দেশজুড়ে

দুর্গম পাহাড়ে হামের হানা, হাজার ছাড়িয়েছে আক্রান্ত

১৫ দিনে হামের উপসর্গে আট শিশুর মৃত্যু আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু দ্রুত চিকিৎসাসেবা পেতে বাধা দুর্গম পথ আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণে টিকা গ্রহণে অনীহা

বান্দরবানের রুমায় হামের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। গত ১৫ দিনে হামের উপসর্গে আট শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরে আলীকদম ও রুমা উপজেলায় এই রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁডিয়েছে ১৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা হাজারেরও বেশি।

Advertisement

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী।

‘রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লেতং খুমী পাড়া অত্যন্ত দুর্গম। মোটরসাইকেল একটি নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত যাওয়ার পর আরও তিন থেকে চার ঘণ্টা পাহাড়ি পথ ও ঝিরিপথ পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছাতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় এখনো নিয়মিত চিকিৎসক বা মেডিকেল টিম পৌঁছাতে পারে না। ফলে অসুস্থ শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেকেই মারা যাচ্ছে’

রুমায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুরা হলো ফ্রেলেএং খুমী (৫), খ্রেপা খুমী (১১), শইফ্রা খুমী (৫), প্রেটেম এং খুমী (৬), পলিএং খুমী (৯) প্রেটেমএং খুমী (৭), কুপাও ম্রো (১৩) এবং পও এং খুমি (৭)। এর আগে আলীকদমে এই রোগের উপসর্গ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রুমা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম লেতং খুমী পাড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ এক শিশুর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে ওই পাড়ায় হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট জনে। বর্তমানে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একই উপসর্গ নিয়ে আরও ১৩ শিশু চিকিৎসাধীন।

এর আগে আলীকদমের কুরুকপাতা এলাকায় হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। এ নিয়ে জেলায় চলতি বছরে হামের উপসর্গ নিয়ে বেসরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৩ জনে। স্বজনদের দাবি, চিকিৎসার অভাবেই একই উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।

‘স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশে লেতং খুমী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ রয়েছে। অনেক পরিবার আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে গাছ-গাছড়া ও ভেষজ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে’

আরও পড়ুন দেশে হামে শিশুমৃত্যু ৮০০ ছুঁইছুঁই

ভোগান্তির কথা তুলে ধরে রুমা উপজেলার লেতং খুমী পাড়ার বাসিন্দা অং সাই খুমী জানান, রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লেতং খুমী পাড়া অত্যন্ত দুর্গম। মোটরসাইকেল একটি নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত যাওয়ার পর আরও তিন থেকে চার ঘণ্টা পাহাড়ি পথ ও ঝিরিপথ পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছাতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় এখনো নিয়মিত চিকিৎসক বা মেডিকেল টিম পৌঁছাতে পারে না। ফলে অসুস্থ শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

Advertisement

‘বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের বেশিরভাগের বয়স ৫-১২ বছরের মধ্যে। এতে ধারণা করা যাচ্ছে, দুর্গম এলাকায় বসবাসরত ম্রো ও খুমী সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার টিকা গ্রহণে অনীহা দেখিয়েছে। পাশাপাশি ৪-৫ বছর আগে ওইসব এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী বা টিকাদান কর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি-না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে’

উপজেলা ইউনিসেফের টিকাদানকর্মী উ থোয়াই সিং মারমা জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশে লেতং খুমী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ রয়েছে। অনেক পরিবার আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে গাছ-গাছড়া ও ভেষজ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে।’

আরও পড়ুন সিলেটে শতক ছুঁলো প্রাণহানি, হাম শনাক্তের ফল নিয়ে প্রশ্ন

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এক থেকে ছয় বছর বয়সী ৩০-৩৫ শিশুকে হামের টিকা দিয়েছি। টিকাদানের সময় তিনজন শিশুকে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিই। পরে হাসপাতালে আনার পথে এক শিশুর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে ১৩ শিশু ভর্তি রয়েছে।’

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল হাসান বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের বেশিরভাগের বয়স ৫-১২ বছরের মধ্যে। এতে ধারণা করা যাচ্ছে, দুর্গম এলাকায় বসবাসরত ম্রো ও খুমী সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার টিকা গ্রহণে অনীহা দেখিয়েছে। পাশাপাশি ৪-৫ বছর আগে ওইসব এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী বা টিকাদান কর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি-না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।’

আরও পড়ুন হামে শিশুর মৃত্যু: ইউনূস-নূরজাহানদের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ

তিনি বলেন, তদন্তে টিকাদানে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্গম পাহাড়ে শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিজা আক্তার বিথী।

আরও পড়ুন হামে শিশু মৃত্যু: গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ

তিনি বলেন, দুর্গম এলাকার শিশুদের হামসহ সব ধরনের টিকা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ৩৫ জন হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছে। এদের মধ্যে প্রাপ্তবয়ষ্কদের সংখ্যাই বেশি।

আরও পড়ুন এমপি মাসুদ / হামে ৩০০ শিশু মারা গেলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কথা ভাবলেন না কেন

তিনি আরও জানান, চলতি বছরে জেলায় এক হাজার ৩০০ জনের বেশি হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। যার মধ্যে রুমা ও আলীকদমে এই রোগে আটজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা গেছে। এই রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা আরও দ্রুত পৌঁছে দিতে চলতি সপ্তাহের মধ্যে মপআপ ক্যাম্প (বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম) চালু করা হবে।

তবে জেলায় ২০০ স্বাস্থ্যকর্মীর পদ শূন্য থাকায় সেবা দিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে বলে জানান সিভিল সার্জন।

এসআর/জেআইএম