বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে আলোচিত সাফল্যগুলোর একটি কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন। স্বাধীনতার পর যে দেশকে হেনরি কিসিঞ্জার একসময় "তলাবিহীন ঝুড়ি" (Bottomless Basket) বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষি গবেষণা, কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সরকারি নীতিগত সহায়তার ফলে দেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। গত পাঁচ দশকে চাল উৎপাদন প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলা, খাদ্য মজুত ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণও এ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—খাদ্য উৎপাদনের এই সাফল্য কি সত্যিই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে?
Advertisement
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) যৌথভাবে প্রকাশিত ‘State of Food Security and Nutrition in the World (SOFI) 2026’ প্রতিবেদনের তথ্য আমাদের আত্মতুষ্টিকে ভেঙে দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২০২৫ সময়ে বাংলাদেশের ২৬.২ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৫৪ লাখ মানুষ মাঝারি বা গুরুতর খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে ছিল। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ (৩৮.৬ শতাংশ) একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা বহন করার সামর্থ্য হারিয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য আছে, বাজার আছে, কিন্তু পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। এই বাস্তবতাই আজ বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় সংকট।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন খাদ্যনিরাপত্তাকে চাল উৎপাদনের সঙ্গে প্রায় সমার্থক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা অনেক বিস্তৃত। FAO খাদ্যনিরাপত্তাকে চারটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়েছে—খাদ্যের প্রাপ্যতা (Availability), খাদ্যে প্রবেশাধিকার (Access), খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার বা পুষ্টিগত উপযোগিতা (Utilization), এবং সময়ের সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির স্থিতিশীলতা (Stability)। এই চারটি স্তম্ভের যেকোনো একটিতে দুর্বলতা দেখা দিলে প্রকৃত খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বাংলাদেশ প্রথম স্তম্ভ—খাদ্যের প্রাপ্যতায়—উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ধান উৎপাদন বেড়েছে, খাদ্য মজুত শক্তিশালী হয়েছে, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় স্তম্ভ, অর্থাৎ খাদ্যে অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে খাদ্য থাকলেও মূল্যস্ফীতি, আয় বৈষম্য এবং ক্রয়ক্ষমতার অবনতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
Advertisement
বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে সফলতার নতুন ইতিহাস লিখেছে। কিন্তু আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—এই সাফল্যকে কীভাবে পুষ্টিনিরাপত্তা, ক্রয়ক্ষমতা এবং খাদ্য ন্যায্যতায় রূপান্তর করা যায়। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপ ধানের গুদামে নয়; তা প্রতিফলিত হয় প্রতিটি শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠায়, প্রতিটি মায়ের পুষ্টিতে এবং প্রতিটি পরিবারের প্রতিদিনের নিরাপদ ও সুষম আহারে।
এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation’ (১৯৮১)-এ তিনি দেখিয়েছেন, দুর্ভিক্ষের মূল কারণ অনেক সময় খাদ্যের অভাব নয়; বরং মানুষের খাদ্য অর্জনের অধিকার বা Entitlement হারিয়ে যাওয়া। একজন শ্রমিক, কৃষক বা নিম্ন আয়ের কর্মজীবী ব্যক্তি যদি তার শ্রমের বিনিময়ে পর্যাপ্ত আয় না পান, তাহলে বাজারে খাদ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার হবেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক সেই তত্ত্বেরই প্রতিফলন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য অধিকারকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অধিকাংশ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে ছিল। চালের তুলনায় ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ভোজ্যতেল, ফল এবং শাকসবজির দাম আরও দ্রুত বেড়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের খাদ্যতালিকা থেকে প্রথমেই বাদ দিয়েছে প্রাণিজ প্রোটিন, দুধ, ফল এবং পুষ্টিকর খাদ্য। অর্থাৎ ক্ষুধা হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু 'Hidden Hunger' বা অদৃশ্য ক্ষুধা—ভিটামিন, খনিজ ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি—ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
SOFI 2026-এর তথ্য সেই উদ্বেগকেই আরও শক্তিশালী করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৫.১ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির (Stunted) এবং ১০.৭ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে (Wasted) ভুগছে। একই সঙ্গে ৫.৮ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনের (Overweight)। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন অপুষ্টি ও অতিপুষ্টির দ্বৈত সংকটের (Double Burden of Malnutrition) মুখোমুখি। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য এটি নতুন বাস্তবতা, যেখানে একদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, অন্যদিকে নগরাঞ্চলে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের কারণে স্থূলতা বাড়ছে।
Advertisement
আরও উদ্বেগজনক হলো, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী মাত্র ৩৭.৬ শতাংশ শিশু ন্যূনতম খাদ্য বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে পারছে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশু প্রয়োজনীয় খাদ্যগোষ্ঠী থেকে পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। আবার একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ২০১২ সালের ৬৪.১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৫৩.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এটি একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ শিশুকালের অপুষ্টি শুধু শারীরিক বৃদ্ধি নয়; বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, শিক্ষাগত সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার ওপরও স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নারীদের অবস্থাও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। SOFI 2026 অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩৭.৬ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় (Anaemia) আক্রান্ত, যা এক দশক আগের তুলনায় আরও বেড়েছে। মাতৃপুষ্টির এই দুর্বলতা শিশু অপুষ্টির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় নারী ও শিশুর পুষ্টিকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব না দিলে কোনো নীতিই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা এখন আর শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুশাসনের একটি সমন্বিত প্রশ্ন। এখানেই প্রয়োজন খাদ্যনিরাপত্তাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার—যেখানে খাদ্যের পরিমাণের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টির মান এবং সামাজিক বৈষম্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার বর্তমান সংকটকে শুধু মূল্যস্ফীতি বা দারিদ্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে পুরো চিত্রটি ধরা যাবে না। এই সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দ্রুত নগরায়ণ। সমাজবিজ্ঞানী উলরিখ বেক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Risk Society: Towards a New Modernity’ (১৯৯২)-এ যুক্তি দেন, আধুনিক বিশ্বে ঝুঁকির বড় অংশ আর প্রাকৃতিক নয়; বরং মানুষের তৈরি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ফল। আজ বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা সেই "ঝুঁকির সমাজ"-এরই একটি বাস্তব উদাহরণ।
