শাহারিয়া নয়ন
Advertisement
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে ট্রফি উঠেছে, ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপ যেমন একটি ট্রফির গল্প লিখে যায়, তেমনি কিছু প্রশ্নও রেখে যায়। এবারের আসরও তার ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু একটি প্রশ্ন কি কখনো আমাদের ভাবিয়েছে? মাঠে যে ৯০ মিনিট আমরা দেখি, সেটিই কি পুরো সত্য? নাকি সেই দৃশ্যপটের আড়ালেও থাকে আরও বড় কোনো গল্প যেখানে ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জটিল সমীকরণ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বকাপ শুধু খেলার ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতার ইতিহাসও।
গত প্রায় একশ বছরে বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ফুটবলের বাইরের শক্তিগুলো রাজনীতি, স্বৈরশাসন, যুদ্ধ, কূটনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার সমীকরণ আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কোথাও বিশ্বকাপকে ব্যবহার করা হয়েছে শাসকের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে, কোথাও জাতীয় সংকট আড়াল করার জন্য, আবার কোথাও একটি ম্যাচ পরিণত হয়েছে দুই দেশের রাজনৈতিক সংঘাতের প্রতীকী লড়াইয়ে। এসবের অনেকগুলোই আর নিছক বিতর্ক নয়; ইতিহাসবিদদের গবেষণা, সরকারি নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে সেগুলো আজ ইতিহাসের অংশ।
Advertisement
আমার এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর দেওয়ার দাবি করছে না। কারণ কোনো অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রমাণের দায়িত্ব থাকে। তাই একে ইতিহাসের দলিল বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেগুলো কেবল ফুটবলের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে রাজনীতি, যুদ্ধ, স্বৈরশাসন, অর্থনীতি, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার সমীকরণ বিশ্বকাপকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ নতুন করে দেখার চেষ্টা করাই এই লেখার উদ্দেশ্য।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং ইতিহাসের আলোকে একটি ধারাবাহিক প্রশ্ন উত্থাপন করা। যদি ১৯৩০, ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৭৮, ১৯৮৬ কিংবা ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে আজও গবেষণা হয়, বিতর্ক হয় এবং নতুন দলিল সামনে আসে, তাহলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ নিয়েও প্রশ্ন তোলার অধিকার ইতিহাসই আমাদের দেয়।
তাই এই নিবন্ধের মূল প্রশ্ন একটিই বিশ্বকাপ কি সব সময় শুধু ফুটবলের গল্প ছিল? নাকি কখনো কখনো এটি বিশ্বরাজনীতিরও একটি বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় ১০০ বছর পেছনে, বিশ্বকাপের জন্মের ইতিহাসে।
১৯২০-এর দশকে অলিম্পিক ফুটবলে মূলত অপেশাদার খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। অনেক দেশের পেশাদার ফুটবলার এতে খেলতে পারতেন না। ফলে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুটবল ততদিনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেই জনপ্রিয়তাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে ফিফা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চালু করতে চেয়েছিল। তৎকালীন ফিফা সভাপতি জুল রিমে বিশ্বাস করতেন, ফুটবল বিভিন্ন দেশের মানুষকে একত্রিত করতে পারে। তার নেতৃত্বেই ১৯২৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়।
Advertisement
এই ইতিহাসটুকু মানুষ জানে। কিন্তু এর বিপরীতে যে ভিন্ন ইতিহাস রয়েছে, সেটা খুব কম মানুষ জানেন। বিশ্বকাপ যেমন শুরু হয়েছিল শান্তির বার্তা নিয়ে, ঠিক তেমনি এর পেছনে রয়েছে আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়। বিশ্বকাপ শুরুর পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন ক্ষমতাধর স্বৈরশাসকদের দমন-পীড়নকে বৈশ্বিক দৃষ্টির আড়ালে রাখা এবং সেই শাসনকে বৈধতা দেওয়া।
