‘আমরা শিক্ষকদের ভয় পেতাম। তবে সেটা ছিল শ্রদ্ধার ভয়। তারা আমাদেরকে মন দিয়ে পড়াতেন। আমাদের গড়ে তুলতেন। আমরা চেষ্টা করেছি তাদের শিক্ষা নিয়ে এ পর্যন্ত আসতে। খুব মিস করি বরগুনা জিলা স্কুলকে। আমি যতটুকই ক্ষুদ্র বা যাই হতে পেরেছি, মনে করি স্কুলের শিক্ষক, পরিবেশ, ঘাস-মাটি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
Advertisement
আবেগাপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলেন বরগুনা জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও জনপ্রিয় অভিনেতা মীর সাব্বির। শুধু তিনি নন, ঐতিহ্যবাহী এ স্কুলের প্রতিটি প্রাক্তন ছাত্রেরই একই আবেগ কাজ করে তাদের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এই বিদ্যালয় ঘিরে। তবে শতাব্দীর ইতিহাস, আধুনিক বহুতল ভবন, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, আইসিটি ল্যাব থাকলেও শিক্ষক সংকটে ভুগছে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ বরগুনা জিলা স্কুল।
শিক্ষক সংকটে বাধ্য হয়েই এক বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে আরেক বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের। এতে স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পাঠদানে ব্যর্থ হচ্ছেন শিক্ষকরা। এমন অভিযোগ বর্তমানে স্কুলটিতে ভর্তি থাকা বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের।
তবে শিক্ষক সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
Advertisement
‘বিজ্ঞান বিভাগে সবথেকে বেশি শিক্ষক সংকট। আমাদের অনেক বিষয়েরই নির্ধারিত শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা ক্লাস নেন। আমাদের পড়া বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। আবার শিক্ষকদেরও অতিরিক্ত ক্লাস করাতে গিয়ে আমাদের বোঝাতে কষ্ট হচ্ছে।’
১৯২৭ সালে বরগুনা এম.ই. স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৩১ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৯৩৮ সালে পূর্ণাঙ্গ হাই স্কুল এবং ১৯৭০ সালে সরকারি জিলা স্কুলে রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘ এই পথচলায় অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থী দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে অবদান রেখে চলেছেন। এমনকি এই স্কুল থেকে পড়ে বর্তমানে নাসায় কর্মরত রয়েছেন একজন। অথচ বর্তমানে শিক্ষক সংকটের কারণে সেই গৌরব ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক থাকলেও, সহকারী প্রধান শিক্ষকের দুটি পদই শূন্য। বিষয়ভিত্তিক পদেও নেই শিক্ষক। বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষকের পদ ৮টি করে থাকলেও কর্মরত আছেন ২ জন করে, গণিত শিক্ষকের পদ ৮টি, আছেন ৫ জন। ভৌতবিজ্ঞান শিক্ষকের পদ ছয়টি থাকলেও নেই একজনও। সামাজিক বিজ্ঞান পদে ৪ জন থাকার কথা থাকলেও আছেন ১ জন। ব্যবসায়ী শিক্ষা পদে ২ জনে আছেন ১ জন। এছাড়া ইসলাম ধর্মে ১ জন, শারীরিক শিক্ষায় ১ জন, কৃষি শিক্ষায় ১ জন, চারুকারুতে ২ জন, জীববিজ্ঞানে ২ জন এবং ভূগোলে আছেন ২ জন। এছাড়াও বিদ্যালয়টিতে নেই আইসিটি শিক্ষক ও হিন্দু ধর্মের আলাদা কোনো শিক্ষক।
আরও পড়ুন স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / ২০০ বছরের রংপুর জিলা স্কুলের মাঠজুড়ে সাজানো রঙিন শৈশবস্কুলে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বরগুনা জিলা স্কুলে মূল ফটক থেকে প্রবেশ করেই প্রথমেই রয়েছে পরিপাটি ৩ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন। এরসঙ্গেই লাগোয়া দ্বিতল নতুন আরেকটি ভবন। এ ভবনেই রয়েছে শিক্ষক মিলনায়তন, প্রধান শিক্ষকের কক্ষসহ অফিস কক্ষ। এখানে রয়েছে আটটি অত্যাধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, হলরুম। রয়েছে প্রতি ফ্লোরেই আলাদা আলাদা ওয়াশরুম।
Advertisement
‘পরীক্ষায় অনেক প্রশ্নই আমরা ভুল পাই। কারণ আমাদের বিজ্ঞান শাখায় রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে শিক্ষক নেই। অন্য স্যারদের দিয়ে প্রশ্ন করানোর ফলে আমাদের প্রায়ই এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যদিও স্যারদের বলার পর আবার প্রশ্ন ঠিক করে দেন।’
বিদ্যালয়ের অপর পাশে আছে একতলা একটি পুরাতন ভবন। এর পেছনে নির্মাণ হচ্ছে আধুনিক সুবিধাসহ একটি ছয়তলা ভবন। এছাড়া বিদ্যালয়ের নিজস্ব মসজিদ ও ছাত্রদের থাকার আবাসিক হোস্টেল। তবে সব সুযোগ সুবিধা থাকলেও শিক্ষক সংকটে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে বিদ্যালয়টি।
জিলা স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে জানিয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আল-হাসনাইন হামি জাগো নিউজকে জানায়, ‘আমাদের স্কুলে ৫২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ২৫ জন। এরমধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে সবথেকে বেশি শিক্ষক সংকট। আমাদের অনেক বিষয়েরই নির্ধারিত শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা ক্লাস নেন। আমাদের পড়া বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। আবার শিক্ষকদেরও অতিরিক্ত ক্লাস করাতে গিয়ে আমাদের বোঝাতে কষ্ট হচ্ছে।’
