স্বাস্থ্য

‘মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমে, ক্ষতির বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই’

খাদ্য, পানি, বাতাস, প্রসাধনী, ইলেকট্রিক পণ্যসহ নানান উৎসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাম্প্রতিক গবেষণায় টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে। এই ক্ষুদ্র কণা মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমা হলেও এর সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে এখনো কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন গবেষক।

Advertisement

রোববার (২৬ জুলাই) বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডিও) গবেষণায় টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।

বিষয়টি নতুন করে জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। বিশেষ করে যে সব পরিবারে শিশু রয়েছে, তারা টুথপেস্ট ব্যবহার নিয়ে বেশি আতঙ্কে। কারণ, শিশুদের জন্য বাজারজাত ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে এবং শিশুরা অনেক সময় টুথপেস্ট খেয়ে ফেলে।

আরও পড়ুন যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা / বাজারের অধিকাংশ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, এখন করণীয় কী?

জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে কথা হয় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষক ড. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে।

Advertisement

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগের বিষয় হলেও এটি মানুষের শরীরে ঠিক কতটা ক্ষতি করছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই

জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগের বিষয় হলেও এটি মানুষের শরীরে ঠিক কতটা ক্ষতি করছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।’

তার ভাষ্যমতে, শুধু টুথপেস্ট নয়, বিভিন্নভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এক্সপোজার (সংস্পর্শ) চলতে থাকলে এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমা হয়ে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

তবে টুথপেস্ট থেকে ঠিক কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করছে, কতটুকু বিভিন্ন অঙ্গে জমা হচ্ছে এবং কতটুকু শরীর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে- এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া এর প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

Advertisement

২৬ জুলাই রাজধানীতে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডিও) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেশে বাজারজাত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়।

শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?

জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে আইসিডিডিআর,বির এই গবেষক বলেন, ‘বর্তমানে মাইক্রোপ্লাস্টিককে বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের একটি উদীয়মান উদ্বেগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ খাদ্য, পানি, বাতাস, প্রসাধনীসহ নানান উৎসের মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।’

কিডনিসহ শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গেই এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। যদি দীর্ঘ সময় ধরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের এক্সপোজার হয় এবং তা শরীরে জমা হতে থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন কতটা হবে বা কোন ধরনের হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই

তিনি বলেন, ‘কিডনিসহ শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গেই এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। যদি দীর্ঘ সময় ধরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের এক্সপোজার হয় এবং তা শরীরে জমা হতে থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন কতটা হবে বা কোন ধরনের হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।’

আরও পড়ুন এসডোর গবেষণা / দেশে প্রচলিত প্রতি চারটি টুথপেস্টের তিনটিতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

তার মতে, বর্তমানে যে গবেষণাগুলো রয়েছে, সেগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলছে। কিন্তু মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- টুথপেস্ট থেকে কতটা শরীরে যাচ্ছে?

গবেষকের মতে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এটি মানুষের শরীরে ঠিক কতটা প্রবেশ করছে।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে- এটি একটি তথ্য। কিন্তু সেখান থেকে মানুষের শরীরে ঠিক কতটুকু যাচ্ছে, কতটুকু শরীর শোষণ করছে, কতটুকু শরীর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং কতটুকু বিভিন্ন অঙ্গে জমা হচ্ছে- এসব না জেনে এর প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণ করা যাবে না

তিনি বলেন, ‘টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে- এটি একটি তথ্য। কিন্তু সেখান থেকে মানুষের শরীরে ঠিক কতটুকু যাচ্ছে, কতটুকু শরীর শোষণ করছে, কতটুকু শরীর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং কতটুকু বিভিন্ন অঙ্গে জমা হচ্ছে- এসব না জেনে এর প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণ করা যাবে না।’

তার ভাষায়, এক্সপোজারের মাত্রা না জেনে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না।

‘বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত’ তথ্য এখনো নেই

মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি প্রচার হলেও গবেষক সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে- এটি সত্য। এটি সম্ভাব্য ক্ষতিকর- এমন ইঙ্গিতও রয়েছে। কিন্তু এটি মানুষের শরীরে ঠিক কোন ধরনের রোগ সৃষ্টি করছে বা কতটা ক্ষতি করছে, সে বিষয়ে এখনো ‘বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত’ তথ্য নেই।’

আরও পড়ুন ঝকঝকে দাঁত পেতে ঘরেই তৈরি করুন প্রাকৃতিক পেস্ট

তার মতে, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ক্ষতি- এই দুটি বিষয় এক নয়। তাই প্রমাণের আগেই আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়।

শিশুদের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন উদ্বেগের?

