আজ পহেলা আগষ্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস। একটি নবজাতকের পৃথিবীতে আগমনের পর তার প্রথম মৌলিক অধিকার ও প্রকৃতির সেরা উপহার হলো মায়ের দুধ। সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া এবং বুদ্ধিমত্তার সার্বিক বিকাশ-সব কিছুরই সূচনা ঘটে জীবনের প্রথম এই প্রাকৃতিক খাবারটি থেকে।
Advertisement
প্রতি বছর ১ আগস্ট উদযাপিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস এবং এই দিনটি দিয়েই শুরু হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ (১-৭ আগস্ট)। শিশুস্বাস্থ্য রক্ষা, অপুষ্টি প্রতিরোধ এবং মাতৃত্বের গভীর বন্ধনকে উদযাপনের লক্ষ্যেই বৈশ্বিক এই আয়োজন করা হয়।
শালদুধ হলো প্রকৃতির প্রথম টিকাজন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান সঠিক অনুপাতে থাকে মায়ের দুধে। বিশেষ করে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই তৈরি হওয়া ঘন হলুদ রঙের শালদুধ হলো প্রকৃতির তৈরি প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রতিষেধক। আগেকার দিনে কিছু মা চাচিদের ভ্রান্ত ধারণা ছিল বা তারা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে শালদুধকে নষ্ট দুধ ভেবে ফেলে দিতেন যার জন্য নবজাতক শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুসংস্কারের শিকার হতো। বর্তমানেও কিছু দাদি নানিরা আছেন শালদুধ নিয়ে এখনো কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন।
অথচ শালদুধে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি, ভিটামিন 'এ' ও প্রোটিন থাকে, যা শিশুর পেটের ভেতরের সংবেদনশীল পর্দাগুলোকে সুরক্ষিত রাখে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কান ও শ্বাসনালির সংক্রমণ থেকে শিশুকে সুরক্ষা দিতে শালদুধের কোনো বিকল্প নেই। কেবল শারীরিক গঠন নয়, মাতৃদুগ্ধ পান করা শিশুদের মানসিক বুদ্ধিমত্তা ও আইকিউ বৃদ্ধির হারও তুলনামূলকভাবে বেশি।
Advertisement
বুকের দুধ খাওয়ানো কেবল শিশুর জন্যই উপকারী নয়, এটি মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও জাদুকরী ভূমিকা পালন করে কারণ নিয়মিত স্তন্যপান করালে প্রসূতি মায়ের জরায়ু দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং প্রসব-পরবর্তী রক্তপাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। এছাড়াও দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের শরীরে অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রসূতি-পরবর্তী বিষণ্নতা দূর করতে সাহায্য করে এবং মা ও শিশুর সম্পর্কে এক আত্মিক বন্ধন তৈরি করে।
মায়ের দুধ শিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার চাবিকাঠি। যেসব মা নিয়ম মেনে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান, দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে।
আধুনিক সমাজ ও চিকিৎসা বিজ্ঞান মাতৃদুগ্ধের অব্যর্থ উপকারিতা প্রমাণ করলেও বাস্তবে কিন্তু অনেক শিশুই জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম বড় বাধা হলো ভ্রান্ত ধারণা, সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব এবং বাজারের প্রক্রিয়াজাত কৌটার দুধ বা 'ফর্মুলা মিল্ক'-এর প্রচারণা।
বর্তমানে কর্মজীবী মায়েদের সংখ্যা বাড়লেও অনেক কর্মক্ষেত্রেই মাতৃত্বকালীন ছুটির অপর্যাপ্ততা এবং 'ব্রেস্টফিডিং কর্নার' বা দুধ সংরক্ষণের সুব্যবস্থা না থাকায় মায়েরা বাধ্য হয়ে সন্তানকে ফর্মুলা মিল্কের দিকে ঠেলে দেন। গণপরিবহন বা পাবলিক প্লেসেও মায়েদের জন্য নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন স্থানের অভাব রয়েছে।
Advertisement
সন্তানকে স্তন্যপান করানো কেবল একজন মায়ের একক লড়াই বা দায়িত্ব হতে পারে না; এটি একটি যৌথ সামাজিক প্রতিশ্রুতি। একটি শিশুর স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে জন্মানো এবং জন্মের পর শিশু ও মায়ের স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো ও তার অন্যান্য সব যত্নের জন্য গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে পরিবারের সাপোর্ট খুব দরকার।
এই সময় পরিবারের অন্যান্যদের, বিশেষ করে বাবাদের সহানুভূতিশীল ও সহায়ক ভূমিকা প্রয়োজন। মাকে দুশ্চিন্তামুক্ত ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা পরিবারের প্রথম কাজ। কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রয়োজন সহযোগিতামূলক কর্ম পরিবেশ এবং কাজ শেষে ঘরে ফেরার পরে ঘরের পরিবেশও সহযোগিতামূলক এবং নিরাপদ হওয়া আবশ্যক । প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ডে-কেয়ার সেন্টার ও ব্রেস্টফিডিং স্পেস তৈরি করা জরুরি, যাতে কাজ ও মাতৃত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।গুঁড়ো দুধের প্রচার বন্ধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং চিকিৎসকদের মাধ্যমে মায়েদের মানসিকভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের একই বিছানায় ঘুমানো, উপকার বেশি নাকি ক্ষতিশিশুর সুস্থ-সবল ও প্রতিভাবান হয়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি হয় জীবনের প্রথম কয়েক মাসে। এই সময়টায় মা ও শিশুর জন্য দরকার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বাড়তি যত্ন। মাতৃদুগ্ধ পানের সংস্কৃতি ও অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা কোনো এক দিনের উদযাপনের বিষয় নয়, এটি একটি সচেতন ও মেধাবী প্রজন্ম গড়ার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
আরও পড়ুন তরুণদের মাঝে বাড়ছে ডায়াবেটিস, প্রতিরোধে করণীয়আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবসে প্রতিটি শিশুর প্রকৃতির এই পরম অধিকার নিশ্চিত হোক, শিশু গড়ে উঠুক সুস্থ সবলভাবে। শিশুরা যদি স্বাভাবিক ও সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে-তবেই গড়ে উঠবে একটি নীরোগ ও সমৃদ্ধ সমাজ।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
এসএকেওয়াই