শাহারিয়া নয়ন
Advertisement
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে ট্রফি উঠেছে, ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপ যেমন একটি ট্রফির গল্প লিখে যায়, তেমনি কিছু প্রশ্নও রেখে যায়। এবারের আসরও তার ব্যতিক্রম নয়।
আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখছিলাম কীভাবে ফুটবলের ইতিহাসের সঙ্গে ১০০ বছরের ভূরাজনীতি কীভাবে জড়িয়ে আছে। প্রথম পর্বের পর-
ফুটবলের ইতিহাসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির নতুন নয়। ১৯৩৪ ও ৩৮ সালে মুসোলিনির ইতালি, ১৯৭৮ সালে ভিদেলার আর্জেন্টিনা এবং ১৯৮২ সালে স্পেনে কুয়েতের রাজপরিবারের মাঠে নেমে আসার ঘটনা, ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে বিশ্বকাপের মাঠ কখনো কখনো রাজনীতির বাইরে থাকে না। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়েও সেই একই প্রশ্ন উঠছে।
Advertisement
এর আগে আমাদের জানা প্রযোজন বিশ্বকাপ ফুটবলে মাঠের খেলায় আমার যা দেখি তা কতটা সত্য? উচ্চশ্রেণির খেলায় নিম্নশ্রেণির চিৎকার-
আরও পড়ুন বিশ্বকাপে মেসিদের হার, নেপথ্যে ১০০ বছরের ভূরাজনীতি (পর্ব-১)এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আসে। বিশ্বকাপে কার স্বার্থ রক্ষা হয়? কার্ল মার্ক্স দাস ক্যাপিটাল (১৮৬৭)-এ বলেছিলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে শ্রেণি অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, সে শ্রেণিই সত্যকে নির্ধারণ করে। ফিফা হলো সেই উচ্চশ্রেণি। বিশ্বকাপের কোটি কোটি দর্শক হলেন নিম্নশ্রেণি। নিম্নশ্রেণি যতই চিৎকার করুক, প্রশ্ন তুলুক, সেই প্রশ্ন উচ্চশ্রেণির দরবারে কখনো পৌঁছায় না। উচ্চশ্রেণি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ব্যবহার করে আবেগ, উৎসব ও বিনোদনের অস্ত্র। বিশ্বকাপ হলো সেই অস্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ।
মার্ক্সের কমোডিটি ফেটিশিজম বা পণ্য-পূজার ধারণায় এটি আরও স্পষ্ট হয়। বিশ্বকাপে কোটি মানুষ একটি জার্সি, একটি বল, একটি ব্র্যান্ডকে বিশেষ মূল্য দেয়। কিন্তু এই পণ্যের পেছনে কার শ্রম, কার মুনাফা, কার সিদ্ধান্ত, সেই প্রশ্ন আলোচনার বাইরেই থেকে যায়।
তেলেসুর ইংলিশ-এর গবেষণাপত্র গ্লোবাল ক্যাপিটাল ডিটারমাইনস ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়নস (২০২৬)-এ পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, পশ্চিম ইউরোপ বিশ্ব ফুটবলের আর্থিক কেন্দ্র হওয়ায় তারা তাদের আধিপত্য বজায় রাখে। ইউরোপের বহু বিলিয়ন ডলারের ক্লাব লিগগুলো আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা থেকে মেধাবী খেলোয়াড়দের শৈশবেই শুষে নেয়।
Advertisement
জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইনকোয়ারি-তে প্রকাশিত দিস ইজ হাউ ফুটবল বিকেম আ টুল অব মডার্ন ইম্পেরিয়ালিজম (২০২৫) শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচার আয় একাই ছিল ৫ বিলিয়ন পাউন্ড, অথচ আফ্রিকার সব লিগ মিলিয়ে সেটি ছিল ১ বিলিয়ন পাউন্ডেরও কম। ফিফা, ইউরোপীয় ক্লাব এবং কর্পোরেট স্পনসররা বিশ্ব ফুটবলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, আর আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপ থেকে যায় কেবল কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে।
এখানেই আসে সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্ন। ইউরোপ শতবছর ধরে বিশ্বের সম্পদ নিজেদের কাছে কেন্দ্রীভূত করেছে। ফুটবলও সেই ব্যবস্থার বাইরে নয়। রিসার্চগেট-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র ইউরোপিয়ান ক্লাব ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড ফিফা রিডিস্ট্রিবিউশন মডেলস (২০১৮)-এ সুগডেন ও টমলিনসনের বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাছে ফিফা একসময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সংস্থার ক্ষমতা কাঠামোতে ইউরোপীয় আধিপত্য প্রশ্নাতীত।
২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় হয়েছে রেকর্ড ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা নিজেদের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১১ বিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই অর্থের বড় অংশ এসেছে ইউরোপীয় সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পনসরশিপ থেকে। এখন প্রশ্ন হলো, ইউরোপের এই বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক স্বার্থ কি চাইবে যে একটি লাতিন আমেরিকার দল বিশ্বকাপ জিতে যাক? ইউরোপীয় স্পনসর কি চাইবে স্পেনের বদলে লাতিন আমেরিকার ভিন্ন কোনো দেশের জার্সি বিক্রি হোক বেশি?