বাংলাদেশ নিজে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল, গম, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ, তুলা এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের বড় আমদানিকারক। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের খাদ্যবাজারে। কোভিড-১৯ মহামারির পর সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল ছিল। একই সময়ে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় আরও বেড়েছে। ফলাফল হলো—দেশে উৎপাদিত নয়, এমন পণ্যের পাশাপাশি দেশীয় বাজারেও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিও এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি অভিঘাত অনুভব করছে। Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC)-এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন দক্ষিণ এশিয়াকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশে ঘন ঘন বন্যা, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং উপকূলীয় লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদনের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ধান, শাকসবজি এবং মাছের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ আমন ও সবজি চাষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। খাদ্যনিরাপত্তার চতুর্থ স্তম্ভ—স্থিতিশীলতা (Stability)—এখানেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।
খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি খাদ্য অপচয়ও বাংলাদেশের একটি অবহেলিত সমস্যা। FAO-এর বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী (Post-harvest) ক্ষতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, শীতলীকরণ ব্যবস্থা (Cold Chain), প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আধুনিক সরবরাহব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এই অপচয় কমানো গেলে খাদ্যের সরবরাহ যেমন বাড়বে, তেমনি বাজারমূল্যও তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা প্রশ্নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে দ্রুত নগরায়ণের ফলে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করে এবং এই হার ক্রমাগত বাড়ছে। নগরবাসীর অধিকাংশই খাদ্য উৎপাদন করে না; তারা সম্পূর্ণভাবে বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে শহুরে নিম্নবিত্ত, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের খাদ্যনিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে। আয় বাড়ার চেয়ে যদি খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ে, তাহলে খাদ্যনিরাপত্তা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা আজ কেবল সামাজিক কল্যাণের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও পূর্বশর্ত। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের গবেষণায় বারবার দেখানো হয়েছে, শিশুকালের অপুষ্টি শিক্ষাগত অর্জন কমায়, কর্মক্ষমতা হ্রাস করে এবং ভবিষ্যৎ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। The Lancet-এ প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণাও দেখিয়েছে যে, অপুষ্টিজনিত মানবসম্পদের ক্ষতি একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) কয়েক শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ অপুষ্টি শুধু স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতিরও কারণ।
এ কারণেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-২: Zero Hunger শুধু ক্ষুধা দূর করার কথা বলে না; এটি নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সার্বজনীন প্রাপ্যতা, টেকসই কৃষি এবং পুষ্টির উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশ এসডিজি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও সব ধরনের অপুষ্টি দূর করার লক্ষ্য অর্জন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বিগত সরকার National Food and Nutrition Security Policy 2020 গ্রহণ করেছিল, যার মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্য নিশ্চিত করা। একইভাবে Perspective Plan 2021–2041-এ কৃষির আধুনিকায়ন, পুষ্টি উন্নয়ন, কৃষির বহুমুখীকরণ, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি এবং খাদ্যব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব নীতি সময়োপযোগী হলেও বাস্তবায়নের গতি ও সমন্বয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নীতি প্রণয়ন অপেক্ষাকৃত সহজ; কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়নই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কৃষি নীতিকে এখন ধানকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের বৈচিত্র্য বাড়ানো ছাড়া পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়। ডাল, তেলবীজ, ফল, শাকসবজি, দুধ, ডিম, মাছ ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার জন্য সাশ্রয়ী মূল্য বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাও জরুরি। কৃষিপণ্যের বাজারে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগিতা, কৃত্রিম সংকট এবং অস্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থাও খাদ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনায় সুশাসন অপরিহার্য।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিরও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। ওএমএস, ভিজিএফ, ভিজিডি, স্কুল ফিডিং কিংবা নগদ সহায়তা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ক্যালরি নয়, পুষ্টি নিশ্চিত করা। দরিদ্র পরিবারগুলো যেন মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, ফল ও শাকসবজিও ক্রয় করতে পারে, সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কারণ ভাত দিয়ে ক্ষুধা মেটে; কিন্তু ভিটামিন, প্রোটিন ও খনিজের ঘাটতি পূরণ হয় না।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, খাদ্যনিরাপত্তা কেবল কৃষি উৎপাদনের সূচক নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সাম্য এবং মানবিক মর্যাদারও সূচক। অমর্ত্য সেন আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের খাদ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে খাদ্যের প্রাচুর্যও অর্থহীন। উলরিখ বেক আমাদের সতর্ক করেছেন, আধুনিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন নয়, সমন্বিত নীতিই কার্যকর। আর জাতিসংঘ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়নের সুফল মানুষের প্রতিদিনের খাবারের থালায় পৌঁছে।
বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে সফলতার নতুন ইতিহাস লিখেছে। কিন্তু আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—এই সাফল্যকে কীভাবে পুষ্টিনিরাপত্তা, ক্রয়ক্ষমতা এবং খাদ্য ন্যায্যতায় রূপান্তর করা যায়। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপ ধানের গুদামে নয়; তা প্রতিফলিত হয় প্রতিটি শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠায়, প্রতিটি মায়ের পুষ্টিতে এবং প্রতিটি পরিবারের প্রতিদিনের নিরাপদ ও সুষম আহারে।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।
এইচআর/এএসএম