এসডিওর গবেষণায় শিশুদের জন্য বাজারজাত ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ ছোট শিশুরা দাঁত ব্রাশ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই কিছু টুথপেস্ট গিলে ফেলে। শিশুদের শরীরে টুথপেস্ট থেকে কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক যাচ্ছে এবং সেটি কতটা ক্ষতি করছে, সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই

এ বিষয়ে আইসিডিডিআর,বির গবেষক বলেন, ‘বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ ছোট শিশুরা দাঁত ব্রাশ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই কিছু টুথপেস্ট গিলে ফেলে।’

তিনি যোগ করেন, ‘শিশুদের শরীরে টুথপেস্ট থেকে কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক যাচ্ছে এবং সেটি কতটা ক্ষতি করছে, সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।’

আদর্শগতভাবে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার কথা নয়

গবেষকের মতে, দৈনন্দিন ব্যবহারের কনজ্যুমার প্রোডাক্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা উচিত নয়।

আরও পড়ুন টুথপেস্ট-কসমেটিকসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

তিনি বলেন, ‘যদি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ আদর্শ পরিস্থিতিতে এ ধরনের পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার কথা নয়।’

কেন দরকার আরও গবেষণা?

গবেষকের মতে, ভবিষ্যৎ গবেষণায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে-

টুথপেস্ট থেকে কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করে, কতটুকু শরীরে শোষিত হয়, কতটুকু শরীর থেকে বের হয়ে যায়, কতটুকু বিভিন্ন অঙ্গে জমা হয়, দীর্ঘমেয়াদে এসব কণার প্রভাব কী?

তিনি বলেন, ‘এই তথ্যগুলো ছাড়া কোনো স্বাস্থ্য নির্দেশিকা বা কার্যকর ইন্টারভেনশন দেওয়া কঠিন।’

ব্যক্তিগত পরামর্শের চেয়ে জরুরি রেগুলেটরি ব্যবস্থা

বর্তমানে সাধারণ মানুষ কী করবে- এ প্রশ্নের জবাবে গবেষক বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে নির্দিষ্ট কোনো পরামর্শ দেওয়ার মতো বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনো নেই।

বরং, তিনি জোর দিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার ওপর।

তার মতে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে, বিজ্ঞানভিত্তিক জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করতে হবে, প্রয়োজনে সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে, পণ্যের লেবেলে সব উপাদান স্পষ্টভাবে উল্লেখ বাধ্যতামূলক করতে হবে, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে এবং আরও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

এসডিওর গবেষণায় যা উঠে এসেছে

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এসডিওর গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ২৬টি টুথপেস্টে (৭৬.৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। শিশুদের ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে চারটিতে।

আরও পড়ুন টুথপেস্ট ছাড়া দাঁত পরিষ্কার করবে যেসব উপাদান

কোনো পণ্যের মোড়কে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমারের উপস্থিতির তথ্য উল্লেখ ছিল না।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ জানেনই না যে টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে।

এখন করণীয় কী?

আইসিডিডিআর,বির গবেষকের মতে, এই গবেষণাকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, ‘ভালো নীতিমালা তৈরি করতে হলে আগে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে- এটি গবেষণার শুরু। এখন মানুষের শরীরে এর প্রকৃত প্রভাব, নিরাপদ মাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা করতে হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই জাতীয় মানদণ্ড, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার নীতি গড়ে তুলতে হবে।’

বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এটিই প্রথম বড় পরিসরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই গবেষণা ভবিষ্যতে নিরাপদ ওরাল কেয়ার পণ্য নিশ্চিত করা, ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

এমইউ/এএসএ