দেশজুড়ে

বারান্দার কাছেই ট্রান্সফরমার, বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হাত হারালো শিশু নিহান

২০ জুলাই সোমবার দুপুর আড়াইটা। বাহিরে অঝোরে বৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি উপভোগ করতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো পাঁচ বছরের ছোট্র নিহান। খেলার ছলে ব্যালকনির গ্রিলে হাত রাখতেই বিকট শব্দ। কিছু বোঝার আগেই শিশু নিহানের দুই হাত ও বুকের অংশ ঝলসে গেলো।

Advertisement

তাৎক্ষণিক নিহানের চিৎকারে ছুটে এলেন তার মা। এসে দেখলেন ছেলের হাত আর বুক ঝলসে গেছে। সেসময় নিহান কান্না করতে করতে বলছিল, তার শরীরে কারেন্ট লেগেছে।

এরপর নিহানের মা ফোন করে জানান, নিহানের বাবা সরকারি চাকুরিজীবী খায়রুল ইসলামকে।

পুলিশ কেইস

Advertisement

দ্রুত ছোট্র নিহানকে নিয়ে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান খায়রুল ইসলাম। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে নিহানের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে পাঠান। পরে ঐ দিনই তাকে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক নিহানের বাবা খায়রুল ইসলামকে জানান, নিহান মারাত্মকভাবে উচ্চমাত্রায় বিদ্যুতায়িত হয়েছেন, যার ফলে তার শরীরের হাত ও বুকের অংশ মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে।

পরে সোমবার (২৭ জুলাই) রাতে কর্তব্যরত চিকিৎসক খায়রুল ইসলামকে জানায়, বিদ্যুতে উচ্চমাত্রার শকে নিহানের বাম হাতের কনুইয়ের নিচে পচন ধরেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাম হাতটি কেটে না ফেললে শরীরের অন্যান্য অংশে পচন ধরবে। পরদিন মঙ্গলবার ছেলের হাত কেটে ফেলার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করেন পিতা খায়রুল ইসলাম। আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে জীবন বাঁচাতে কেটে ফেলতে হয়েছে ছোট্ট নিহানের বাম হাত। এ ঘটনায় বাড়ির মালিকের অবহেলা এবং আবাসিক এলাকার বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাটি গাজীপুর মহানগর উত্তর ছায়াবীথি শ্মশান মোড় এলাকার। সিঙ্গাপুর প্রবাসী সাইফুল ইসলামের পাঁচতলা বাড়ির ৩য় তলায় প্রায় তিনবছর ধরে ভাড়া থাকতেন খায়রুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলায় হলেও চাকুরির সুবাদে গাজীপুরে ভাড়া থাকতেন তিনি।

খায়রুল ইসলাম জানান, গত মার্চ মাসে ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়িতে যান খায়রুল ইসলাম। ছুটি শেষে ভাড়া বাড়িতে ফিরে খায়রুল দেখতে পান, তার বারান্দার সঙ্গেই তিনটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বসানো হয়েছে। যার দূরত্ব বারান্দা থেকে তিন ফুট হবে। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বাড়ির মালিক সাইফুল ইসলামের স্ত্রী মনিরা বেগম এবং বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সাইফুলের ভাতিজা ইলিয়াস হোসেনকে জানানো হয়। বাড়িরে মালিকের কাছে অনুরোধ করা হয়, যেন ব্যালকনি থাই গ্লাস দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। তবে বারবার তাদের বললেও তারা লাগিয়ে দিচ্ছি বলে সময় ক্ষেপণ করতে থাকেন।

Advertisement

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে শিশু নিহান

খায়রুল ইসলাম দাবি করেন, বাড়ির মালিক যদি সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে আজকে তার ছেলেকে পঙ্গু হতে হতো না। এছাড়াও বাড়ির দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকার শাহাদাৎকেও বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বললেও তারা গুরুত্ব দেয়নি।

বুধবার (২৯ জুলাই) সরেজমিনে ঐ বাড়িতে গেলে মালিকপক্ষের কাউকে না পাওয়া গেলেও কথা হয় কেয়ারটেকার শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঘটনার দিন দুপুরে হঠাৎ আমি কান্নাকাটি শুনতে পাই। পরে উপরে গিয়ে দেখি নিহানের শরীর পুড়ে গেছে। তখন আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তবে আমরা খায়রুল ইসলামকে বলেছিলাম এ ফ্লোরের পরিবর্তে অন্য ফ্লোরে বাসা নিতে।

অভিযোগের বিষয়ে বাড়ির দায়িত্বে থাকা ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘রাস্তা সরু হওয়ায় বাসার সঙ্গেই বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ট্রান্সফরমার বসানো হয়েছে। বিদুৎ অফিসের লোকজনই এই জায়গা নির্ধারণ করে খুঁটি বসিয়েছে। তারা বলেছিলো, কাভার তার দিয়ে লাইন দেবে, যেন কোনো সমস্যা না হয়। তবে খায়রুল ইসলামকে বলেছিলাম অন্য ফ্লোরে শিফট করতে, তারা করেনি।’

এ বিষয়ে গাজীপুর পল্লী বিদুৎ সমিতি ১ এর ছায়াবীথি জোনাল অফিসের এজিএম মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি আপনার কাছ থেকে শুনেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ঘটনাস্থলে যা দেখলাম, আমাদের পক্ষ থেকে যথাযথ নিয়ম মেনেই লাইন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যে দূরত্ব হাত দিয়ে নাগাল পাবেনা শিশুটি। কোনো লাঠি দিয়ে ট্রান্সফরমার স্পর্শ করেছে কিনা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে অভিযোগ করলে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হবে।’

এদিকে সচেতন মহল বলছে, গাজীপুর মহানগরীতে বাসভবন নির্মাণে মানা হয় না সরকারি নিয়ম। তাই বাধ্য হয়ে বাড়ির একদম সন্নিকটে বিদ্যুতের খুঁটি বসাতে হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাসভবন সংলগ্ন বৈদ্যুতিক খুঁটির বিষয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও হবে।

কেজে/জেআইএম