সমাজবিজ্ঞানী জিন বদ্রিলার সিমুলাক্রা অ্যান্ড সিমুলেশন (১৯৮১)-এ দেখিয়েছেন, আধুনিক গণমাধ্যম কীভাবে বাস্তবতার একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি করে জনমানসকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বকাপ সেই অর্থে একটি বৈশ্বিক ‘সিমুলেশন’, যেখানে কোটি কোটি মানুষ খেলার আবেগে মগ্ন থাকে আর পেছনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো অদৃশ্য থেকে যায়।
আরও পড়ুন অটিজম আক্রান্ত ছেলের জন্য চুল কাটেন না কুকুরেয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ: যুদ্ধের আগুনে ফুটবলের উৎসবইতিহাসবিদ নোয়াম চমস্কি তার হেজেমনি অর সার্ভাইভাল: আমেরিকাজ কোয়েস্ট ফর গ্লোবাল ডমিনেন্স (২০০৩, মেট্রোপলিটান বুকস) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক স্বার্থ পূরণে মিত্র দেশগুলোর ওপর কীভাবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানের জন্য ইউরোপীয় ঘাঁটি ব্যবহারের ঘটনা নতুন নয়। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগেও ফ্রান্স ও জার্মানি অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এবার ইরানে সামরিক হামলার জন্য স্পেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল ওয়াশিংটন। স্পেন সরকার স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানায়।
এরপরই প্রশ্ন উঠছে, স্পেনকে পক্ষে রাখতে এবং ইউরোপীয় রাজনীতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন ফুটবলের মঞ্চকেও ব্যবহার করেছে। রাজনীতিবিজ্ঞানী জোসেফ নাই তার ফট পাওয়ার: দ্য মিনস টু সাকসেস ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স (২০০৪, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বড় শক্তিগুলো সামরিক বলের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতিকে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
আয়োজক দেশ হিসেবে মার্কিন প্রশাসনের প্রভাব বলয় কতটা বিস্তৃত ছিল, তার সবচেয়ে প্রকাশ্য উদাহরণটি এলো বোসনিয়ার বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে। মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান বোসনিয়ান ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে আঘাত করার কারণে ভিএআর পর্যালোচনার পর সরাসরি লাল কার্ড পান। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী এর অর্থ ছিল বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি খেলতে পারবেন না। কিন্তু এরপর যা ঘটলো তা ফুটবলের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার অনুরোধ জানান। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি তাদের নিজস্ব ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর ধারা ব্যবহার করে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে দেয়। ফলে বালোগান বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামেন।
এই সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা বিবৃতিতে বলে, এই সিদ্ধান্ত ‘একটি লাল রেখা অতিক্রম করেছে’ এবং এটি ‘অভূতপূর্ব, অবোধগম্য ও অন্যায়সংগত।’ সাবেক ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার লিখেছেন, ‘লাল কার্ড রাজনৈতিক ফোনকলে বাতিল হয় না। যদি একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফিফা সভাপতিকে ফোন করেন এবং একজন খেলোয়াড় হঠাৎ ছাড়পত্র পান, তাহলে প্রশ্নটি অনিবার্য: ফিফা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
বিশ্বকাপের আলোয় ঢাকা পড়ে যায় যুদ্ধ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এটি ছিল ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং দেশটির নেতৃত্বকে দুর্বল করা। মার্কিন এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন।