ব্রিটিশ ফুটবল ঐতিহাসিক ডেভিড গোল্ডব্লাট তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য বল ইজ রাউন্ড: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব ফুটবল (২০০৬)-এ লিখেছেন, বিশ্বকাপের জন্ম নিছক খেলার আনন্দ থেকে নয়, বরং এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৩০-এর দশক থেকেই বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকেরা বিশ্বকাপকে নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
অ্যামেরিকান লেখক ফ্র্যাংকলিন ফোয়ার তার হাউ সকার এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়ার্ল্ড (২০০৪) গ্রন্থে এই সম্পর্কটিকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ফুটবল কখনো কখনো জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে এতটাই মিশে যায় যে খেলা ও রাজনীতির মধ্যে সীমারেখা বলতে কিছু থাকে না।
ডেভিড গোল্ডব্লাট দ্য বল ইজ রাউন্ড গ্রন্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। তিনি লিখেছেন, বিশ শতকের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখনই কোনো দেশে রাজনৈতিক সংকট বা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র হয়েছে, তখনই ফুটবল বা বড় ক্রীড়া আসর সেই মনোযোগকে অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি খাইয়েছিল আর্জেন্টিনা!চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মাঝেই শুরু হয়েছিল ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রায় দুই মাস ধরে বিশ্বকাপ চলাকালে সেই সংঘাত অব্যাহত থাকলেও বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মনোযোগের বড় অংশ ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, এটা একটি পরিচিত ধারা, যার শিকড় রয়েছে ১৯৩০-এর দশকেই।
১৯৩০ বিশ্বকাপ: প্রথম আসরেই বিতর্কবিশ্বকাপের প্রথম ফাইনাল মাঠে গড়ানোর আগেই একটি অভূতপূর্ব বিবাদ তৈরি হয়েছিল। বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস পরে স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘দুই দেশের মধ্যে অসাধারণ বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে উঠল যখন ম্যাচের বল বাছাই করার সময় এল। দুই দলই নিজেদের বলে খেলার দাবি জানাল।’ ফিফা সভাপতি জুল রিমে শেষ পর্যন্ত মাঝামাঝি সিদ্ধান্ত নেন।
আর্জেন্টিনার ‘তিয়েন্তো’ বল প্রথমার্ধে এবং উরুগুয়ের স্কটল্যান্ড থেকে আমদানি করা ‘টি-মডেল’ বল দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। এটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ ফাইনাল যেখানে দুটি ভিন্ন বল ব্যবহার করা হয়। দুটি বলের মধ্যে পার্থক্য ছিল মৌলিক। আর্জেন্টিনার ‘তিয়েন্তো’ তৈরি হয়েছিল ১২টি লম্বা চামড়ার প্যানেল দিয়ে, যা ভারী এবং কম স্থিতিস্থাপক ছিল। উরুগুয়ের ‘টি-মডেল’ ছিল তুলনামূলকভাবে হালকা ও দ্রুতগতি। ফলাফলে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বলে খেলে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে যায়। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা গিইয়ের্মো স্তাবিলে বিরতির ঠিক আগে দ্বিতীয় গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখেন।
কিন্তু বিরতিতে বল বদলের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের গতিপথও বদলে যায়। উরুগুয়ের হালকা বলে দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করে। ৫৭তম মিনিটে পেদ্রো সিয়া সমতা ফেরান, ৬৮তম মিনিটে সান্তোস ইরিয়ার্তে উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন। শেষ বাঁশির ঠিক আগে হেক্তোর কাস্ত্রো চতুর্থ গোল করেন।
ফাইনালের পর বুয়েনস আইরেসে উরুগুয়ের কনস্যুলেটে পাথর ছোড়া হয়েছিল, ক্ষুব্ধ আর্জেন্টাইন সমর্থকদের একটি দল কনস্যুলেট ভবনে হামলা চালায়। বলের এই বিতর্ক শুধু একটি ম্যাচের বিতর্ক নয়, এটি দুই প্রতিবেশী দেশের একশো বছরের ফুটবল দ্বন্দ্বের বীজ বপন করেছিল।
ডেভিড গোল্ডব্লাট দ্য বল ইজ রাউন্ড গ্রন্থে এই বল-বিতর্ককে বিশ্বকাপের প্রথম প্রশাসনিক বিতর্ক হিসেবে নথিভুক্ত করেছেন এবং দেখিয়েছেন, মাঠের বাইরের সিদ্ধান্ত কীভাবে মাঠের ভেতরের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রথম বিশ্বকাপেই সেই শিক্ষা পাওয়া গিয়েছিল।
