ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার স্যার গ্যারি সোবার্স। ব্যাট, বল কিংবা ফিল্ডিং- খেলার প্রতিটি বিভাগেই তিনি ছিলেন অনন্য। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও সোবার্সকে আলাদা করে তুলেছিল তার ব্যক্তিত্ব, রাজকীয় উপস্থিতি আর মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অদ্ভুত এক আকর্ষণ।
Advertisement
বিখ্যাত ক্রীড়া লেখক ও পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক ডানকান হ্যামিল্টন তার নতুন বই ‘দ্য ম্যান হু ওয়াকড আউট অফ দ্য সান’-এ সোবার্সকে নিয়ে লিখেছেন হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতিচারণ। সেখানে তিনি তুলে ধরেছেন, কিভাবে ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম সোবার্সকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং কেন তিনি ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
হ্যামিল্টন লিখেছেন, তার শৈশবে টেলিভিশনে খেলাধুলা দেখার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। তখন মাত্র তিনটি টিভি চ্যানেল ছিল, রঙিন সম্প্রচারও শুরু হয়নি। ছোট সাদাকালো টিভির ঝাপসা পর্দায় ক্রিকেটারদের স্পষ্টভাবে দেখা যেত না। অনেক সময় বল দেখতেই টিভির একেবারে কাছে গিয়ে বসতে হতো।
সেই সময় টেলিভিশনে এক ম্যাচে টেড ডেক্সটার, মনসুর আলি খান পতৌদি, ডেনিস কম্পটন, জিম লেকার ও ফ্রেড ট্রুম্যানের মতো কিংবদন্তিরা খেললেও, ছোট্ট হ্যামিল্টনের চোখ আটকে ছিল শুধু একজনের দিকেই- গ্যারি সোবার্স।
Advertisement
হ্যামিল্টনের ভাষায়, ক্রিকেট সম্পর্কে তখন তার জ্ঞান ছিল সীমিত। কিন্তু প্রথম দেখাতেই বুঝতে পেরেছিলেন, সোবার্স অন্যদের মতো নন। তার মতে, সোবার্সের হাতে ছিল শিল্প, শরীরে ছিল অনন্য সৌন্দর্য আর চলাফেরায় ছিল স্বাভাবিক রাজকীয়তা। লর্ডসে খেলুন কিংবা কোনো ছোট মাঠে, সোবার্সের সব জায়গাতেই ছিলেন উজ্জ্বল উপস্থিতি।
তিনি কখনো বাড়তি নাটকীয়তা কিংবা দর্শক টানার কৃত্রিম চেষ্টা করতেন না। তারপরও দর্শকদের চোখ সবসময় থাকত তার দিকেই।
ব্যাট হাতে সোবার্স ছিলেন ভয়ংকর আক্রমণাত্মক। কখনো এমন জোরে বল মারতেন যে মনে হতো বলের সেলাই খুলে যাবে। আবার পরের মুহূর্তেই খেলতেন নিখুঁত লেট কাট, যা ছিল শিল্পের মতো কোমল।
বল হাতে কখনো গতিতে, কখনো সুইংয়ে, আবার কখনো স্পিনের বৈচিত্র্যে ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করতেন। ফিল্ডিংয়েও ছিলেন অসাধারণ। বিশেষ করে স্লিপে তার ক্ষিপ্রতা ছিল চোখে পড়ার মতো। হ্যামিল্টনের মতে, ক্রিকেট মাঠে এমন কোনো কাজ ছিল না, যা সোবার্স করতে পারতেন না।
Advertisement
লেখকের মতে, সোবার্সের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব। উইকেট নেওয়ার পর কিংবা দুর্দান্ত শট খেলার পর ক্যামেরা যখন তার মুখের ক্লোজআপ দেখাত, তখন তার ছোট গোঁফ, হাসি আর আত্মবিশ্বাসী চেহারা দর্শকদের মুগ্ধ করত।
হলিউড তারকাদের সম্পর্কে সাহিত্যিক জেমস বল্ডউইনের একটি বিখ্যাত মন্তব্য উদ্ধৃত করে হ্যামিল্টন লিখেছেন, ‘মানুষ তাদের অভিনয় দেখতে যেত না, তারা কেবল তাদের দেখতে যেত।’
হ্যামিল্টনের মতে, গ্যারি সোবার্সও ছিলেন ঠিক তেমনই একজন। মানুষ শুধু তার ব্যাটিং বা বোলিং দেখতে মাঠে যেত না, বরং তাকে মাঠে হাঁটতে দেখার জন্যও যেত।
লেখকের স্মৃতিতে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে সোবার্সের ক্রিজে যাওয়ার দৃশ্য। ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে হাঁটা, হাতে ব্যাট ঘোরানো, আকাশের দিকে একবার তাকানো, উঁচু করে রাখা শার্টের কলার আর হাতার বোতাম লাগানো পোশাক- সব মিলিয়ে তিনি যেন রাজা।
হ্যামিল্টন লিখেছেন, সোবার্স যখন ট্রেন্ট ব্রিজের প্যাভিলিয়নের সিঁড়ি বেয়ে নামতেন, তখন মনে হতো যেন কোনো সম্রাট আগমন করছেন। এমনকি মজা করে তিনি লিখেছেন, নটিংহ্যামশায়ারের উচিত ছিল তার জন্য লাল গালিচা বিছানো এবং ২৫ সদস্যের ব্যান্ড দিয়ে রাজকীয় সুর বাজানো।
ডানকান হ্যামিল্টনের মতে, গ্যারি সোবার্সকে কেবল তার রান, উইকেট বা রেকর্ড দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। তিনি ছিলেন এমন একজন ক্রিকেটার, যার উপস্থিতিই ছিল দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
মাঠে তার প্রতিটি পদচারণা, প্রতিটি শট, প্রতিটি ডেলিভারি এবং প্রতিটি মুহূর্ত দর্শকদের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। সেই কারণেই ক্রিকেট ইতিহাসে গ্যারি সোবার্স কেবল একজন কিংবদন্তি নন, তিনি ছিলেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম, যার খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল কোটি কোটি মানুষের।
আইএইচএস/