বিদ্যালয়ে আধুনিক আইসিটি ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলেও নেই আইসিটি শিক্ষক, পড়া বুঝতে কষ্ট হয় জানিয়ে রাসেদুজ্জামান নাদিপ নামের এক শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে জানায়, ‘আমাদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমসহ আধুনিক আইসিটি ল্যাব রয়েছে। তবে আইসিটি শিক্ষক নেই। তাই অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা আমাদের আইসিটি ক্লাস নেন। এক্ষেত্রে তারা অতটা ভালোভাবে আমাদেরকে বোঝাতে পারেন না। আমরা চাই আমাদের জন্য আলাদা আইসিটি শিক্ষক দেওয়া হোক।’
আরও পড়ুন পাবনা জিলা স্কুল / যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকটপদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে না থাকায় প্রশ্নপত্র ভুল হয় জানিয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইহান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরীক্ষায় অনেক প্রশ্নই আমরা ভুল পাই। কারণ আমাদের বিজ্ঞান শাখায় রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে শিক্ষক নেই। অন্য স্যারদের দিয়ে প্রশ্ন করানোর ফলে আমাদের প্রায়ই এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যদিও স্যারদের বলার পর আবার প্রশ্ন ঠিক করে দেন। কিন্তু এভাবে ভুল প্রশ্ন হলে আমরা সঠিকভাবে লেখাপড়া করতে পারছি না, আমরা চাচ্ছি আমাদের এই দুই বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক আনা হোক।’
‘আসলে সরকার মেধাবী শিক্ষকদের ধরে রাখতে পারছে না। এর একমাত্র কারণ যথাসময়ে শিক্ষকদের পদ সমতায়ন না হওয়া। তাই মেধাবীরা এসেও আবার বিসিএস বা অন্য চাকরিতে চলে যাচ্ছেন। তাই যদি সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রমোশনসহ পদ মূল্যায়ন করা যায় তাহলে এই সংকট কেটে যাবে বলে আমি মনে করি।’
চাকরি গ্রেড সমতায়ন না থাকায় মাধ্যমিকে শিক্ষকরা থাকছেন না জানিয়ে বরগুনা জিলা স্কুলের ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক মো. রাসেদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সারা দেশেই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। আসলে সরকার মেধাবী শিক্ষকদের ধরে রাখতে পারছে না। এর একমাত্র কারণ যথাসময়ে শিক্ষকদের পদ সমতায়ন না হওয়া। তাই মেধাবীরা এসেও আবার বিসিএস বা অন্য চাকরিতে চলে যাচ্ছেন। তাই যদি সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রমোশনসহ পদ মূল্যায়ন করা যায় তাহলে এই সংকট কেটে যাবে বলে আমি মনে করি।’
একেকজন ডাবল ক্লাস নিচ্ছেন জানিয়ে শিক্ষক মো. আল হাদী দুলাল জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে, তাই প্রধান শিক্ষকেরও ক্লাস নিতে হয়। এছাড়া আমরাতো ডাবল ক্লাস নিই। আমরা প্রতিদিন সাতটা করে ক্লাস নিই। এই অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার কারণে আমরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকি। এতে স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রদের মধ্যে কিছু ঘাটতি থেকে যায়। আমরা শিক্ষকরা পরিশ্রম করি ঠিকই, কিন্তু ছাত্রদের কাছ থেকে যে আউটপুট আমরা আশা করি সেটা কম পাচ্ছি। আর যেহেতু আমাদের সাইন্সের শিক্ষক নেই, সেই ঘাটতি অন্যদিক দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। জন্য আমাদের সাইন্সের রেজাল্ট খুব ভালো হচ্ছে না। এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন যশোর জিলা স্কুল / সংকটেও অম্লান ২০০ বছরের ঐতিহ্যঅভিনেতা মীর সাব্বিরের অভিনয় জীবনের শুরু মূলত এই বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকেই। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় বরগুনা জিলা স্কুলের সঙ্গে বিভিন্ন স্কুলের কালচারাল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। যেমন আবৃত্তি, গান, রচনা প্রতিযোগিতা। আমি এগুলোতে অংশ নিতাম এবং প্রথম বা দ্বিতীয়র মধ্যেই থাকতাম। শিক্ষকরা আমাদের অনেক সহযোগিতা করতেন। এছাড়া ফুটবল খেলা হতো। আরেকটি বিষয় আমরাই প্রথম জিলা স্কুলে আন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। যেটি এখন জাতীয় পর্যায়ে পর্যন্ত আন্ত স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। শুনেছি এখনো বরগুনা জিলা স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় ভালো করছে।’
এ বিষয়ে বরগুনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল ওহাব জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এই স্কুলে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। আমাদের আইসিটি শিক্ষক, কৃষি শিক্ষক ও হিন্দু ধর্মের জন্য আলাদা কোনো শিক্ষক নেই। এছাড়া বিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষক নেই। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শিক্ষক সংকটের কারণে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছি। অথচ আমাদের এই স্কুলটি জাতীয়করণ হয়েছে ১৯৭০ সালে। সেই থেকেই এই স্কুলে পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট করে বিভিন্ন অঙ্গনে আমাদের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। আমাদের স্কুলের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে না নাসায় কর্মরত। প্রশাসনিকসহ নাট্যাঙ্গন, আইন অঙ্গনেও আমাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আছে। সীমিত সংখ্যক শিক্ষক দিয়ে আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের ভালো রেজাল্ট করানোর। তবে শিক্ষক সংকট দূর হলে বরগুনা জিলা স্কুল আরও সুনাম অর্জন করতে পারবে।’
এফএ/এএসএম