মরক্কো সীমান্তের কাছে স্পেনের ছোট্ট একটি ভূখণ্ড সেউতা। ছিমছাম সাজানো-গোছানো এই শহরে আচমকা দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন সংকট। এ সপ্তাহে হঠাৎই সেউতায় নেমে আসে মানুষের জনস্রোত। দেখতে দেখতে সেই স্রোত রূপ নেয় সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত বন্যায়। উত্তর আফ্রিকা উপকূলের শান্ত জনপদ মুহূর্তেই পরিণত হয় চরম বিশৃঙ্খল এলাকায়।
Advertisement
মাত্র ৮৪ হাজার মানুষের এই শহরে বানের স্রোতের মতো ঢুকে পড়ে ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী। ঢল সামাল দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাদের নির্বিঘ্নে প্রবেশাধিকার দিতে বাধ্য হয় স্প্যানিশ পুলিশ।
স্পেনের সরকার মূল ভূখণ্ডে যখন দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত, তখন সীমান্তের অন্য প্রান্তে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল দেশটির জন্য তৈরি করেছে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট।
আরও পড়ুন দাবানলে পুড়ছে ফ্রান্স-স্পেন, ঘরছাড়া ৩ লাখের বেশি মানুষ যেভাবে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ হারায় স্পেনমরক্কো থেকে সাঁতরে ও হেঁটে হাজার হাজার মানুষ স্পেনের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েন।
Advertisement
স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের হিসাবে, সেউতার স্থায়ী জনসংখ্যা মাত্র ৮৪ হাজার। সেখানে অল্প সময়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের প্রবেশ স্থানীয় প্রশাসনকে কার্যত অচল করে দেয়।
সাঁতরে সেউতা শহরে প্রবেশ করেন অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী/ ছবি: এপি-ইউএনবি
মানুষের ঢলে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয় স্পেনের সীমান্ত পুলিশ। অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে বাধা না দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। কিছু মানুষকে পানি ও খাবারও দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে অঞ্চলটিতে সেনা মোতায়েন করে পেদ্রো সানচেজের সরকার। দ্রুত অতিরিক্ত সীমান্তরক্ষী ও টহল নৌকা পাঠানো হয়।
Advertisement
মরক্কোর সঙ্গে জরুরি কূটনৈতিক যোগাযোগও শুরু করে মাদ্রিদ। সরকার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৩০০ জন মরক্কোতে ফিরে গেছেন। তবে বাকি ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানো সহজ হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন ২৪ ঘণ্টায় স্পেনের সিউতায় প্রবেশ করেছে ৪৯ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী যে কারণে শুরু হয় ঢলএই অভিবাসী সংকটের পেছনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আদালত বলেছেন, সেউতা ও মেলিয়ার সীমান্ত বেড়া অতিক্রমকারীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর আইন সমুদ্রপথে আসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ, সমুদ্রে কোনো সীমান্ত বেড়া নেই।
এই খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মরক্কোর উত্তরাঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ সীমান্তমুখী হতে শুরু করেন।
এক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে টেনে তুলছেন স্প্যানিশ পুলিশ সদস্য/ ছবি: এপি-ইউএনবি
৩০ জুলাই মরক্কোর সরকারি ছুটির দিনে সীমান্তরক্ষীদের টহল কমে গেলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে বহু মানুষ হেঁটে বা সাঁতরে স্পেনে প্রবেশ করেন। অনেকে সেউতার রাস্তা, পার্ক ও খোলা জায়গায় রাত কাটান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাঁতরে সীমান্ত পার হওয়ার সময় অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আরও পড়ুন মরক্কো থেকে স্পেনের দিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীর ঢল, নিহত ১৫ মরক্কোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নস্পেন সরকার প্রকাশ্যে মরক্কোকে দোষারোপ না করলেও এ ঘটনায় দেশটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী সানচেজ মানবপাচারকারী চক্রকে দায়ী করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মরক্কোর সীমান্তে নজরদারি শিথিল না হলে এত বড় প্রবেশ সম্ভব হতো না।
দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই নানা ইস্যুতে উত্তেজনাপূর্ণ। ২০২১ সালেও মরক্কো প্রায় আট হাজার মানুষকে সেউতায় প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিল। তখন পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্টের নেতাকে চিকিৎসার জন্য স্পেনে আশ্রয় দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল রাবাত।
২০২২ সালে পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনাকে সমর্থন করে স্পেন। এর ফলে আলজেরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়।
আরও পড়ুন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে সুইডেনে নতুন আইন কার্যকর ইউরোপে বাড়ছে কূটনৈতিক চাপসাম্প্রতিক সংকটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া ২০২১ সালের তুলনায় অনেক কঠোর।
এরই মধ্যে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন সহযোগিতা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ইতালি। নৌ ও আকাশপথে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণও জোরদার করেছে রোম।
ইতালির সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে ফ্রান্স। ফিনল্যান্ড এবং ডেনমার্ক স্পেনকে শেনজেন অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করার দাবি তুলেছে।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল সামলাতে হিমশিম খায় স্পেনের পুলিশ/ ছবি: এপি-ইউএনবি
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছেন, স্পেনকে অবশ্যই সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে হবে।
যদিও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সদস্য দেশের সম্মতি ছাড়া তাকে শেনজেন থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন স্পেনে যাচাই-বাছাইয়ের আগেই কর্মক্ষেত্রে ৬ লাখ অনিয়মিত অভিবাসী ইইউর বার্তা ও সানচেজের আহ্বানইউরোপীয় কমিশন সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী ফ্রন্টেক্সের অতিরিক্ত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে স্পেন এখনো অতিরিক্ত সহায়তা চায়নি বলে জানিয়েছেন ইইউ কর্মকর্তারা।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লিয়েন মরক্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান।
পেদ্রো সানচেজ ও উরসুলা ভন ডার লিয়েন/ ছবি: ফেসবুক@সানচেজ
অন্যদিকে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা স্পেনের প্রতি প্রকাশ্য সংহতি জানিয়েছেন। তিনি সংকট মোকাবিলায় স্পেন সরকারের দৃঢ় অবস্থানের প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এটি বিভক্ত হওয়ার সময় নয়। বরং শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ গড়ে তোলার সময়।
আরও পড়ুন পর্তুগালে চিরুনি অভিযান, অনিশ্চয়তায় অভিবাসী শ্রমিকরা ডানপন্থিদের রাজনৈতিক আক্রমণসেউতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের ডানপন্থি দলগুলো সানচেজ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনকে শেনজেন থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন।
ফরাসি, ইতালীয় ও অন্যান্য ডানপন্থি নেতারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহলও সানচেজ সরকারের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছে।
মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক সেউতার ঘটনায় মুখ খুলেছেন। ডাচ ডানপন্থি কর্মী ইভা ভ্লার্ডিঙ্গারব্রুকের ‘সেভ ইউরোপ’ প্রচারণার ভিডিও শেয়ার করেছেন তিনি।
আরও পড়ুন সুইডেনে ‘খারাপ আচরণ’ করলে বাতিল হতে পারে রেসিডেন্স পারমিট নির্বাচনের আগে বড় চ্যালেঞ্জচলতি বছর অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল স্পেন সরকার। তাদের ধারণা ছিল, এতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। কিন্তু আবেদন জমা পড়েছে ১২ লাখের বেশি।
সরকার দাবি করছে, সেউতার সাম্প্রতিক সংকটের সঙ্গে এই কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারের নমনীয় অভিবাসন নীতির কারণেই স্পেনকে সহজ প্রবেশপথ হিসেবে দেখছে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশ।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, স্পেনের অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন দেশে অভিবাসীর সংখ্যা এখন অনেক বেশি।
আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিশ্লেষকদের মতে, সেউতার এই সংকট প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নির্বাচনি লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, ইউর্যাক্টিভকেএএ/