অভিযানে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। বি-টু স্টেলথ বোমারু বিমান মিজুরি থেকে ৩০ ঘণ্টার মিশনে উড়ে ইরানে আঘাত হানে। তেহরান, ইসফাহান, কোম, কারাজ, কেরমানশাহ ও তাবরিজে একযোগে ২ হাজার ৫০০-এরও বেশি ইরানি সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। অভিযানে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ২৯০ জনেরও বেশি আহত হন।
ইরানের মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা (এইচআরএএনএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ জুন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ৩,৪৬৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সাত শিশু, ৩৭৬ জন নাবালক এবং ৪৯৬ জন নারী। আহত হয়েছেন ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ, যার মধ্যে রয়েছেন অন্তত ৪ হাজার নারী ও ১,৬২১ জন শিশু। যুদ্ধের-এর ১৪৩তম দিনের হিসাব অনুযায়ী, সব পক্ষ মিলিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ১৪৪ থেকে ৯ হাজার ৬৭৬-এরও বেশি এবং আহতের সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার ৯৬৫। লেবাননে নিহত হয়েছেন ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.১৪ বিলিয়ন ডলার।
আরও পড়ুন বিশ্বকাপ জিতে দেশে ফিরে টমেটো উপহার পেলেন রুইজ-গাভি, কিন্তু কেন?এই ভয়াবহ যুদ্ধের মাঝেই শুরু হয় ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, যুক্তরাষ্ট্রেরই আয়োজনে। প্রায় দুই মাস ধরে বিশ্বকাপ চলাকালে ইরানে হামলা অব্যাহত ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক গণমাধ্যমের মনোযোগের বড় অংশ তখন বিশ্বকাপের মঞ্চে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর চলে যাচ্ছিল পর্দার আড়ালে, আর সামনে আসছিল গোলের উদযাপন। ডেভিড গোল্ডব্লাট দ্য বল ইজ রাউন্ড গ্রন্থে যে ‘মনোযোগ সরানোর’ ঐতিহাসিক ধারার কথা বলেছেন, ২০২৬ সালে তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল।
যুদ্ধরত দেশের দল খেলছে যুদ্ধ পরিচালনাকারী দেশের মাটিতে২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ইরান জাতীয় ফুটবল দলের অংশগ্রহণ। প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জুলস বয়কফ টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন হয়নি যে আয়োজক দেশ টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র তিন মাস আগে অংশগ্রহণকারী একটি দেশের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করেছে।’
নোয়াম চমস্কি হেজেমনি অর সার্ভাইভাল গ্রন্থে এই কৌশলটিকে বলেছেন ‘ম্যানুফ্যাকচারড কনসেন্ট’ বা কৃত্রিমভাবে সম্মতি তৈরির প্রক্রিয়া। জনগণের মনোযোগকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে বিনোদনের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হলে ক্ষমতাসীনরা জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত থাকে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই প্রক্রিয়ার একটি নিখুঁত উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার পরামর্শ দেন। তার বক্তব্য ছিল, ইরানি খেলোয়াড়দের ‘জীবন ও নিরাপত্তা’ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পরিস্থিতির কারণে ইরান জাতীয় দলকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে মেক্সিকোতে নিজেদের বেস ক্যাম্প স্থাপন করতে হয়। খেলোয়াড়দের কেবল ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই তাদের আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হতো। একই সঙ্গে দলের একাধিক কর্মকর্তা মার্কিন ভিসা পাননি।
ইরানের ফুটবল ফেডারেশন এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিহিংসামূলক আচরণ’ বলে অভিযোগ করে। এমনকি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ফেডারেশন সভাপতি মেহদি তাজসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ভিসা না দেওয়ায় ইরান ড্র অনুষ্ঠান বয়কট করে। দেশটি এই সিদ্ধান্তকে ‘অক্রীড়াসুলভ’ বলে আখ্যা দেয়।