মুসোলিনির বিশ্বকাপ: ১৯৩৪ ও ১৯৩৮১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্যাসিবাদী ইতালিতে। ইতিহাসবিদ সাইমন মার্টিন তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ফুটবল অ্যান্ড ফ্যাসিজম: দ্য ন্যাশনাল গেম আন্ডার মুসোলিনি (২০০৪)-এ গ্রান্থে দেখিয়েছেন, মুসোলিনি এই আসরে ৩৫ লাখ লিরা বিনিয়োগ করেছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই, ফ্যাসিবাদকে বৈশ্বিক মঞ্চে বৈধতা দেওয়া।
কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো রেফারি নিয়ে। ১৯৩৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ড ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন। ম্যাচের আগের রাতে মুসোলিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান, কথিত আছে ‘কৌশল আলোচনার’ জন্য। পরদিন ইতালি অস্ট্রিয়াকে ১-০ গোলে হারায়। অস্ট্রিয়ার কিংবদন্তি স্ট্রাইকার জোসেফ বিকান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দাবি করে গেছেন, একলিন্ড ঘুষ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রেফারি নিজেই একবার বল স্পর্শ করে সেটি ইতালীয় খেলোয়াড়ের দিকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
এরপর সেই একই রেফারি একলিন্ডকেই ফাইনালে নিয়োগ দেওয়া হয়। এবং ফাইনালের আগে তাকে ফ্যাসিস্ট ভিআইপি বক্সে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ইতালি ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্সে। কিন্তু মুসোলিনির ছায়া সেখানেও ছিল। প্রতিটি ম্যাচের আগের রাতে মুসোলিনি নিজে হাতে প্রতিটি খেলোয়াড়কে একটি করে চিঠি পাঠাতেন। চিঠির বক্তব্য সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়াবহ,‘জিতে আসো, নইলে মরো।’
স্পোর্টসকিডা-র ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে নথিভুক্ত আছে, হাঙ্গেরির গোলরক্ষক আন্তাল জাবো ১৯৩৮ ফাইনালে চারটি গোল হজম করার পরেও বলেছিলেন, ‘আমি চারটি গোল খেয়েছি ঠিকই, কিন্তু ইতালীয় খেলোয়াড়দের জীবন বাঁচিয়েছি।’ ইতালি সেই ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ী হয়।
ইতিহাসবিদ ডেনিস ম্যাক স্মিথ তার মুসোলিনি (১৯৮৩) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মুসোলিনির কাছে ক্রীড়া ছিল রাজনৈতিক প্রচারণার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। দুটি বিশ্বকাপ জয় ইতালিতে ফ্যাসিবাদী শাসনকে জনমানসে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর জে বি বসওয়ার্থ তার মুসোলিনিজ ইতালি: লাইফ আন্ডার দ্য ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরশিপ (২০০৫) গ্রন্থে লিখেছেন, মুসোলিনি বিশ্বকাপকে তার শাসনের বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ইতালির জয়কে ফ্যাসিবাদী আদর্শের বিজয় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল।
মুসোলিনি ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম কুখ্যাত স্বৈরশাসক। তার আমলে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, সামরিক আগ্রাসন এবং নাৎসি জার্মানির সঙ্গে জোট গঠনের মাধ্যমে ইতালি পরিণত হয়েছিল একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে। ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল ইতালীয় প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাকে গুলি করে হত্যা করে।
১৯৭৮ বিশ্বকাপ: স্টেডিয়ামের পাশেই ছিল নির্যাতন কক্ষ১৯৭৬ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনায় সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে। এরপর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অধ্যায়, যা 'ডার্টি ওয়ার' বা 'গেরা সুসিয়া' নামে পরিচিত।
আরও পড়ুন স্পোর্টসম্যানশিপের যে লড়াইয়ে আমরা হেরে যাচ্ছিআর্জেন্টিনার মানবাধিকার সংস্থা কোনাডেপ-এর ১৯৮৪ সালের সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন নুনাক ম্যাশ (আর কখনো নয়)-এ নথিভুক্ত হয়েছে, এই সময়ে অন্তত ৩০ হাজার মানুষকে গুম, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদন আজও আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
