মরক্কো সীমান্ত থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতায় (Ceuta) প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। সীমান্তে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করার এ ঘটনায় অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংবাদ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এবং ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা মন্ড।
Advertisement
অঞ্চলটিতে অভিবাসীদের এমন ঢল নামলে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, এভাবে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন। স্পেনের অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন এসেছে বলে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে হাজারো মানুষকে সীমান্তে জড়ো করেছে মানবপাচারকারী চক্র।
তবে, এ ঘটনার স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার (৩১ জুলাই) প্রায় ২৫ হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসন দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ সংকট ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শেনজেন অঞ্চলে স্পেনের সদস্যপদ সাময়িক স্থগিতের বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছে ইতালি।
Advertisement
অভিবাসীরা সেউতা (Ceuta)-য় প্রবেশ করতে চান মূলত ইউরোপে পৌঁছানোর আশায়। এর পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ হচ্ছে-
ক) সেউতা ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকায় হলেও এটি স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর এবং স্পেনের অংশ। ফলে এটি কার্যত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ভূখণ্ড।
খ) মরক্কোসহ বিভিন্ন আফ্রিকান ও এশীয় দেশের অনেক মানুষ ইউরোপে ভালো চাকরি, উচ্চ আয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগের জন্য সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
গ) যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্যাতন বা দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে আসা অনেক মানুষ ইউরোপে আশ্রয় (Asylum) পাওয়ার আশা করেন।
Advertisement
ঘ) মানবপাচারকারী চক্র প্রায়ই ভুল তথ্য ছড়ায় যে, সেউতায় ঢুকতে পারলেই সহজে ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়া যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
তবে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেউতায় প্রবেশ করলেই ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়া যায় না। সেউতা শেনজেন অঞ্চলের বিশেষ নিয়মের আওতায় পরিচালিত হয়। সেখানে প্রবেশের পরও অভিবাসীদের মূল ভূখণ্ডের স্পেনে যেতে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, পরিচয় যাচাই এবং অভিবাসন আইন মেনে চলতে হয়। বৈধ অনুমতি বা আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ না হলে অনেককেই মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়।
সিউতা অঞ্চলের ইতিহাস ও পরিচিতিসিউতা (Ceuta) উত্তর আফ্রিকার উপকূলে জিব্রাল্টার প্রণালির পাশে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। সাড়ে ১৮ বর্গকিলোমিটারের অঞ্চলটিতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের বসবাস। এটি প্রাচীন কার্থাজিনিয়ান বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে রোমান, আরব ও পর্তুগিজ শাসনের মধ্য দিয়ে বর্তমান স্প্যানিশ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে কার্থাজিনিয়ানরা এই ভূখণ্ডটি প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে এটি রোমান সাম্রাজ্য এবং ভিসিগথদের অধীনে ছিল। অষ্টম শতাব্দীতে এটি ইসলামিক খিলাফতের অংশ হয় এবং বারবার উপজাতির নিয়ন্ত্রণে আসে।
আলোচনায় জিব্রাল্টার প্রণালি
স্পেন এবং মরক্কোর মধ্যে বিভক্তকারী জলপথের নাম জিব্রাল্টার প্রণালি। এই আন্তর্জাতিক জলপথটি ভূমধ্যসাগরের একমাত্র প্রবেশদ্বার। এই প্রনালিটির উত্তর তীরে যুক্তরাজ্যের (জিব্রাল্টার) একটি ছোট অংশ রয়েছে যা রক অব জিব্রাল্টার নামে পরিচিত। এই প্রণালির কাছেই অবস্থিত স্পেনের কৌশলগত সামরিক ও বাণিজ্য বন্দর সেউতা। তাই, এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গুরুত্ব অনেক।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ তাই কোনো দেশই এর ওপর একক সার্বভৌমত্ব দাবি বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে পারে না।
১. স্পেনের নিয়ন্ত্রণ
প্রণালির উত্তর উপকূলের সিংহভাগ স্পেনের মূল ভূখণ্ডের অধীনে। প্রণালির দক্ষিণ তীরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সিউতা অবস্থিত থাকায় প্রণালীর দুই পাশেই স্পেনের জলসীমা রয়েছে। ফলে কৌশলগতভাবে স্পেন এখানে সবচেয়ে বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
২. মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ
প্রণালির দক্ষিণ উপকূলের (উত্তর আফ্রিকা) মূল অংশটি মরক্কোর সীমানায় পড়েছে। স্পেন ও মরক্কোর মধ্যবর্তী ১২ নটিক্যাল মাইল জলসীমা নীতি অনুযায়ী, প্রণালির দক্ষিণ অংশের জলভাগের মালিকানা মরক্কোর।
লিসবন চুক্তিলিসবন চুক্তি বলতে মূলত ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সংস্কারকল্পে স্বাক্ষরিত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিকে বোঝায়। এই চুক্তিটি ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। তবে, ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ১৬৬৮ সালেও পর্তুগাল ও স্পেনের মধ্যে একই নামে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
আধুনিক লিসবন চুক্তি
এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্কার চুক্তি। এর মূল লক্ষ্য ছিল জোটের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা। এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় কাউন্সিলের একজন স্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক একজন উচ্চ প্রতিনিধি (High Representative) পদ তৈরি করা হয়।
এর মাধ্যমে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইন প্রণয়ন এবং বাজেট পাসের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়। এই চুক্তির আর্টিকেল ৫০ এর মাধ্যমে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে যাওয়ার (যেমন: যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট) আইনি কাঠামো বা নিয়ম যুক্ত করা হয়।
ঐতিহাসিক লিসবন চুক্তি
১৬৬৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি স্পেনের মাদ্রিদ রাজবংশ এবং পর্তুগালের মধ্যে এই শান্তি চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৬০ বছরের স্প্যানিশ শাসন (আইবেরিয়ান ইউনিয়ন) অবসান ঘটিয়ে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে পর্তুগালের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে পর্তুগালের নতুন শাসক দল হিসেবে ব্রাগাঞ্জা রাজবংশ পূর্ণ বৈধতা পায়। আফ্রিকায় অবস্থিত স্প্যানিশ শহর সিউতা এই চুক্তির মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে পর্তুগাল থেকে স্পেনের হাতবদল হয়েছিল।
পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ শাসন১৪১৫ সালে পর্তুগাল এটি দখল করে। ফলে আধুনিক যুগের শুরুতে সিউতা মরক্কোর ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়। ১৫৮০ সালে পর্তুগালের সাথে স্পেনের রাজবংশীয় মিলনের পর এটি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৬৬৮ সালে লিসবনের চুক্তির মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
সেউতা নিয়ে স্পেন-মরক্কোর ভিন্ন দাবিসেউতা ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সামরিক ও বাণিজ্য বন্দর। ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকায় অবস্থিত হলেও এটি রাজনৈতিকভাবে স্পেনের অংশ এবং মরক্কো এর মালিকানা দাবি করে আসছে। ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত হওয়ায় মরক্কো সিউতাকে (এবং অপর শহর মেলিলাকে) তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড বলে দাবি করে। তারা একে স্পেনের উপনিবেশ হিসেবে গণ্য করে।
স্পেন এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। স্পেনের যুক্তি হলো, মরক্কো রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হওয়ার (১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা লাভ) বহু শতাব্দী আগে থেকেই সিউতা স্পেনের অংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থানসিউতা রাজনৈতিকভাবে স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর হওয়ায় এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ। ফলে, এটি আফ্রিকার একমাত্র স্থল সীমান্ত যা সরাসরি ইউরোপীয় অঞ্চলের সাথে যুক্ত। তাই প্রতি বছর হাজার হাজার আফ্রিকান অভিবাসী উন্নত জীবনের আশায় সিউতার কাঁটাতারের সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে যা স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে প্রায়শই কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করে।
সম্প্রতি এই অভিবাসী সংকটকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিস্থিতিকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে বলেছে, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় স্পেনকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে ইইউ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, স্টাডি ডট
কেএম