জাতীয়

নির্দেশনা আছে বাস্তবায়ন নেই, শাহজালালে যাত্রীর স্বজনের জটলা ঠেকাবে কে?

যাত্রীর সঙ্গে দুজনের বেশি নয়—নিয়ম জানেন না অনেকে বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ ঢিলেঢালা

১৯ জুলাই রোববার, সকাল ৯টা। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২। বহির্গমন ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে দূর থেকে তাকালে বোঝার উপায় নেই, এটি দেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নাকি কোনো ব্যস্ত আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল।

Advertisement

টার্মিনালের ক্যানোপিতে সারি সারি ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা। প্রতিটি গেটে স্বজনদের ভিড়। কেউ ফ্লোরে বসে আড্ডা দিচ্ছেন, কেউ ধূমপান করছেন, কেউ পান চিবোচ্ছেন। কেউ আবার যাত্রীর লাগেজ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন যাত্রী ভেতরে ঢুকছেন বা বের হচ্ছেন, আর তাকে ঘিরে ধরছেন চার-পাঁচজন স্বজন। কোথাও কান্না, কোথাও ছবি তোলা, কোথাও উচ্চস্বরে ফোনালাপ। পুরো পরিবেশে শৃঙ্খলার চেয়ে বিশৃঙ্খলাই যেন বেশি চোখে পড়ে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এসব দৃশ্যের মধ্যেই কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। প্রায় এক বছর আগে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যাত্রীকে বিদায় বা স্বাগত জানাতে ডিপারচার ড্রাইভওয়ে ও অ্যারাইভাল ক্যানোপিতে একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন প্রবেশ করতে পারবেন। যানজট কমানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যাত্রী চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।

নির্দেশনা আছে, প্রয়োগ নেই

শাহজালাল বিমানবন্দর সূত্র জানায়, প্রতিদিন ৩০টির বেশি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সের ১২০ থেকে ১৩০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শাহজালাল বিমানবন্দরে ওঠানামা করে। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, একজন যাত্রীর সঙ্গে গড়ে চারজন স্বজন বিমানবন্দরে আসেন। অর্থাৎ, প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৮০ হাজার মানুষের চাপ পড়ে আগমন ও বহির্গমন এলাকায়।

Advertisement

এ কারণেই গত বছরের ২৭ জুলাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন সঙ্গী প্রবেশের নির্দেশনা জারি করে। কিন্তু গত রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টার্মিনাল-১ ও ২ ঘুরে দেখা গেছে, সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই।

আমার একটাই ছেলে। দাম্মামে একটা কোম্পানিতে চাকরিতে যাচ্ছে। এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। তাই সবাই মিলে তাকে বিদায় জানাতে এসেছি।—আলমগীর হোসেন

গেটে আনসার ও এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ (এপিবিএন) সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। কোথাও কোথাও আনসার সদস্যরা লোকজনকে পেছনে যেতে বললেও কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগের অবস্থা ফিরে এসেছে।

আরও পড়ুন বিমানবন্দরে বিদায়-স্বাগত জানাতে ২ জনের বেশি নয়, ফের বিজ্ঞপ্তি

সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই জানেন না যে যাত্রীর সঙ্গে দুজনের বেশি বিমানবন্দরে যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফেনীর ইকরামুল হক রিয়াদ সৌদি আরবের দাম্মামে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। তাকে বিদায় দিতে বাবা, বড় বোন, বোনজামাই ও ভাতিজাসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য একটি মাইক্রোবাসে করে বিমানবন্দরে এসেছেন। ইকরামুল হক ভেতরে প্রবেশ করার পরও তারা বহির্গমন এলাকার ফ্লোরে বসে অপেক্ষা করছিলেন।

Advertisement

রিয়াদের বাবা আলমগীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুপুর ১২টায় রিয়াদের ফ্লাইট ছাড়বে। ফ্লাইট ছাড়লে আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবো।’

