আন্তর্জাতিক

ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে কানাডায় গিয়ে আশ্রয় চাইলেন ১০ বাংলাদেশি

কানাডায় অনুষ্ঠিত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে গিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ১৭৫ জন দর্শক ও দর্শনার্থী দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম (Asylum) প্রার্থনা করেছেন। সম্প্রতি কানাডা সরকারের ‘ইমিগ্রেশন, রিফ্যুজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা’ (IRCC) প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনাকারীদের তালিকায় প্রধান সারিতে রয়েছে সেনেগাল, ঘানা ও মিশরের মতো দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশেরও ১০ জন নাগরিক রয়েছেন।

Advertisement

জুন ও জুলাই মাসে কানাডার টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভার শহরের দুটি বিখ্যাত ভেন্যুতে বিশ্বকাপের মোট ১৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই টুর্নামেন্ট কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য প্রায় ২৬ হাজার ভিজিটর ভিসা ইস্যু করেছিল কানাডা সরকার। গত ১৯ জুলাই আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনাল খেলায় পূর্ববর্তী বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করে স্পেন।

আইআরসিসি সতর্ক করে জানিয়েছে, বিশ্বকাপ শেষ হলেও আশ্রয়ের এই আবেদনের সংখ্যা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ অনেক বিদেশি নাগরিক তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বেআইনিভাবে অবস্থান করে পরবর্তী সময়ে শরণার্থী মর্যাদার জন্য আবেদন জানিয়ে থাকেন। তবে আশ্রয়প্রার্থীদের এই তালিকার মধ্যে কতজন বিদেশি দলের ফুটবলার কিংবা দলের অফিশিয়াল ও সহযোগী কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, তা সুনির্দিষ্ট করে জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আইআরসিসি।

যেসব দেশের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি আশ্রয়ের আবেদন করেছেন

Advertisement

কানাডায় প্রবেশ করে সবচেয়ে বেশি আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছেন ঘানার নাগরিকরা। ১৭ জুন টরন্টোতে পানামার মুখোমুখি হয়েছিল ঘানার জাতীয় ফুটবল দল। আইআরসিসি’র তথ্য অনুযায়ী, ভিজিটর ভিসা আবেদনের ফর্মে ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২৬’ উল্লেখ করেছিলেন এমন অন্তত ২৫ জন ঘানাইয়ান নাগরিক কানাডায় পৌঁছানোর পর অ্যাসাইলাম দাবি করেছেন।

এছাড়া মিশর থেকে আসা ভিজিটর ভিসাধারী ১৫ জন নাগরিকও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। ২১ জুন ভ্যাঙ্কুভারে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল মিশর।

অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৭ জুলাই ভ্যাঙ্কুভারে কলম্বিয়ার ম্যাচ দেখতে এসে দেশটিতে প্রবেশ করার পর অন্তত ১৫ জন কলম্বিয়ান নাগরিক আশ্রয়ের আবেদন জমা দিয়েছেন।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে কানাডায় আসা সেনেগালের ১০ জন নাগরিকও আশ্রয় চেয়েছেন। ২৬ জুন টরন্টোতে ইরাকের বিপক্ষে নিজেদের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি খেলেছিল সেনেগালের জাতীয় দল।

Advertisement

ইকুয়েডরের ৫ জন নাগরিকও আশ্রয় চেয়েছেন, যদিও তাদের জাতীয় দল বিশ্বকাপের যে ম্যাচগুলো খেলেছিল সেগুলো কানাডার ভূখণ্ডের বাইরের ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই না করা দেশ থেকেও আশ্রয়ের হিড়িক

বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেসব দেশ ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে মূল পর্বে অংশগ্রহণই করেনি বা কোয়ালিফাই করতে পারেনি, সেসব দেশের অসংখ্য নাগরিকও বিশ্বকাপের দর্শনার্থী হিসেবে ভিসা নিয়ে কানাডায় এসে রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করেছেন।

এই তালিকায় বাংলাদেশের ১০ জন, কেনিয়ার ১৫ জন, চীনের ১০ জন, নাইজেরিয়ার ১০ জন এবং বুরুন্ডি, নেপাল ও পাকিস্তানের ৫ জন করে নাগরিক রয়েছেন।

এছাড়া ৫ জন এমন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন যাদের কানাডায় আসার জন্য সাধারণ ভিসার প্রয়োজন পড়েনি, বরং তারা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশনের মাধ্যমে কানাডায় পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।

কানাডায় ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নরওয়ে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের নভেম্বরে কাতারকে ভিসা শিথিলকরণ তালিকার আওতায় আনার পর দেশটির নাগরিকরাও সাধারণ ভিসার বদলে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন ব্যবহার করে কানাডায় ভ্রমণ করতে পারছেন।

বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো দেখার জন্য কাতার সরকার নিজেদের প্রায় ১হাজার সমর্থক ও ফ্যানের ভ্রমণের পুরো খরচ বহন করেছিল। জুন মাসে ভ্যাঙ্কুভারে স্বাগতিক কানাডার বিপক্ষে কাতারের গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি ছিল এর অন্যতম। কাতারের সামাজিক ও ক্রীড়া অবদান তহবিল দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এসব সমর্থকদের বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং ও স্থানীয় যাতায়াত খরচের অর্থ জোগায়।

