কৃষি ও প্রকৃতি

জলাবদ্ধতা কৃষি উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর, করণীয় কী?

মাহমুদুল হাসান চৌধুরী

Advertisement

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবিকা ও সামগ্রিক অর্থনীতি অনেকাংশেই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের অধিকাংশ কৃষিজমি মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জলাবদ্ধতার ঘটনা আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু ফসলের ক্ষতিই নয়, মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাই জলাবদ্ধতাকে কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে না দেখে মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মাটি একটি জীবন্ত ও গতিশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এতে খনিজ কণা, জৈব পদার্থ, পানি, বায়ু এবং অসংখ্য উপকারী অণুজীবের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে ওঠে। একটি সুস্থ মাটিতে সাধারণত প্রায় ৪৫ শতাংশ খনিজ পদার্থ, ২৫ শতাংশ পানি, ২৫ শতাংশ বায়ু ও ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকে। এই ভারসাম্যই উদ্ভিদের শেকড়ের বৃদ্ধি, পুষ্টি উপাদান গ্রহণ ও অণুজীবের কার্যক্রমকে সচল রাখে। কিন্তু দীর্ঘসময় জমিতে পানি জমে থাকলে মাটির ছিদ্রগুলো পানিতে পূর্ণ হয়ে যায় এবং বায়ু চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে মাটিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয় এবং শেকড়ের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়। মাটিতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা জলাবদ্ধতা থাকলেই অধিকাংশ উঁচু জমির ফসলের শেকড়ে অক্সিজেনের ঘাটতি শুরু হয়। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় মাটি সম্পূর্ণ অবায়বীয় অবস্থায় পরিণত হতে পারে। এ অবস্থায় শেকড়ের কোষে শক্তি উৎপাদন কমে যায়, নতুন শেকড় গঠন ব্যাহত হয় এবং পানি ও পুষ্টি উপাদান শোষণের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়।

ফলস্বরূপ গাছের বৃদ্ধি মন্থর হয়ে যায়, পাতা হলদে হতে শুরু করে, কুশির সংখ্যা কমে যায় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে শেকড় পচা রোগের প্রকোপও বেড়ে যায়, যা ফসলের ক্ষতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। জলাবদ্ধতার সময় মাটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তনটি ঘটে, তা হলো মাটির রেডক্স বিভব দ্রুত কমে যাওয়া। স্বাভাবিক বায়বীয় অবস্থায় মাটিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকায় বিভিন্ন উপকারী রাসায়নিক বিক্রিয়া সঠিকভাবে সংঘটিত হয়। কিন্তু পানি জমে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মাটির রেডক্স বিভব হ্রাস পায় এবং বায়বীয় পরিবেশ ধীরে ধীরে অবায়বীয় পরিবেশে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে নাইট্রোজেন, সালফার, লৌহ, ম্যাঙ্গানিজসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের রাসায়নিক রূপ পরিবর্তিত হতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন উদ্ভিদের জন্য উপকারী না হয়ে বরং ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। অক্সিজেনের অভাবের কারণে ডিনাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ সময় মাটিতে বিদ্যমান নাইট্রেট-নাইট্রোজেন ধাপে ধাপে নাইট্রিক অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও সর্বশেষ নাইট্রোজেন গ্যাসে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। ফলে মাটিতে উদ্ভিদের জন্য সহজলভ্য নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং ফসলে নাইট্রোজেনের ঘাটতি দেখা দেয়।

Advertisement

বিশেষ করে নাইট্রাস অক্সাইড একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস, যার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ক্ষমতা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ২৭০ গুণ বেশি। তাই জলাবদ্ধতা কেবল কৃষি উৎপাদনের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। জলাবদ্ধ অবস্থায় মাটির রাসায়নিক পরিবেশে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ বিজারিত হয়ে অধিক দ্রবণীয় রূপে পরিণত হয়। এসব উপাদান অতিরিক্ত পরিমাণে উদ্ভিদের শেকড়ে প্রবেশ করলে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে ফসফরাস, জিঙ্ক, বোরন ও সালফারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতাও পরিবর্তিত হয়। ফলে অনেক সময় মাটিতে মোট পুষ্টি উপাদান উপস্থিত থাকলেও উদ্ভিদ সেগুলো কার্যকরভাবে গ্রহণ করতে পারে না। একে বিজ্ঞানীরা ‘পুষ্টি উপাদানের শারীরবৃত্তীয় ঘাটতি’ বলে থাকেন। তাই জলাবদ্ধ জমিতে কেবল সার প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না; মাটির পরিবেশ স্বাভাবিক করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন প্রকৃতি সংরক্ষণে নৈতিক দায়িত্ব সবার

জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মাটির জৈবিক বৈশিষ্ট্য এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি সুস্থ মাটিতে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, অ্যাকটিনোমাইসিটিস, শৈবাল, প্রোটোজোয়া, কেঁচো ও অন্যান্য অণুজীব বসবাস করে। এদের সম্মিলিত কার্যক্রমের মাধ্যমে জৈব পদার্থ পচে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য হয়। কিন্তু দীর্ঘসময় জলাবদ্ধ অবস্থায় মাটিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে এসব উপকারী অণুজীবের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশেষ করে নাইট্রোজেন স্থিরকারী এবং ফসফরাস দ্রবণীয়কারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পুষ্টি উপাদানের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয় এবং মাটির উর্বরতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে।

