অর্থনীতি

খাদ্যপণ্যের দাম কোথায় বাড়ে, শনাক্তে ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু হচ্ছে

কৃষকের খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামের ব্যবধান ঠিক কোন স্তরে কতটা বাড়ছে, তা শনাক্তে সরকার ট্রেসেবিলিটি (পণ্য অনুসরণ) ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

Advertisement

তিনি জানান, এর মাধ্যমে উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে মূল্য বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, চাঁদাবাজি ও বাজারের অদক্ষতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র‍্যাক ইন সেন্টারে ‘বাংলাদেশের খাদ্য মূল্য শৃঙ্খল: বাজার, মুনাফার হার (লাভের মার্জিন) এবং মধ্যস্বত্বভোগী (দালাল বা ফড়িয়া)’ শীর্ষক ডায়ালগে তিনি এসব কথা বলেন।

আরও পড়ুন খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি নিম্নআয়ের মানুষের ওপর: সিপিডি

লজিস্টিকসের বাড়তি কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে বেশি জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের লজিস্টিকস কস্ট হাই। সারা পৃথিবীর অ্যাভারেজ লজিস্টিকস কস্ট স্ট্যান্ডার্ড দেখলে দেখবেন তা জিডিপির ১০ শতাংশ। আমাদের এখানে ১৬ শতাংশ। আমাদের এখানে সমস্যা অনেক। 

Advertisement

তার ভাষ্যে, এসব সমস্যা থেকে বের হতে হলে লজিস্টিকস কস্ট কমাতে হবে, ইনপুট কস্ট কমাতে হবে। পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি কমাতে হবে। কমানোর এই লাইনগুলো ধরার জন্য আমরা অনেকগুলো আইটেমের ওপর ট্রেসিবিলিটি করতে যাচ্ছি। এটা যদি আমরা করে ফেলতে পারি তাহলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে তা আমরা চিহ্নিত করতে পারবো।

কৃষক বাজার সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য পান না জানিয়ে তিনি বলেন, দুই বছর ধরে এক কোটি টনের ওপরে আলু উৎপাদন করি। দুই বছর আগেও কৃষক টাকা পাননি। গত বছরও পাননি। না পাওয়ার পরও, আবার এক তৃতীয়াংশ আমাদের কনজামশনের বাইরে থাকার পরও কেন কৃষক তৃতীয় বছরেও সমপরিমাণ আলু উৎপাদন করতে যাচ্ছে? তার মানে কৃষকের কাছে সঠিক তথ্যটা যাচ্ছে না। অথবা এই সহজ চাষটা বাদ দিয়ে এই জায়গায় কী রিপ্লেসমেন্টে সে যেতে পারে, এটার জন্য তার কাছে প্রপার ইনপুট নেই।

আরও পড়ুন বাজার চড়া, অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রভাব মাছ সবজি ডিমে

কৃষকের সক্ষমতা বাড়াতে হলে বিনিয়োগ প্রয়োজন জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের যে কৃষির বিপ্লব, মোস্টলি অর্গানিক উপায়ে হয়েছে। খুব যে অবকাঠামোর মাধ্যমে হয়েছে কিংবা গবেষণার মাধ্যমে হয়েছে তা নয়। সব সরকারের তৎপরতা ছিল। সার এবং বীজে এখনো অনেক ভর্তুকি দেওয়া হয়। 

তিনি বলেন, আমরা আমেরিকা কিংবা সৌদি আরব নই। মাটির নিচে অফুরন্ত তেল-গ্যাস নেই আমাদের। কিন্তু আমাদের কৃষিজমি আছে। সেটার পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। কৃষি একটি নাজুক খাত, এখানে সবসময়ই সরকারের নজর দিতে হবে, সুযোগসুবিধা দিতে হবে। এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যাবে না। খাদ্য নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। কিন্তু বিষয়টি নাজুক।

Advertisement

প্রডাক্টিভিটি আমরা যত বাড়াবো, তত ফার্মারের এবিলিটিও আসবে, সে অ্যাগ্রিগেট ভ্যালু তত বেশি পাবে বলে জানান মন্ত্রী।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, যে কোনো অর্থনীতির ওপরে মূল্যস্ফীতি একটা পেইন। যত সমৃদ্ধশীল অর্থনীতি হোক, যার পারচেজিং পাওয়ার অনেক হাই তার জন্যও পেইন। আর আমাদের মতো স্ট্রাগলিং ইকনোমির জন্য মূল্যস্ফীতি অনেক বড় পেইন।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ক্রয় ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে আমরা একটা দীর্ঘসময় নিম্ন মূল্যস্ফীতি উপভোগ করেছি, মডারেট মূল্যস্ফীতিতে ছিলাম, এটা গত কয়েক বছর যাবৎ, বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি আমাদের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন যুদ্ধ-বন্যার চাপ সংসারে, বাড়ছে দুশ্চিন্তা

গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, খাদ্যমূল্য বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি কমে যায়। তাই বাজারে কার্যকর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।

সাবেক সচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আগে সরকার ধান ও গমের বাজারে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করতো। দাম বেড়ে গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং দাম কমে গেলে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হতো। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবে সরকারের সেই ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, শুধু কর কমিয়ে বাজারে দাম কমানো সম্ভব হয় না। এজন্য সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তিনি ২০০৮ সালের একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভোজ্যতেলের ওপর ভ্যাট কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা লিখিতভাবে দাম কমানোর নিশ্চয়তা দিতে রাজি হননি। কারণ শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এতে বোঝা যায়, বাজার ব্যবস্থার ভেতরেই কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, যা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুবিধা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। অনেক কৃষক এখনো কৃষিঋণ থেকেও বঞ্চিত।

কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা উন্নত করা। কৃষি যখন বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে, তখন বাজার ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। তাই বাজার ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ করতে হবে।

এসএম/ইএ