এমনকি কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল সানির একটি চার্টার্ড বিশেষ বিমানে করে কাতারী সমর্থকদের একটি বড় দল কানাডায় এসেছিল তাদের দলকে সমর্থন দিতে। তবে সেই ম্যাচে স্বাগতিক কানাডার কাছে ৬-০ গোলের বড় ব্যবধানে হেরে যায় কাতার। ওই ম্যাচে কানাডিয়ান স্ট্রাইকার জোনাথন ডেভিড ইতিহাস গড়ে প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে পুরুষদের আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন।

সরকারি পদক্ষেপ ও কঠোর অভিবাসন নীতি

আইআরসিসি এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছে, ২০২৬ সালের ২০ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, পূর্বে ফিফা সম্পর্কিত সাময়িক বসবাসের অনুমোদন পাওয়া ২৬ হাজার১১১ জন ব্যক্তির মধ্যে পরবর্তী সময়ে মোট ১৭৫ জন ব্যক্তি অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা দিয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, এই পরিসংখ্যানে কেবল সেইসব আবেদনকারীদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা তাদের অস্থায়ী বাসস্থানের ভিসা ফরমে স্পষ্টভাবে ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২৬’ ট্যাগ বা উল্লেখ করেছিলেন।

সম্প্রতি অটাওয়া বা কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক আশ্রয়ের নিয়মনীতি অনেক বেশি কঠোর করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি এরই মধ্যে কানাডায় এক বছরের বেশি সময় ধরে অবস্থান করে থাকেন, তবে তারা নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি শরণার্থী আবেদনের শুনানির অধিকার হারাবেন।

বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই আইআরসিসি টিকিটধারী আবেদনকারীদের সতর্ক করে দিয়েছিল যে, প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর তারা নিজ দেশে ফিরে যাবেন না- এমন সন্দেহ প্রকাশ পেলে তাদের সরাসরি ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে কিংবা কানাডার বর্ডার এজেন্টরা বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারেন।

অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছিল, আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে দেশে প্রবেশের প্রচেষ্টা রুখতে তারা ভিসা আবেদনগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করেছে। দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কানাডার একজন ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট জানান, রাজনৈতিক আশ্রয়ের ঝুঁকি থাকার কারণে অনেক ঘানাইয়ান নাগরিককে বিশ্বকাপের ভিসা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল।

তবে টরন্টোর বিশিষ্ট ইমিগ্রেশন আইনজীবী স্টিফেন গ্রিন জানান, সরকার আবেদনগুলো মূল্যায়নে অত্যন্ত চমৎকার কাজ করেছে। কারণ কানাডায় আসা বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর তুলনায় আশ্রয় প্রার্থনাকারীদের এই সংখ্যাটি বেশ কম।

বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে কানাডার তৎকালীন অভিবাসন মন্ত্রী লেনা মেটলেজ ডায়াব আন্তর্জাতিক এই টুর্নামেন্টের অংশ হিসেবে কাজ করতে আসা বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতিপত্র বা ওয়ার্ক পারমিটের বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলেন। ফিফা কর্তৃক আমন্ত্রিত ব্যক্তি যেমন খেলোয়াড়, কোচ, ফিজিও, রেফারি এবং ম্যাচের অন্যান্য অফিশিয়ালদের ক্ষেত্রে ওয়ার্ক পারমিটের নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল, যার ফলে তারা সাধারণ ভিজিটর ভিসাতেই কানাডায় প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।

মেগা স্পোর্টিং ইভেন্টে অ্যাসাইলামের ঐতিহাসিক রূপরেখা

সাধারণত যে কোনো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে গিয়ে আয়োজক দেশগুলোকে কেবল সমর্থকদের কাছ থেকেই নয়, বরং অংশগ্রহণকারী দলের অ্যাথলেট ও সাপোর্ট স্টাফদের কাছ থেকেও অ্যাসাইলাম বা আশ্রয় প্রার্থনার মুখোমুখি হতে হয়।

এর আগে খেলোয়াড়রা বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে বসতে পারেন- এমন আশঙ্কায় আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার ফুটবল ফেডারেশন বিশ্বকাপে বাছাইপর্বের ম্যাচগুলো থেকেই তাদের পুরুষদের জাতীয় ফুটবল দলকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকের সময় ২২ জন দর্শনার্থী কানাডায় আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন; যাদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন সরাসরি ‘অলিম্পিক ফ্যামিলি’ বা অফিশিয়াল বহরের অংশ। কানাডার অভিবাসন দপ্তরের মতে, সেই আশ্রয়প্রার্থীরা ঘানা, হাঙ্গেরি, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়া, মলদোভা, নেপাল ও জাপানের নাগরিক ছিলেন।

একইভাবে ২০১২ সালে লন্ডনে যখন অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই ক্যামেরুন, ইরিট্রিয়া ও রুয়ান্ডার প্রতিযোগীসহ প্রায় ৮২ জন অ্যাথলেট ও অফিশিয়াল ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছিলেন।

সূত্র: দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল

এসএএইচ