করে শিক্ষার্থী। পেছনে বসলেও স্যারের কথা শুনতে অসুবিধা হয় না। কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, আবাসিক ব্যবস্থা, খেলার মাঠ, টয়লেটসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা অনেক ভালো রয়েছে। স্যাররাও যথেষ্ট আন্তরিক। শিক্ষার্থীদের তেমন কোনো সমস্যা নেই।

মাদকসেবীদের আনাগোনায় ম্লান দু’শো বছরের জৌলুস

দিনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও সন্ধ্যার পর শুরু হয় মাদকসেবীদের আনাগোনা। বিশাল এক ক্যাম্পাসজুড়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় আড়ালে বসে চলে মাদকসেবন। সাধারণ মানুষের হাঁটাহাঁটি করার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও এই সুযোগে মাদকসেবীরাও ঢুকে পড়েন।

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, স্কুলটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যথাযথভাবে পরিচালিত হয়। আমাদের লক্ষ্য শুধু ভালো জিপিএ অর্জন নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষক সংকট না থাকলেও নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নকর্মীর সংকট রয়েছে। সরকারিভাবে এই পদে জনবল বাড়ানো ও নিয়োগ দেওয়া জরুরি। আপাতত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকট

হোস্টেলে সিট থাকলেও শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, মানসম্মত ৬০টি সিটের একটি আবাসিক হোস্টেল থাকলেও সেখানে শিক্ষার্থী থাকে না। আগে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা হতো। সেসময় রংপুরের বাইরে বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষার্থী আসতো। লটারি পদ্ধতি চালুর পর বাইরে থেকে শিক্ষার্থী আসে না। এ কারণে সেখানে কেউ থাকে না।

মাদকসেবীদের আনাগোনার বিষয়টি স্বীকার করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে প্রবেশে কোনো বাধা থাকে না। এই শহরের অনেকেই নিরিবিলি পরিবেশে হাঁটাহাঁটি করার জন্য এখানে আসেন। এই সুযোগে কিছু মাদকসেবীও ঢুকে পড়ে। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করলেও বিষয়টি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। যদি সন্ধ্যার পর প্রধান গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে সাধারণ মানুষ যারা হাঁটার জন্য বা শারীরিক ব্যায়াম করতে আসেন তারা বিপাকে পড়বেন। তাদের কথা বিবেচনা করে গেট খোলা রাখা হয়।

রংপুর জেলা শিক্ষা অফিসার এনায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সাধারণত অধিদপ্তর থেকে করা হয়। স্কুলে যে জনবল সংকট রয়েছে সে বিষয়ে অধিদপ্তরে জানানো হয়েছে।

মাদকসেবীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষসহ স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যার পর এখানে হাঁটতে আসেন। এ কারণে গেট বন্ধ রাখা হয় না। মাদকসেবনের বিষয়টি মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় তুলে ধরা হয়।

আবেক-ভালোবাসার আরেক নাম জিলা স্কুল

রংপুর জিলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র মোহাম্মদ আফজাল। মাধ্যমিক পরীক্ষার আগ মুহূর্তে শুরু হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। রক্তে তখন তারুণ্যের আগুন, চোখে ছিল মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।

৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১’ র মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন যুক্ত। ছিলেন রংপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান। গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবেও নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘদিন।

আরও পড়ুন শিক্ষা আইনের খসড়া / কোচিং ও নোট-গাইড স্থায়ীভাবে বন্ধে বিধিমালা করছে সরকার

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সূতিকাগার সেই প্রিয় বিদ্যাপীঠ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মোহাম্মদ আফজাল জাগো নিউজকে বলেন, এই রংপুর জিলা স্কুল শুধু ইট-কাঠের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের শেকড়। এই প্রাঙ্গণের প্রতিটি গাছের পাতা, প্রতিটি করিডোর আমাদের চেতনার সঙ্গে মিশে আছে।