ছেলেকে বিদায় জানাতে এতজন এসেছেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার একটাই ছেলে। দাম্মামে একটা কোম্পানিতে চাকরিতে যাচ্ছে। এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। তাই সবাই মিলে তাকে বিদায় জানাতে এসেছি।’

দেশে আসবো শুনে পরিবারের লোকজন বিমানবন্দরে আসছেন। এটা দেশের একটা স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশে এমনটা দেখা যায় না। বিদেশে যাত্রী ছাড়া কেউ বিমানবন্দরে যায় না।—ইতালিফেরত মোশাররফ হোসেন

একই চিত্র আগমনী ফটকেও। চার বছর পর ইতালি থেকে দেশে ফিরেছেন চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের মোশাররফ হোসেন। তাকে স্বাগত জানাতে সকাল থেকেই পরিবারের ছয় সদস্য বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন।

বিদেশের চিত্র ভিন্ন

ইতালিফেরত মোশাররফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে দেশে আসবো শুনে পরিবারের লোকজন বিমানবন্দরে আসছেন। এটা দেশের একটা স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিদেশে এমনটা দেখা যায় না। বিদেশে যাত্রী ছাড়া কেউ বিমানবন্দরে যায় না।’

আরও পড়ুন শাহজালাল বিমানবন্দরে তবু সেই ‘মাছ বাজারের ভিড়’

জার্মানি থেকে ইস্তাম্বুল হয়ে টার্কিস এয়ারলাইনসে দেশে ফেরেন টাঙ্গাইলের মোক্তার হোসেন। জার্মানির বিমানবন্দরে এমন চিত্র দেখা যায় কি না—জানতে চাইলে মোক্তার হোসেন বলেন, ‘বিদেশের পরিবেশ ভিন্ন। ওখানে যাত্রীর সঙ্গে বিমানবন্দরে কেউ যায় না। যাত্রী লাগেজ নিয়ে নিজেই যাতায়াত করেন। আর বিমানবন্দরের পরিবেশও অনেক উন্নত।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশের বিমানবন্দর খুবই আধুনিক। পরিবেশও দেখার মতো। সেখানে কোনো যাত্রীকে বিদায় বা স্বাগত জানাতে পরিবারের লোকজন বিমানবন্দরে যায় না। অথচ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমন ও বহির্গমন টার্মিনালের সামনের পরিবেশ যেন মাছ বাজার।’

বিমানবন্দর একটি দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরে এবং বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এর মধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে। তাই আমরা আহ্বান জানাবো, যাত্রীকে বিদায় বা স্বাগত জানাতে দুজনের বেশি যেন বিমানবন্দরে না আসেন।—এস এম রাগীব সামাদ

বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিমানবন্দর শুধু একটি দেশের প্রবেশপথ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও। বিমানবন্দর একটি দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরে, পর্যটকদের আকৃষ্ট করে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু বিদেশিরা যখন শাহজালাল বিমানবন্দরে ঘিঞ্জি পরিবেশ দেখেন, তারা আঁতকে ওঠেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের মনে নেতিবাচক ধারণা জন্মায়।’

কী বলছেন কর্তৃপক্ষ

শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৫ সালের ২৭ জুলাই থেকে একাধিকবার প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আপনারাও (গণমাধ্যম) এ প্রচারণায় যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন, আলাদাভাবে নিউজ করেছেন। এছাড়া আগমনী ক্যানোপি ও বহর্গামী ড্রাইভওয়েতে বিভিন্ন স্থানে সাইনেজ লাগানো আছে। পাশাপাশি, সেসব স্থানে দায়িত্বরত কর্মীরা নিয়মিতভাবে হ্যান্ডমাইকে প্রচার করে চলেছেন।’

তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দর একটি দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরে এবং বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এর মধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে। তাই আমরা আহ্বান জানাবো, যাত্রীকে বিদায় বা স্বাগত জানাতে দুজনের বেশি যেন বিমানবন্দরে না আসেন।’

এমএমএ/এমকেআর/ এমএফএ