মন্ত্রিত্বের চার-পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
Advertisement
জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ডিএফপি অডিটোরিয়ামে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় এ আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘কথাগুলো বলছি অনেক কষ্টে। এ চার-পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা আপনাদের একটু জানা দরকার। আমি দেখছি, কিছুই পরিবর্তন হয়নি। একইভাবে যারা ঘুস খেত, তারা ঘুসের ফাইল আটকে দিচ্ছে। ভালো একটা কাজকেও একইভাবে আটকে দিচ্ছে। ওই যে আমি বললাম, ভোল পাল্টে চলে আসছে। এখন ওরা আরও বড় যোদ্ধা হয়ে গেছে!’
আরও পড়ুন ভোল পাল্টে ঘুসখোররা আগের মতোই ফাইল আটকে দিচ্ছে: মির্জা ফখরুলমির্জা ফখরুল বলেন, ‘কথাগুলো আক্ষেপ করে বলছি। আক্ষেপ এজন্য যে, আমার বয়স অনেক। আমি সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না। তবে আমাদের মধ্যে আশাবাদ রয়েছে। কারণ, আমি একজন মানুষের মধ্যে পরিবর্তন দেখছি—তিনি তারেক রহমান।’
Advertisement
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করছেন, নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি আমরা সবাই মিলে সামনে নিয়ে যাই, তাহলে আমার মনে হয়, হয়তো পরিবর্তনটা হবে। উই মাস্ট অল গিভ হিম সাপোর্ট। সবাই মিলে তাকে সমর্থন দেওয়া দরকার।’
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং পিএসসির সদস্য ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই শহীদ দিবস বিষয়ক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করেন এবং আলোকচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন অতিথিরা।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন করেছি। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো মিলে আমরা অনেক সভা করেছি, বড় বড় সমাবেশ করেছি, পেশাজীবী সমাবেশ করেছি। সব জায়গাতেই একটা কথা মনে হতো এবং উচ্চকণ্ঠে বলতাম, ‘তরুণদের দেখতে পাই না।’ আমি জোর দিয়ে বলেছি, ‘কোথায় আমার সেই তরুণ ও যুবকেরা, যারা পরিবর্তন আনবে?’ তরুণ-যুবক ছাড়া তো পরিবর্তন হয় না। নজরুলের সেই কবিতাও বলতাম, ‘কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
আরও পড়ুন জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না: মির্জা ফখরুলতিনি বলেন, ‘কিন্তু দেখুন, কী অলৌকিকভাবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেই তরুণরা রাস্তায় নেমে এলো! প্রথমে তারা নিজেদের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল, পরবর্তীকালে সেই দাবি পরিণত হলো পরিবর্তনের দাবিতে। খুব পরিষ্কারভাবে, সেই পথ ধরে হাসিনা পালিয়ে গেলেন এবং পরিবর্তন ত্বরান্বিত হলো।’
Advertisement
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অনেক প্রাণ গেছে। আমাদের সন্তানেরা, আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিয়েছে। অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন। আজকেও এখানে উপস্থিত এক ভাইয়ের প্রতিমূর্তি দেখে মনে পড়ছে— আমার ভাইটা চলে গেছে। আমি যে ছবিটা দেখলাম, এক মা এখনো ভুলতে পারছেন না। তিনি হয়তো ভাবছেন, তার ছেলে এখনো ফিরে আসবে।’
দুর্ভাগ্যের কথা উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তখন থেকেই আবার একই গান গাইতে হয়েছে—পরিবর্তন চাই, পরিবর্তন করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের স্বাধীনতার ৫২ বছর হয়ে গেছে। চীনের স্বাধীনতার সময়ও প্রায় একই, কাছাকাছি। পাশের দেশ সিঙ্গাপুরেরও প্রায় একই সময়। তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মানে কোথায় চলে গেছে! আর আমরা এখনো এখানে পড়ে আছি।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যখনই কোনো পরিবর্তনের কথা বলতে হয়েছে, তখনই প্রাণ দিতে হয়েছে- বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই পর্যন্ত। আমরা যারা ক্ষমতায় যাই, নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বলুন আর যেভাবেই বলুন, কিছুদিন পর বোধহয় আমাদের কেমিস্ট্রি কাজ করে। আমার কাছে মনে হয়, একটা রসায়ন কাজ করে- আমি ক্ষমতায় আছি। আমি ছোট করে বলি, ওই চেয়ারটার আলাদা একটা কেমিস্ট্রি আছে। সেই কেমিস্ট্রি আপনাকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শুরু করিয়ে দেয়।’
আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা খুব আশাবাদী। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করব। চেষ্টা করে আমরা দেশটাকে সত্যিকার অর্থেই একটি পরিবর্তিত দেশ, একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, মেধাবীদের বাংলাদেশ এবং তরুণদের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হব। এটাই হোক আজ তাদের (জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের) প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আমাদের একমাত্র শপথ।’
সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও অর্জনকে কেন্দ্র করে যেন কেউ কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, সমাজে যখনই অন্যায় ও শোষণ বেড়েছে, তখনই জনগণ স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে ন্যায়, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধান, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
কেএইচ/এমএএইচ/