আজ যখন এই স্বাধীন দেশের মুক্ত আকাশে স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলি, বুক ভরে নিশ্বাস নিই- তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৫২ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো। মনে পড়ে যায় রংপুর জিলা স্কুলের সেই লাল ইটের ভবন, আমাদের কৈশোরের চঞ্চল দিনগুলো আর আমাদের বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ করা সেই অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি।

আফজাল বলেন, ঢাকার রাজপথ যখন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলো, সেই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল আমাদের ছোট্ট শহর রংপুরেও। আজও স্পষ্ট মনে আছে, কীভাবে আমরা জিলা স্কুলের বন্ধুরা ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে এসেছিলাম। আমাদের কিশোর কণ্ঠেও সেদিন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। তখনকার সেই দিনগুলো কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, তা ছিল অস্তিত্বের লড়াই, মায়ের ভাষার প্রতি গভীরতম ভালোবাসার এক অগ্নিপরীক্ষা।

আমাদের সেই মিছিলে কোনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ছিল না, ছিল কেবল বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার তাগিদ। জিলা স্কুলের মাঠের প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের সেই স্লোগানের, আমাদের সেই গোপন মিটিংয়ের আর ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার অদম্য প্রতিজ্ঞার।

আজ জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়- আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো আমি ফেলে এসেছি এই স্কুলটার চত্বরেই। এখান থেকেই শিখেছি কীভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয়।

আরও পড়ুন ইট-পাথরের শহরে শিশুদের জন্য এক টুকরো সবুজ ক্যাম্পাস

এখনো ওই লাল ইটের প্রাচীন ভবনটির সামনে যখন দাঁড়াই, বুকটা কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে যায়। কারণ, ওই প্রাচীরের ভেতরে শুধু একটি স্কুল নেই, লুকিয়ে আছে আমার দুরন্ত কৈশোরের সোনালি দিনগুলো।

এই স্কুলের আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী আরিফুল হক রুজু। ১৯৭৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।প্রথম আলো পত্রিকার শুরু থেকে টানা ২৬ বছর কাজ করেছেন সেখানে। এখন অবসরে। দৈনিক আজকের কাগজ ও ভোরের কাগজেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন।

স্কুলের স্মৃতিচারণ করে আরিফুল হক রুজু বলেন, ‘রংপুর জিলা স্কুল আমার মতো অনেকের আবেগের জায়গা, ভালোবাসার জায়গা। এখনো প্রতি ঈদুল ফিতরের পর তিন দিন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ব্যাচভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এবং ঈদুল আজহার পর ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। ভালোবাসার জায়গা থেকে ১৯৭১ সালের পর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে জিলা স্কুলের গরিব শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে গত ১১ বছর ধরে। মাসিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা করে এবার ১৩৭ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, এর পাশাপাশি তাদের জুতা, স্কুল ড্রেস, খাতা, কলম, ব্যাগও দেওয়া হয়।’

রুজু বলেন, ‘প্রায় দু'শো বছর ধরে এই স্কুলটি উত্তরবঙ্গের মেধা ও মননশীলতার প্রতীক হয়ে আছে। উপমহাদেশের প্রাচীনতম এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মতো অনেকের গর্বের জায়গা রংপুর জিলা স্কুল।’

ওই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আর কয়েক বছর পর দ্বিশত বর্ষে পদার্পণ করবে রংপুর জিলা স্কুল। এরই মধ্যে স্কুলের বর্তমান শিক্ষার্থী ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মাঝে এক অভূতপূর্ব আবেগ ও উদ্দীপনা কাজ করছে। সেই চিরচেনা করিডোর, বিশাল খেলার মাঠ, পুকুর পাড় আর গাছতলার স্মৃতি নিয়ে রংপুর জিলা স্কুল যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই ছড়াতে থাকুক শিক্ষার আলো- এমনটাই প্রত্যাশা এ অঞ্চলের মানুষের।

এফএ/জেআইএম