জলাবদ্ধ অবস্থায় কিছু অবায়বীয় অণুজীব সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরা জৈব পদার্থ ভাঙার সময় মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড ও বিভিন্ন জৈব অ্যাসিড উৎপন্ন করে। বিশেষ করে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস উদ্ভিদের শেকড়ের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত। এই গ্যাস শেকড়ের শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করে এবং কোষের স্বাভাবিক বিপাকীয় কার্যক্রম ব্যাহত করে। অন্যদিকে মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই জলাবদ্ধতা শুধু কৃষিজ উৎপাদন নয়, পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকলে মাটিতে বিষাক্ততার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। অবায়বীয় পরিবেশে লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজের দ্রবণীয়তা বেড়ে অতিরিক্ত মাত্রায় এসব উপাদান উদ্ভিদের শেকড়ে প্রবেশ করলে বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

এর ফলে শেকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়, পাতায় বাদামি বা কালচে দাগ দেখা দেয়, কচি পাতা শুকিয়ে যেতে পারে এবং পুষ্টি গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে কিছু জৈব অ্যাসিড ও অন্যান্য বিজারণজাত যৌগ জমে মাটির পরিবেশকে আরও প্রতিকূল করে তোলে। তাই জলাবদ্ধ জমিতে শুধু পানি সরিয়ে ফেলাই যথেষ্ট নয়; মাটির রাসায়নিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

জলাবদ্ধতার কারণে মাটির ভৌত গঠনও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। অতিরিক্ত আর্দ্র অবস্থায় ভারী কৃষিযন্ত্র ব্যবহার বা বারবার জমিতে চলাচলের ফলে মাটির কণাগুলো পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে লেগে যায় এবং মাটি সহজেই চাপা পড়ে। এতে মাটির ছিদ্রতা কমে যায়, পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং শেকড়ের বিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পরবর্তী মৌসুমেও জমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে মাটির গঠন ভেঙে যায়, পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং জমি চাষের উপযোগিতা হ্রাস পায়।

আরও পড়ুন মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা ও মাটি পরীক্ষা কেন জরুরি?

সব ফসল সমানভাবে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। ধান তুলনামূলকভাবে জলাবদ্ধ পরিবেশ সহনশীল হলেও গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ এবং অধিকাংশ সবজি অল্প সময়ের জলাবদ্ধতাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে অঙ্কুরোদগম, চারা প্রতিষ্ঠা এবং ফুল ও ফল ধারণের সময় জলাবদ্ধতা হলে ফলনের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়। তাই ফসলের ধরন, জমির অবস্থান এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বিবেচনা করে পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যার কারণে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। ফলে মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা এবং জলাবদ্ধতা-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে হলে মাটিকে শুধু উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। সুস্থ মাটি, সুষম পানি ব্যবস্থাপনা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিচর্চাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমাতে প্রথমেই কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জমির চারপাশে এবং মাঝখানে পর্যাপ্ত নালা বা ড্রেন তৈরি করলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে। নিচু এলাকায় উঁচু বেড পদ্ধতিতে সবজি চাষ করলে শেকড় জলাবদ্ধতার ক্ষতি থেকে অনেকাংশে রক্ষা পায়। একই সঙ্গে খাল, নালা ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে অতিবৃষ্টির সময় পানি দ্রুত অপসারণ সম্ভব হয়। যেখানে সম্ভব, সুষম ভূমি সমতলকরণ এবং নিয়ন্ত্রিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।

মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে জৈব পদার্থের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কম্পোস্ট, পচা গোবর, ভার্মি কম্পোস্ট, সবুজ সার এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ নিয়মিত মাটিতে সংযোজন করলে মাটির গঠন উন্নত হয়, ছিদ্রতা বৃদ্ধি পায় এবং পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের মধ্যে একটি সুষম ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। জৈব পদার্থ উপকারী অণুজীবের খাদ্য হিসেবে কাজ করে, ফলে মাটিতে জৈবিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পায় এবং পুষ্টি উপাদানের প্রাকৃতিক চক্র পুনরায় সক্রিয় হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি জলাবদ্ধতা ও খরা-উভয় প্রতিকূল অবস্থাই তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম। জলাবদ্ধতার পরে সারের ব্যবহারেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। অতিবৃষ্টির কারণে নাইট্রোজেন, সালফার ও বোরনের মতো কিছু পুষ্টি উপাদান ধুয়ে যেতে পারে বা গ্যাসীয় অবস্থায় অপচয় হতে পারে।

তাই জমিতে পানি নেমে যাওয়ার পর মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনভিত্তিক সুষম সার প্রয়োগ করা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। বিশেষ করে ইউরিয়া একবারে না দিয়ে দুই বা তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করলে নাইট্রোজেনের অপচয় কমে এবং উদ্ভিদ ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। একই সঙ্গে জৈব ও অজৈব সারের সমন্বিত ব্যবহার মাটির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফসল নির্বাচন ও চাষাবাদের পদ্ধতিতেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় সহনশীল ফসল ও জাত নির্বাচন, ফসল পর্যায়ক্রম, মালচিং, সংরক্ষণমূলক চাষাবাদ এবং উপযুক্ত সময়ে বপন বা রোপণ জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি কৃষকদের স্থানীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুসরণ করে মাঠ ব্যবস্থাপনা করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুন বন্যায় গবাদিপশুর সুরক্ষায় করণীয়

বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা বাংলাদেশের কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিকার নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গ্রহণ করতে হবে। কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, মৃত্তিকা সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমেই টেকসই কৃষি নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষক, গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে জলাবদ্ধতার ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যাবে।

মাটি আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৃষি উৎপাদনের মৌলিক ভিত্তি। একটি সুস্থ মাটিই পারে উদ্ভিদকে পর্যাপ্ত পুষ্টি, পানি ও অনুকূল পরিবেশ প্রদান করতে। তাই জলাবদ্ধতাকে কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে না দেখে মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, সুষম সার প্রয়োগ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতার ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। সুস্থ মাটি রক্ষা করা গেলে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: মৃত্তিকা বিজ্ঞানী, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট।

এসইউ