ব্রিটিশ সাংবাদিক জোনাথন উইলসন তার অ্যাঞ্জেলস উইথ ডার্টি ফেসেস: দ্য ফুটবলিং হিস্ট্রি অব আর্জেন্টিনা (২০১৬) গ্রন্থে লিখেছেন, ১৯৭৮ বিশ্বকাপ আয়োজন ছিল ভিদেলা সরকারের একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রকল্প। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আর্জেন্টিনাকে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে উপস্থাপন করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো, বুয়েনস আইরেসের যে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ম্যাচ হয়েছিল, তার মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে ছিল নৌবাহিনীর কুখ্যাত নির্যাতন কেন্দ্র ইএসএমএ। মানবাধিকার গবেষক মার্গুয়েরিতে ফেইতলোউইৎজ তার গ্রন্থ আ লেক্সিকন অব টেরর: আর্জেন্টিনা অ্যান্ড দ্য লেগাসিজ অব টর্চার (১৯৯৮, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস)-এ বেঁচে ফেরা বন্দিদের সাক্ষ্য তুলে ধরেছেন। তারা জানিয়েছেন, স্টেডিয়ামে যখন দর্শকেরা গোলে উল্লাস করছিলেন, তখনো ইএসএমএ-র কক্ষগুলোতে বন্দিদের নির্যাতন চলছিল। আর্তনাদ ঢেকে যাচ্ছিল গ্যালারির উল্লাসে।
হ্যান্ড অব গড: মাঠের প্রতিশোধ ও ইতিহাসের ক্ষত১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছিলেন। যুদ্ধে পরাজয় ও দ্বীপ হাতছাড়া হওয়ার ক্ষোভ আর্জেন্টিনার সমাজে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ইতিহাসবিদ লরেন্স ফ্রিডম্যান তার দ্য অফিশিয়াল হিস্ট্রি অব দ্য ফকল্যান্ডস ক্যাম্পেইন (২০০৫, রুটলেজ) গ্রন্থে এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও মানবিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করেছেন।
চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করেন। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেছিলেন, গোলটি হয়েছে ‘ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে সামান্য এবং ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’
কিন্তু ম্যারাডোনার আত্মজীবনী এল দিয়াগো (২০০০)-এ তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, ওই গোল ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইন সেনাদের প্রতি তার শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি ইংরেজদের পকেট চুরি করেছিলাম। এটা ছিল সেই যুদ্ধের প্রতিশোধ।’
আরও পড়ুন আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয় আজও কেন ‘বিতর্কিত’?ব্রিটিশ ফুটবল লেখক জিমি বার্নস তার ম্যারাডোনা: দ্য হ্যান্ড অব গড (১৯৯৬) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, এই গোল শুধু একটি নিয়মবহির্ভূত গোল ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা। লাতিন আমেরিকার কোটি মানুষের কাছে এই গোল ছিল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী জবাব।
২০২৬ সালের সেমিফাইনালে আবারো ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে আর্জেন্টিনা। ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেছেন দলটির ফুটবলাররা। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্ব এখনো অমীমাংসিত। মাঠের এই লড়াই তাই নিছক ফুটবল নয়, এটি শতবছরের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
ফুটবলের ইতিহাসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির নতুন নয়। ১৯৩৪ ও ৩৮ সালে মুসোলিনির ইতালি, ১৯৭৮ সালে ভিদেলার আর্জেন্টিনা এবং ১৯৮২ সালে স্পেনে কুয়েতের রাজপরিবারের মাঠে নেমে আসার ঘটনা, ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে বিশ্বকাপের মাঠ কখনো কখনো রাজনীতির বাইরে থাকে না। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়েও সেই একই প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে আমাদের জানা প্রযোজন বিশ্বকাপ ফুটবলে মাঠের খেলায় আমার যা দেখি তা কতটা সত্য? উচ্চশ্রেণির খেলায় নিম্নশ্রেণির চিৎকার-
চলবে.........
লেখক: ফিচার লেখক ও সাংবাদিক
কেএসকে