ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ২৩১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা ঘিরে চলমান আলোচনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক (ইউটিএন)।
Advertisement
সংগঠনটি বলেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা, নিপীড়ন বা অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িতদের জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তবে সে প্রক্রিয়া হতে হবে আইন, বিধি ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির ভিত্তিতে।
রোববার (২ আগস্ট) রাতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়।
আরও পড়ুন জুলাইবিরোধী অবস্থান / ঢাবির ৬ অধ্যাপককে ‘অব্যাহতি’, বরখাস্ত হচ্ছেন সাদেকা হালিমইউটিএনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সরকার-সমর্থক শিক্ষকদের একটি অংশ ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতা’র নামে ২৩১ শিক্ষকের একটি তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে উপাচার্যের কাছে জমা দিয়েছেন। সংগঠনটির মতে, রাজনৈতিক মত বা সমর্থন কোনো অপরাধ নয় এবং এ ধরনের উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার পরিপন্থি হতে পারে।
Advertisement
শিক্ষক নেটওয়ার্ক আরও বলেছে, গত ২৮ জুলাই ঢাবির সিন্ডিকেট সভায় তিনজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং চারজন শিক্ষককে সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে।
সংগঠনটি স্পষ্ট করে বলেছে, তারা কোনোভাবেই জবাবদিহির বিরোধী নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ও চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক দলীয় লেজুড়বৃত্তি, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা, নিপীড়নমূলক পরিবেশ তৈরি, সহকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক অভিযোগ বা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের বিরোধিতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / আওয়ামীপন্থি নীল দল নিষিদ্ধে কমিটি, শাস্তির মুখে জুলাইবিরোধী শিক্ষকরাওতবে সেই জবাবদিহি প্রতিহিংসা, মতাদর্শগত শুদ্ধি অভিযান বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; বরং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে বলে মনে করে সংগঠনটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৩১ শিক্ষকের তালিকা তৈরি করে প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া এবং সে তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি এখনো কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে সাতজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অভিযোগ প্রমাণের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত রয়েছে। এ দুই ক্ষেত্রেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (ডিউ প্রসেস) ও ন্যায়বিচারের সুস্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে দাবি করেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
Advertisement
সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ এর উল্লেখ করে বলেছে, শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও ধারণের অধিকার রয়েছে। কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষককে অভিযুক্ত করা যায় না। অভিযোগ থাকলে তা নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পরই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন ফিরে দেখা ১ আগস্ট / রাবি থেকে শিক্ষার্থীদের তুলে নেওয়ার চেষ্টা, ঢাল হয়ে দাঁড়ান শিক্ষকরাসংগঠনটির সদস্যরা মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিতে ইনক্রিমেন্ট স্থগিত, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন শাস্তির ধাপ নির্ধারিত রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সিদ্ধান্ত নিলে আইনের শাসন ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অভিযোগ প্রমাণের আগেই তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নিয়োগের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে তদন্তের দাবি কিংবা তালিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ ‘উইচ-হান্টিং’ সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।
অতীতেও যথাযথ ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়া ছাড়া শিক্ষক চাকরিচ্যুতির ঘটনার বিরোধিতা করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এবারও সংগঠনটি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আরও পড়ুন রাবিতে সংঘর্ষ, দোষীদের শাস্তির দাবি শিক্ষক নেটওয়ার্কেরসংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি পাঁচ দফা আহ্বান জানিয়েছে। সেগুলো হলো কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ নিশ্চিত করা; অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত; অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া; ১৯৭৩ সালের আদেশে বর্ণিত শাস্তির ধাপ অনুসরণ করা এবং কেবল রাজনৈতিক মত বা তালিকার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।
বিজ্ঞপ্তির শেষাংশে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিহিংসা নয় বরং আইন, প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস টিমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এএএইচ/এমএমকে