প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বয়কফ বলেছেন, বিশ্বকাপের ইতিহাসে যা কখনো ঘটেনি, তাই ঘটলো ২০২৬ সালে। একটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ চালাতে চালাতে সেই দেশের খেলোয়াড়দের নিজের মাটিতে খেলার অনুমতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে সীমিত শর্তে। ক্রীড়া ও রাজনীতির এই বিপজ্জনক মিশ্রণ ফুটবলের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এই অস্বাভাবিক বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় ইরান-মিশর ম্যাচের দিন। ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের হরমুজ প্রণালীর কয়েকটি দ্বীপে বোমা হামলা চালায়। একদিকে আকাশে যুদ্ধবিমান, অন্যদিকে সেই দেশের খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এমন বৈপরীত্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইতিহাসে বিরল।
ফ্র্যাংকলিন ফোয়ার হাউ সকার এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়ার্ল্ড গ্রন্থে লিখেছেন, ফুটবল কখনো কখনো জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে এতটাই মিশে যায় যে খেলা ও রাজনীতির মধ্যে সীমারেখা বলতে কিছু থাকে না। ২০২৬ সালে সেই সীমারেখা শুধু মুছে যায়নি, সেটি রীতিমতো উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
জ্যাঁ বদ্রিয়ার সিমুলাক্রা অ্যান্ড সিমুলেশন গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক গণমাধ্যম কীভাবে বাস্তবতার একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি করে মানুষের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। যুদ্ধের মাঠে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, কিন্তু বিশ্ব গণমাধ্যম ব্যস্ত বিশ্বকাপের গোল বিশ্লেষণে। ১৯৩৪ সালে মুসোলিনির ইতালি ফ্যাসিবাদকে বৈশ্বিক মঞ্চে বৈধতা দিতে বিশ্বকাপ ব্যবহার করেছিল। ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি ভিন্ন কিছু করেছে? প্রশ্নটি পাঠকের বিবেচনার জন্য রেখে গেলাম।
আরও পড়ুন বিশ্বকাপে আলোচনায় ‘শোম্যান’ আইশোস্পিড: কে এই তরুণ, কী তার পরিচয়? সোমালি রেফারি: আফ্রিকার সেরাকে ফেরানো হলো মায়ামি বিমানবন্দর থেকেক্রীড়া ইতিহাসবিদ ডেভিড গোল্ডব্লাট দ্য বল ইজ রাউন্ড গ্রন্থে লিখেছেন, বিশ্বকাপ যখন কোনো দেশের আয়োজনে হয়, তখন সেই দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা মাঠের বাইরেও প্রভাব ফেলার সুযোগ পায়। ২০২৬ সালে এই সত্যের সবচেয়ে মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলেন একজন ৩৪ বছর বয়সী সোমালি রেফারি।
মোগাদিশুতে জন্ম নেওয়া ওমর আবদুলকাদির আরতান ২০১৮ সালে ফিফার তালিকাভুক্ত রেফারি হন। ২০২৫ সালে তিনি আফ্রিকার সেরা পুরুষ রেফারির স্বীকৃতি পান এবং ফিফার ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত ৫২ জন রেফারির একজন হন। তিন বছরের যাচাইপ্রক্রিয়ার পর ফিফা তাকে নির্বাচন করেছিল। তিনি হতেন বিশ্বকাপে রেফারিং করা প্রথম সোমালি। ২০২৬ সালের ৬ জুন আরতান ইস্তাম্বুল থেকে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। মার্কিন কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন তাকে ‘ভেটিং উদ্বেগের’ কারণ দেখিয়ে প্রবেশে বাধা দেয়। আরতান জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদে তাকে সোমালির রাজনীতি ও একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। তার কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও তাকে ফেরত পাঠানো হয়।
হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানি সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘আরতান কিছু অত্যন্ত খারাপ মানুষের’ সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে কিছু গোপনীয় তথ্য রয়েছে যা এখনো প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অথচ ফিফা তিন বছর ধরে যাচাইপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরতানকে নির্বাচন করেছিল। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু আমরা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।’
