বিশ্বকাপকে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে বাধ্য হয়ে সরে আসতে হয়েছে ফিফাকে। বিশ্বকাপকে বেসরকারিকরণের যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন ইনফ্যান্তিতো, বিশ্বব্যাপি তুমুল বিরোধীতার মুখে সেই পরিকল্পনা আপাতত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন সভাপতি ইনফান্তিনো।
Advertisement
কিন্তু বিশ্বকাপকে বিক্রি করার পরিকল্পনা ভেস্তে যেতেই নতুন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। মূলতঃ ফুটবল বিশ্বকাপ আরও বড় করার পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে না ফিফা। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পর এবার ২০৩০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৬৪-তে উন্নীত করার সম্ভাবনা যাচাই করতে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
ইএসপিএনের হাতে আসা ফিফার অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, আগামী ১৪ আগস্টের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ মাত্র কয়েকদিন আগেই বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশনগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে ফিফা।
৪৮ দলের পর এবার ৬৪ দলের পরিকল্পনা
Advertisement
২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। এর আগেও বিশ্বকাপকে ৬৪ দলে সম্প্রসারণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তবে ফিফার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তা নাকচ করেছিলেন।
কিন্তু নতুন করে বিতরণ করা পাঁচ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা নথিতে ফিফা জানিয়েছে, তারা বর্তমান কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিশ্বকাপ আরও সম্প্রসারণের কৌশলগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে চায়।
এ জন্য একটি স্বাধীন গবেষণা সংস্থা নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে ফিফা। সংস্থাটি বিশ্লেষণ করবে, ২০৩০ সাল থেকেই বিশ্বকাপ ৪৮ থেকে ৬৪ দলে উন্নীত হলে টুর্নামেন্টের কাঠামো, ফুটবলের সামগ্রিক পরিবেশ ও প্রতিযোগিতার মানের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
নথি অনুযায়ী, ৩০ জুলাই গবেষণার প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী ৭ আগস্টের মধ্যে গবেষণা সংস্থার প্রস্তাব জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
Advertisement
এরপর ১৪ আগস্ট ফিফা একটি সিদ্ধান্ত নেবে। পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদন জমা পড়বে ১১ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ পরিকল্পনা অনুমোদনের সময়সীমার মাত্র আট দিন আগে এই বিশ্লেষণ সম্পন্ন হবে।
বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের এই নতুন উদ্যোগ এমন সময় এলো, যখন ফিফার আরেকটি বড় পরিকল্পনা প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ইনফান্তিনো সম্প্রতি ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দেন। এর অধীনে বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি ও লাইসেন্সিংয়ের বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালিত হবে।
এই প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু মালিকানা বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল ফিফার। পুরো প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার।
তবে এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ইউরোপিয়ান ফুটবল সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। তাদের অভিযোগ, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতাকে কার্যত বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে ফিফা।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে ইতোমধ্যেই বড় ধাক্কা খেয়েছেন ইনফান্তিনো। উয়েফা সরাসরি জানিয়েছে, এই প্রকল্প বাতিল না হলে তারা ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বয়কট করার কথাও বিবেচনা করছে।
কনকাকাফও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপর এএফসিও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়া নেওয়া উচিত নয়।
এরই মধ্যে ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেছেন। বিনিয়োগ খাত থেকে আসা এই কর্মকর্তা ফিফার পরিকল্পনাকে প্রকাশ্যেই ‘ফুটবলের জন্য একটি খারাপ চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
উয়েফার অন্যতম বড় উদ্বেগ, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্ট আরও বড় ও আরও ঘন ঘন আয়োজনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি শারীরিক চাপ পড়বে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এএফসিও ফিফার শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছে, এটি প্রথম ঘটনা নয় যেখানে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কনফেডারেশনগুলোকে কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার জরুরি সংস্কারেরও আহ্বান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ ৬৪ দলে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে যখন বিশ্ব ফুটবলে বিভক্তি তুঙ্গে, ঠিক সেই সময় বিশ্বকাপ আরও সম্প্রসারণের আলোচনা শুরু হওয়ায় জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
আইএইচএস/