দেশজুড়ে

১৫ গ্রামের মানুষের ভরসা ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সেতু

চাঁদপুরের শুয়ারুল গ্রামে একটি জরাজীর্ণ কাঠের সেতু স্থানীয় মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে স্থায়ী সেতুর অভাবে এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে কাঠ বসিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করলেও সেটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু দিয়ে পার হচ্ছেন প্রায় ১৫টি গ্রামের হাজারো মানুষ।

Advertisement

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কচুয়া উপজেলার সাচার ইউনিয়নের শুয়ারুল গ্রামের কাঠের সেতুর বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। কোথাও কাঠ দেবে গেছে, কোথাও আবার বড় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। সেতুর ওপর দিয়ে হাঁটার সময় প্রতিটি পদক্ষেপেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাঠ পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তারপরও বিকল্প কোনো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই মানুষ এই সেতু ব্যবহার করছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুয়ারুল গ্রাম ছাড়াও আশপাশের প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ। প্রতিদিন শত শত মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য এ সেতুর ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি সংস্কার বা নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়ায় এলাকাবাসীর দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদের জানান, আমরা বছরের পর বছর ধরে এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়েই চলাচল করছি। জনপ্রতিনিধিদের কাছে বহুবার গিয়েছি, প্রশাসনের কাছেও আবেদন করেছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বাধ্য হয়েই আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে কাঠ কিনে সেতুর ওপর বসিয়েছি। কিন্তু এটি কোনো সমাধান নয়। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা দ্রুত একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

Advertisement

এলাকাবাসী জানান, কৃষকরা প্রতিদিন ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে এই সেতু ব্যবহার করেন। ব্যবসায়ীরা দোকানের মালামাল পরিবহন করেন একই পথে। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, নির্মাণসামগ্রী, কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে সবাইকে ঝুঁকি নিয়েই পারাপার হতে হয়। ভারী মালামাল বহনের সময় অনেকেই সেতুর মাঝপথে আটকে পড়েন। ফলে সামান্য অসাবধানতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ভুক্তভোগী জামাল উদ্দিন জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। ফলে নিজেদের প্রয়োজনেই তারা ব্যক্তি উদ্যোগে কাঠ বসিয়ে অস্থায়ীভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।’

এদিকে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। শুয়ারুল গ্রামে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও ভাঙা সেতুর কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। অভিভাবকেরা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী ভয়ে একা সেতু পার হতে চায় না।

স্থানীয় শিক্ষক শাহ আলম পাটোয়ারী জানান, এই সেতু দিয়ে পারাপারের সময় অনেক শিক্ষার্থী পড়ে গিয়ে আহত হয়েছে। প্রতিদিনই তারা ভয় নিয়ে স্কুলে আসে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে চান না। একটি নিরাপদ সেতু নির্মাণ করা হলে শিক্ষার্থীরা নিশ্চিন্তে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে এবং এলাকার শিক্ষাব্যবস্থাও স্বাভাবিক থাকবে।

Advertisement

শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় তাদের আতঙ্ক নিয়ে সেতু পার হতে হয়। ভাঙা কাঠের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে অনেক সময় ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তারা দ্রুত একটি নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছে।

একই দুর্ভোগের কথা জানান স্থানীয় যানবাহন চালকরাও। বারেক গাজী নামের এক চালক জানান, শুয়ারুল গ্রামে প্রবেশের প্রধান পথে এই সেতু। বিকল্প কোনো রাস্তা ব্যবহার করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় মোটরসাইকেল কিংবা হালকা যানবাহন নিয়েও সেতু পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে চরম বিপাকে পড়তে হয়। অনেক সময় রোগীকে কাঁধে করে সেতু পার করেই অন্য যানবাহনে তুলতে হয়, যা মানবিক ও চিকিৎসাসেবার দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত একটি টেকসই কংক্রিটের সেতু নির্মাণ করা হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই হবে না, কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও অনেক সহজ হবে। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে তারা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে কচুয়া উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল আলীম লিটন জানান, শুয়ারুল গ্রামের সেতুটি নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।

শরীফুল ইসলাম/কেজে/এএসএম