নোয়াম চমস্কি তার হেজেমনি অর সার্ভাইভাল গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন কোনো আসরের আয়োজক হয়, তখন সেই আসরের নিয়মকানুনও তার রাজনৈতিক স্বার্থের অধীনে চলে আসে। আরতানের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় প্রায় ৪০টি দেশ রয়েছে, যার অধিকাংশই আফ্রিকার। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি কার্যত বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের একটি কাঠামো, যা বিশ্বকাপের মঞ্চে এসেও থামেনি।
হাওয়ার্ড জিন তার আ পিপলস হিস্ট্রি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস গ্রন্থে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে সংখ্যালঘু ও দরিদ্র দেশের মানুষদের প্রান্তিক করা হয়েছে। আরতানের গল্প সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই একটি নতুন অধ্যায়।
ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই উয়েফা আরতানকে পিএসজি ও অ্যাস্টন ভিলার মধ্যকার ইউরোপিয়ান সুপার কাপ ফাইনালের রেফারি হিসেবে নিয়োগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র যাকে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ মনে করল, ইউরোপ তাকেই মহাদেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দিল।
মোগাদিশুতে ফিরে হাজার হাজার সমর্থক আরতানকে কাঁধে তুলে নেন। তিনি বলেছেন, ‘যা হওয়ার হয়েছে। আমি পরের বিশ্বকাপে যাব।’ সোমালিয়া বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশ নয়, কিন্তু মোগাদিশুর স্টেডিয়াম সেদিন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল কোনো গোলের জন্য নয়, একজন মানুষের মর্যাদার জন্য।
পিয়েরে বুর্দিও তার দ্য লজিক অব প্র্যাকটিস গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের বৃহত্তর ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে নয়। আরতানের ঘটনা সেই সত্যের জীবন্ত প্রমাণ। ফুটবলের মাঠে পারফরম্যান্সের বদলে পাসপোর্টের দেশ দিয়ে যদি একজন রেফারিকে বিচার করা হয়, তাহলে বিশ্বকাপ কতটা সত্যিকারের ‘বিশ্বের কাপ’ থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসই একদিন দেবে।
আরও পড়ুন লামিন ইয়ামালের দাদি ফাতিমার সংগ্রামের গল্প কাঁদাবে আপনাকেও বিশ্বকাপে আমরা যা দেখি, তা কতটা সত্য?ফুটবল ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে গবেষক পিয়েরে বুর্দিও তার দ্য লজিক অব প্র্যাকটিস (১৯৯০- স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের বৃহত্তর ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে নয়। যখন রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংঘাতে আসে, তখন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই সেই চাপের কাছে নতিস্বীকার করে। এই কথাটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে বারবার সত্য হয়েছে।
যেহেতু আমার হাতে নিশ্চিত কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই, তাই কাল্পনিক কোনো গল্প বলব না। তবে ইতিহাস যা বলে, সেটুকু জানিয়ে যেতে চাই। কারণ প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ ২০২৬ বিশ্বকাপ আমরা টিভির পর্দায় যা দেখেছি, তা কতটা সত্য? এই প্রশ্ন তোলার অধিকার ইতিহাসই আমাদের দেয়।
১৯৯০ সালের ৮ জুলাই রোমের স্তাদিও অলিম্পিকোতে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানি আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারায়। ৮৫তম মিনিটে রুডি ভলারের বিরুদ্ধে বিতর্কিত পেনাল্টি থেকে আন্দ্রেয়াস ব্রেমে গোল করেন। পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিম জার্মানি সেই ম্যাচে ২৩টি শট নিয়েছিল, আর্জেন্টিনার ছিল মাত্র একটি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে একতরফা পরিসংখ্যান।
