দেবাশীষ দাসের ক্লিফটনের সুখময় বাসভবনে টানা পনেরোটি দিন কাটানোর পর বিদায়ের মুহূর্তটি যেন অদৃশ্য এক বিষণ্নতার আবরণে ঢেকে গেল। এই কয়েকটি দিনে তাদের আন্তরিক আতিথেয়তা, পারিবারিক উষ্ণতা এবং আপন পরিবেশ আমাদের হৃদয়ে এমন গভীর ছাপ রেখে গিয়েছিল যে বিদায় শব্দটি উচ্চারণ করতেও মন সায় দিচ্ছিল না।
Advertisement
বিদেশের মাটিতে থেকেও কখনো মনে হয়নি আমরা অতিথি। প্রতিটি সকাল ছিল পাখির কলতানে জেগে ওঠা, প্রতিটি বিকেল ছিল সবুজে ঘেরা নিস্তব্ধতার সঙ্গে পরিচয়ের নতুন উপলক্ষ, আর প্রতিটি রাত ছিল গল্প, স্মৃতি ও হাসির রেশে ভরা। চারদিকে পরিচ্ছন্ন লন, ফুলে ভরা বাগান, যত্নে লালিত ফল ও সবজির গাছ, নির্মল বাতাস এবং আপনজনদের অকৃত্রিম ভালোবাসা মিলিয়ে ক্লিফটনের দিনগুলো যেন এক টুকরো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কুপার্স রক
২৬ জুলাই সকাল ঠিক দশটায় সেই স্বপ্নময় পরিবেশকে পেছনে রেখে আমরা পশ্চিম ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের মরগ্যানটাউনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। গাড়ি ধীরে ধীরে ক্লিফটনের পরিচিত পথ ছেড়ে যখন দূরের মহাসড়কে উঠে এলো, তখন জানালার বাইরে ভেসে যেতে লাগল বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি, ঢেউ খেলানো পাহাড়, কৃষিজমি আর ছোট ছোট জনপদ। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে একের পর এক জীবন্ত ছবি এঁকে আমাদের সামনে মেলে ধরছিল।
Advertisement
দীর্ঘ পথযাত্রারও এক আলাদা আনন্দ আছে। গন্তব্যে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পথের প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাহাড় এবং প্রতিটি নদী মনের ভেতর নতুন নতুন অনুভূতির জন্ম দেয়। পথ চলতে চলতে উপলব্ধি করছিলাম, ভ্রমণের সৌন্দর্য কেবল গন্তব্যে নয়, পথের প্রতিটি মুহূর্তেও লুকিয়ে থাকে। মানুষের জীবনের মতোই ভ্রমণও আসলে এক অবিরাম চলার গল্প।
প্রায় ছয় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে বিকেল পাঁচটার দিকে আমরা পৌঁছালাম পাহাড়ঘেরা সুন্দর শহর মরগ্যানটাউনে। সবুজ পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা এই শহরের শান্ত পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রথম দর্শনেই মন ছুঁয়ে গেল। এখানে আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন ডক্টর প্রমিতি সরকার। তিনি আমার মেয়ের বড় বোনের মতো, যদিও রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্তু ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বন্ধনে তিনি পরিবারের একজন আপন মানুষ। বর্তমানে তিনি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। তার জ্ঞান, বিনয় ও মমতাপূর্ণ আচরণ সহজেই মানুষের মন জয় করে নেয়। তার বাসায় পৌঁছানোর পর উষ্ণ অভ্যর্থনা দীর্ঘ পথের ক্লান্তি মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিল। তার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার কল্লোল তরফদার, একজন সাবেক বুয়েটিয়ান, অত্যন্ত ভদ্র, অমায়িক ও অতিথিপরায়ণ মানুষ। তাদের পরিপাটি, রুচিশীল ও বইয়ের আবহে ভরা বাসাটি একটি শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারের পরিচয় বহন করছিল।
প্রিয়জনদের সঙ্গে কপার রকের চূড়ায়
এই বাড়িতে আমাদের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি ছিল বাঁশরী ও প্রাহীর পুনর্মিলন। প্রাহী একসময় আমার নাতনী বাঁশরীর খেলার সাথী ছিল, যখন ডক্টর প্রমিতি পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন এবং লাফায়েতে বসবাস করতেন। সময়ের ব্যবধান ও দূরত্ব তাদের ছোটবেলার বন্ধুত্বকে ম্লান করতে পারেনি। অনেকদিন পর দেখা হতেই দুজনের আনন্দ যেন আর ধরে না। তাদের হাসি, গল্প আর খেলায় পুরো বাড়ি প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। শিশুদের আনন্দের মধ্যে যে নির্মলতা থাকে, তা বড়দের মনেও নতুন আনন্দের সঞ্চার করে। তাদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছিল, সময় যেন আবার পেছনে ফিরে গেছে এবং পুরোনো সেই সুন্দর দিনগুলো নতুন করে ফিরে এসেছে।
Advertisement
মরগ্যানটাউনে আমাদের আনন্দ আরও বেড়ে গেল যখন দেখা হলো ডক্টর প্রমিতির বাবা ডা. প্রতুল সরকারের ও মা অধ্যাপক সুচিত্রা রানী পোড্ডারের সঙ্গে। ডা: প্রতুল দাদা আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। বহু বছরের পরিচয় ধীরে ধীরে এক আন্তরিক পারিবারিক সম্পর্কে রূপ নিয়েছে। অনেকেই মজা করে বলেন, আমার সঙ্গে প্রতুল দাদার চেহারার বেশ মিল রয়েছে। তাই আমরা হাসতে হাসতে নিজেদের দুই ভাই বলেই পরিচয় দিই। দীর্ঘদিন পর প্রবাসের মাটিতে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার অনুভূতি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। মনে হচ্ছিল, হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশের পরিচিত এক আপন পরিবেশ ফিরে পেয়েছি। তার পরিবারের আন্তরিকতা আমাদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। সেদিন আরও একবার উপলব্ধি করলাম, প্রবাস জীবনে পরিচিত মানুষের ভালোবাসা কত বড় আশীর্বাদ।
