দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বর্তমানে বহুমাত্রিক ও জটিল এক পরিবর্তন হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিনের স্থিতাবস্থা ভেঙে তৈরি হয়েছে এক নতুন পরাশক্তিগত সমীকরণ। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর ঘিরে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, তার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এমন এক উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক পটভূমিতে সম্প্রতি ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
Advertisement
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সাম্প্রতিক স্নায়ুযুদ্ধ, রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নজর—সব মিলিয়ে এই আমন্ত্রণ কেবল একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়; বরং তা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের এক নতুন সমীকরণের সূচনা বলেই মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একে বৈশ্বিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দাবা বোর্ডে পরিণত করেছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর যে স্বার্থের সংঘাত, তা দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে:
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (IPS) এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)—দুই পরাশক্তির এই দুই বিশাল প্রকল্পের মূল সংযোগস্থলে রয়েছে বাংলাদেশ। চীন তার বাণিজ্য পথ নিরাপদ রাখা এবং ভারত মহাসাগরে প্রভাব বাড়ানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে বিপুল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও করিডোর সুবিধার দিকে নজর রাখছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে মুক্ত বাণিজ্য ও সুরক্ষার দোহাই দিয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে চায়।
Advertisement
চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে ঢাকাকে এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। করিডোর ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা অর্জনে উভয় দেশই বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেদের অনুকূল আবহাওয়া দেখতে উৎসুক।
গত জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে। এই অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষের প্রাণহানি এবং হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের চরম ন্যক্কারজনক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তবে এই পুরো সময়জুড়ে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারকে দিল্লির অন্ধ ও একচেটিয়া সমর্থন বাংলাদেশি জনগণের মনে ভারত-বিরোধী ক্ষোভকে তীব্র থেকে তীব্রতর করেছে।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণের পরিবর্তিত মনস্তত্ত্বের কারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে চরম শীতলতা দেখা দেয়:
ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে মোদী সরকার নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ তাকে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে বারবার ফেরত চেয়ে আবেদন করলেও দিল্লি তাতে সাড়া দেয়নি।
Advertisement
দিল্লিতে হাসিনার অবস্থান এবং একই সময়ে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশে অভিজ্ঞ ও মন্ত্রী-মর্যাদার কূটনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার নিযুক্ত করার মতো ঘটনাগুলোর মাঝে চরম অমিল দৃশ্যমান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দায়িত্ব নেওয়ার পর এতদিন পার হয়ে গেলেও তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেননি, যা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মধ্যকার চাপা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকেই স্পষ্ট করে।
এমন এক জটিল আবহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কর্তৃক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ অত্যন্ত অর্থবহ। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালও পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।
মোদীর এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এবং নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নিমাণের এক জোরালো বার্তা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: শেখ হাসিনাকে পকেটে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে এবং বাংলাদেশের জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উপেক্ষা করে এই সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ কতখানি সফল হবে?
ভারতকে যদি সত্যি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়, তবে তাদের 'শেখ হাসিনা কার্ড' খেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একথা এর আগেও আমি বহুবার বলেছি।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে যে বিষধর রাজনীতির সূচনা করেছিলেন, সাধারণ মানুষ তা কখনো ভোলেনি। জনগণের ওপর গণহত্যা চালিয়ে কোনো স্বৈরাচারকে আশ্রয় দেওয়া এবং একই সাথে সেই দেশের জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা—এই দ্বিচারিতা বা দ্বিমুখী নীতি পাশাপাশি চলতে পারে না।
আমি মনে করি,বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মোদী সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১. বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন কোনো বিশেষ দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ভারতের সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখে না। তারা রাষ্ট্র-টু-রাষ্ট্র (State-to-State) সম্পর্কের সমতা দেখতে চায়।
২. বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আইনি প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা দিল্লির নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। হাসিনাকে রাজনৈতিক গুটি হিসেবে ব্যবহারের চিন্তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক ক্ষতিই বৃদ্ধি করবে।
এখানে আমি একথাও বলতে চাই যে,বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। সেই বিচারে ভারতের মতো প্রতিবেশীর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে এই সম্পর্ক হতে হবে সম্পূর্ণ সমতা, সার্বভৌমত্ব ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে ভূরাজনৈতিক কৌশলে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। ভারতের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া, পানির ন্যায্য হিস্যা ও সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে অটল অবস্থান বজায় রাখা প্রয়োজন।
আমি মনে করি,ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় আন্তর্জাতিক সুযোগ। এটি চীন, রাশিয়া, ভারত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার দুয়ার খুলে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিকে আধুনিক ভূরাজনীতি অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
শেষ কথানরেন্দ্র মোদী কর্তৃক ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া এই আমন্ত্রণকে আমি বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতি এবং কূটনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। এটি হয়তো অচলাবস্থা ভাঙার এক শুভ সূচনা হতে পারে। তবে ভারতকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট চিরতরে বদলে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাগ্রত সার্বভৌম চেতনাকে সম্মান না জানিয়ে এবং অপরাধীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মন জয় করা সম্ভব নয়।
সুতরাং সম্পর্কের নতুন এই সমীকরণে সাফল্য পেতে হলে ভারতকে অবশ্যই অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, 'হাসিনা কার্ড' পরিহার করতে হবে এবং বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব ও জনগণের মনস্তত্ত্বকে সম্মান জানিয়ে সমতার ভিত্তিতে হাত বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প পথ অন্তত আজকের সচেতন বাংলাদেশের সামনে খোলা আছে বলে মনে হয় না।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
এইচআর/জেআইএম