চূড়ান্ত বাঁশিতে ম্যারাডোনা কাঁদছিলেন এবং পদক প্রদান অনুষ্ঠানে ব্রাজিলিয়ান ফিফা সভাপতি জোয়াও অ্যাভেলাঞ্জের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকার করেন। পরে ম্যারাডোনা মাইক্রোফোনে যাঁকে পেয়েছেন তাকেই বলেছেন, অ্যাভেলাঞ্জ তার কাছ থেকে বিশ্বকাপ কেড়ে নিয়েছেন। এই অভিযোগ পরবর্তীতে একাধিক ফুটবল গবেষণায় উঠে এসেছে।
অ্যাভেলাঞ্জের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের এই অভিযোগ নিছক আবেগ নয়। ২০১২ সালে সুইজারল্যান্ডের আদালতের নথি প্রকাশের পর জানা যায়, অ্যাভেলাঞ্জ ও তার জামাতা রিকার্দো তেইশেইরা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিপণন কোম্পানি আইএসএল থেকে লক্ষ লক্ষ ডলারের ঘুষ নিয়েছিলেন। ডেভিড গোল্ডব্লাট দ্য বল ইজ রাউন্ড গ্রন্থে লিখেছেন, ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কাঠামো বরাবরই এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে সংস্থার বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ মাঠের ফুটবলকে প্রভাবিত করতে পারে।১৯৯০ সালের অভিযোগ যদি তখন অনুমানের পর্যায়ে থেকে থাকে, ২০১৫ সালে সেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৫ সালে মার্কিন প্রসিকিউটররা ফিফা-সংশ্লিষ্ট ১৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঘুষ ও কিকব্যাকের অভিযোগে অভিযোগনামা প্রকাশ করেন। শীর্ষস্থানীয় একাধিক কর্মকর্তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সমাজবিজ্ঞানী জিন বদ্রিলার সিমুলাক্রা অ্যান্ড সিমুলেশন গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বাস্তবের একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি করে বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখে। ফিফা দশকের পর দশক ধরে ঠিক এটাই করেছে বাইরে স্বচ্ছতার মুখোশ, ভেতরে দুর্নীতির জাল।
আজকের ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে যে প্রশ্নগুলো উঠছে ট্রাম্পের ফোনকলে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা বাতিল, সোমালি রেফারির প্রবেশে বাধা দেওয়ায় নীরবতা সেগুলো তাই একেবারে নতুন নয়। ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিন তার আ পিপলস হিস্ট্রি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস (১৯৮০) গ্রন্থে লিখেছেন, ক্ষমতাবানদের সত্য লুকিয়ে রাখার সক্ষমতা প্রচণ্ড, কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে সত্য একদিন না একদিন বেরিয়ে আসে।
আরও পড়ুন মেসির যেসব রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙতে পারেননি১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে মুসোলিনির বিশ্বকাপে রেফারিকে নৈশভোজের আমন্ত্রণের কথা প্রকাশ পেয়েছিল দশকের পর দশক পরে। ১৯৭৮ সালের পেরু ম্যাচের গোপন রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বেরিয়ে এসেছিল বছরের পর বছর পরে। অ্যাভেলাঞ্জের ঘুষ নেওয়ার তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল তার ক্ষমতা ছাড়ার প্রায় দেড় দশক পর। ২০১৫ সালের ফিফা কেলেঙ্কারিও একদিন আদালতের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে।
ফ্র্যাংকলিন ফোয়ার হাউ সকার এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়ার্ল্ড গ্রন্থে লিখেছেন, ফুটবল ও ক্ষমতার মিলনস্থলে যা ঘটে, তার সত্য মাঠে নয়, ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ যদি বিতর্কিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই সত্যও একদিন বেরিয়ে আসবে। আজ হোক বা ১০০ বছর পরে। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু ম্যাচ শুধু ৯০ মিনিটে শেষ হয় না। কিছু ম্যাচ শেষ হয় বহু বছর পর, যখন ইতিহাস তার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস একটি কথাই বারবার বলেছে সত্য কখনো চিরকাল চাপা থাকে না।
এখানেই সমাপ্তি নয়, বরং ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়ের শুরু… লেখক: ফিচার লেখক ও সাংবাদিক
কেএসকে