অর্থনীতি

অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণে খাল-নদীপথের উন্নয়ন জরুরি: ডিসিসিআই

দেশের অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণ, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে খাল ও নদীপথের পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির মতে, অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্যের প্রসারে খাল ও নদীপথের টেকসই উন্নয়ন অপরিহার্য।

Advertisement

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের বৃত্তাকার নৌপথের পুনরুজ্জীবন এবং অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণে খাল খনন কর্মসূচির ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ঢাকার চারপাশের খালগুলো মানুষের শরীরের রক্তনালির মতো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে এসব খাল ধীরে ধীরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

Advertisement

তিনি বলেন, নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী বর্তমান সরকার সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে দেশের সব খালের মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

মন্ত্রী জানান, শুধু খাল খনন নয়, খাল সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, খাল ও নদী খননের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য যাতে নদীতে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্পে স্বল্প ব্যয়ে ইটিপি (অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপনে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ১ হাজার ৪১৫টির বেশি নদীর মধ্যে দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখল ও পলি জমার কারণে ৫৫ শতাংশেরও বেশি নদী ও খাল তাদের কার্যকারিতা হারিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ৭৭ শতাংশ পণ্য পরিবহন সড়কপথে হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অথচ, নৌপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় সড়কের তুলনায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ কম এবং এতে ৪ থেকে ৬ গুণ জ্বালানি সাশ্রয় হয়।

Advertisement

তাসকীন আহমেদ বলেন, রাজধানীর চারপাশের চারটি নদীর ১১২ কিলোমিটার নৌপথকে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে যানজট কমবে এবং নদীকেন্দ্রিক পর্যটনেরও বিকাশ ঘটবে।

তিনি নদীভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা জোরদারে কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, অবৈধ দখলমুক্তকরণ, ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ, খাল খনন অব্যাহত রাখা এবং নৌপথভিত্তিক আধুনিক লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে নিচু কালভার্ট ও সেতু নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। খাল খননের সময় পানিপ্রবাহের দিক বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি নদী ব্যবস্থাপনায় একক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ গঠন এবং জাতীয় নদী কমিশনকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান।

স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বলেন, নদীর পানিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে তা রক্ষায় সব সরকারি সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবেদ হোসেন বলেন, নদী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা বড় বাধা। তাই দায়িত্বের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের সিনিয়র স্পেশালিস্ট মো. তানিম সারওয়ার বলেন, দখল ও পলি জমার কারণে নদীর নাব্যতা কমছে। এ সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ এবং নদীর সীমানা নির্ধারণে জিআইএসসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন সরকার নদী ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর কমিশন গঠন এবং নদীকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ভিত্তিক বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন।

মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি বেনজীর আহমেদ, পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা কামাল, সাবেক সহ-সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ, সাবেক পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান এবং বিএসআরএমের প্রতিনিধি সৌমিত কুমারসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মন এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ইএইচটি/এমএএইচ/