আরও পড়ুন যে সিঁড়ির সামনে দেওয়া হয়েছিল ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণবিকেলের কোমল আলো যখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে সোনালি আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন কল্লোল ও প্রমিতির পরিকল্পনায় আমরা সবাই বেরিয়ে পড়লাম কুপার্স রকের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পশ্চিম ভার্জিনিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক সম্পদ কুপার্স রক স্টেট ফরেস্টে। প্রবেশপথ থেকেই মনে হলো, প্রকৃতি যেন তার নিজস্ব সৌন্দর্যের এক বিশাল ভাণ্ডার আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
চারদিকে ঘন সবুজ বনভূমি, সুউচ্চ ওক, ম্যাপল ও পাইনগাছের সারি, পাখির মৃদু ডাক এবং পাহাড়ি পথের নিস্তব্ধ সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে দিল। বাতাসে ছিল অরণ্যের নির্মল সুবাস, আর চারপাশের শান্ত পরিবেশ মনকে এক গভীর প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলছিল। প্রায় তেরো হাজার একরের বেশি বিস্তৃত এই বনভূমি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি
সর্পিল পাহাড়ি পথ বেয়ে গাড়ি যখন ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন ধাপে ধাপে তার সৌন্দর্যের পর্দা উন্মোচন করছে। কখনো ঘন অরণ্যের ছায়া, কখনো গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের সোনালি আলো, আবার কখনো দূরের পাহাড়ের নীলাভ রেখা আমাদের চোখ ও মনকে বারবার মুগ্ধ করছিল।
অবশেষে আমরা পৌঁছালাম সেই বিখ্যাত ভিউ পয়েন্টে, যার জন্য কুপার্স রক ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এত জনপ্রিয়। বিশাল পাথুরে চূড়ার ওপর দাঁড়িয়ে মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমরা যেন প্রকৃতির এক বিশাল মঞ্চের দর্শক হয়ে গেছি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে চোখের সামনে খুলে গেল অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার অসাধারণ সৌন্দর্য।
সবুজ পাহাড়ের সারি দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আকাশের নীলিমার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। নিচে বহু দূরে চিট নদী পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলেছে। তার চারপাশে সৃষ্টি হওয়া গভীর গিরিখাত, পাহাড়ের ঢাল এবং বিস্তীর্ণ অরণ্যের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য, যা ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা কঠিন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে আঁকা এক বিশাল চিত্রকর্ম আমাদের সামনে মেলে ধরেছে।
সেদিনের সেই বিকেলটি ছিল প্রকৃতি ও প্রিয়জনের মিলিত এক অসাধারণ মুহূর্ত। পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের সোনালি আলো পাহাড়ের চূড়ায় পড়ে এক মায়াবী আবহ তৈরি করেছিল। নির্মল বাতাস, চারপাশের নীরব সৌন্দর্য এবং আপনজনদের উপস্থিতি মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছি।
আরও পড়ুন ভার্জিনিয়ার গ্রেট ফলস পার্কে প্রকৃতির মুখোমুখিকুপার্স রক শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটকের আগমনে এখানকার পরিবহন, ব্যবসা ও পর্যটনসেবা সমৃদ্ধ হচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের এমন সুন্দর সমন্বয় সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা সবাই মিলে সেই বিস্ময়কর ভিউ পয়েন্টে অনেকক্ষণ কাটালাম। কখনো পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছবি তুললাম, কখনো দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।
ছোট্ট বাঁশরী আর প্রাহীও আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছিল। তাদের নির্মল হাসি, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য আর পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য এক অনন্য আবহ সৃষ্টি করেছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন সেদিন শুধু তার সৌন্দর্যই নয়, তার অফুরন্ত শান্তি আর ভালোবাসাও আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। সূর্য যখন ধীরে ধীরে দিগন্তের ওপারে মিলিয়ে যেতে শুরু করলো, তখন পাহাড়ের গায়ে নেমে এলো এক মায়াবী গোধূলি। সেই মুহূর্তে মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো অর্থ বা ঐশ্বর্য নয়, বরং এমন কিছুক্ষণ, যা প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। কুপার্স রকের চূড়ায় দাঁড়িয়ে কাটানো সেই বিকেল তাই শুধু একটি ভ্রমণের স্মৃতি হয়ে থাকেনি, বরং জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে হৃদয়ের গভীরে চিরদিনের জন্য স্থান করে নিয়েছে।
কেএসকে