দেশজুড়ে

কাজ পাওয়া যেন ভাগ্যের খেলা

ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই একে একে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক মানুষ। কারও কাঁধে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, কেউ মাথায় ঝুড়ি, আবার কেউ শুধু একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কোনো সমাবেশ কিংবা হাট বসেছে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়, এটি অন্যরকম এক হাট। এখানে বিক্রি হয় না গরু, ছাগল কিংবা কোনো পণ্য। এখানে প্রতিদিন বিক্রি হয় মানুষের শ্রম। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ে সকাল ৭টা বাজতেই চোখে পড়ে এ দৃশ্য। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ নামে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, সহকারী রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, মাটি কাটার শ্রমিক, টাইলস মিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি সহ নানা পেশার দিনমজুর প্রতিদিন এখানে ভিড় করেন। উদ্দেশ্য একটাই, এক দিনের কাজ পাওয়া। কারণ তাদের কাছে একটা দিন মানেই তার পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা।

Advertisement

ত্রিশালের এই শ্রমিকের হাট শুধু স্থানীয়দের নয়, আশপাশের উপজেলার অনেক শ্রমজীবী মানুষেরও ভরসার জায়গা। বহু ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ভিড় করেন তারা। সকালে বাস কিংবা অটোরিকশায় এসে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। তাদের চোখ থাকে রাস্তার দিকে। কখন কোন ঠিকাদার বা বাড়ির মালিক এসে ডাক দেবেন, সেই অপেক্ষায়।

একই চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও। প্রতিদিন ভোরে সেখানে শত শত দিনমজুর কাজের আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এসে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক বেছে নেন। কেউ কাজ পেয়ে চলে যান, আবার কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন দীর্ঘ সময়। শেষ পর্যন্ত অনেকেই কাজ না পেয়েই ফিরে যান।

প্রতিটি সকাল শুরু হয় আশায়, আর প্রতিটি বিকেল শেষ হয় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কেউ দিনের আয় নিয়ে বাড়ি ফেরেন, কেউ ফেরেন শূন্য হাতে। পরদিন ভোর হলেই আবার একই জায়গায় এসে দাঁড়ান তারা। কারণ জীবন থেমে থাকে না, থেমে থাকে না পেটের দায়ও

Advertisement

ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক বাবুল মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরে যেতে হয়। এখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। তবে সব দিন কাজ পাওয়া যায় না। মাসে অনেক দিনই বসে থাকতে হয়।’

ত্রিশালের ওই হাটে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো মাসিক বেতন নাই। আজ কাজ করলে, আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হবে। যখন ছেলেমেয়েরা কিছু চাইলেও দিতে পারি না, তখন বেশি কষ্ট হয়।’

শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সকালে সবাই দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে, সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়। অনেক সময় সকাল ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কাজ পাওয়া যায় না।’

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় আয়ও কমে যায়। আবার বোরো ধান কাটা কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ শুরু হলে কিছুটা কাজ বাড়ে। তবে বছরের বেশির ভাগ সময়ই অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী। এক দিন কাজ না পেলে সেই দিনের বাজার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় ধারদেনা কিংবা দোকানে বাকির ওপর নির্ভর করতে হয়।

Advertisement

শ্রমিকের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, সরকারি নিবন্ধন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রম তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে শ্রমিক ও নিয়োগদাতা উভয়েই উপকৃত হবেন।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার ও বাড়ির মালিকরা এখানে শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ রাজমিস্ত্রি বা রংমিস্ত্রির পারিশ্রমিক তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই হয়। তবে ভারী কাজ কিংবা দূরের কাজ হলে কিছুটা বেশি মজুরি পাওয়া যায়।

ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বাড়ি নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘এক জায়গায় অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়। তাই সময়ও বাঁচে। কাজের জন্য আলাদা করে লোক খুঁজতে হয় না।’

স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়া বলেন, ‘ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে আগের তুলনায় নির্মাণকাজ কমে গেছে। ফলে শ্রমিকদেরও কাজ কম মিলছে।’

এই হাটে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের বয়সও ভিন্ন ভিন্ন। কেউ সদ্য যৌবনে পা রেখেছেন, আবার কেউ ষাট বছরের কাছাকাছি বয়সেও প্রতিদিন শ্রম বিক্রি করতে আসেন। বয়স বাড়লেও সংসারের দায়িত্ব কমেনি। সন্তানদের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা কিংবা পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে তাদের প্রতিদিনই এই হাটে দাঁড়াতে হয়।

অনেক শ্রমিক জানান, তাদের কোনো স্থায়ী নিয়োগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও নেই। ফলে দুর্ঘটনায় আহত হলে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তখন পরিবারকে চরম সংকটে পড়তে হয়। অনেকেরই নেই সঞ্চয় কিংবা কোনো ধরনের বীমা সুবিধা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় এমন শ্রমিকের হাটকে কেন্দ্র করে। গ্রাম ও শহরের সংযোগস্থলগুলোতে প্রতিদিন এভাবেই শ্রমিক ও কাজদাতার মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়। তবে এই শ্রমবাজার এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন। নেই শ্রমিকদের নিবন্ধন, পরিচয়পত্র কিংবা ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা।

শ্রম অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, এসব শ্রমিকের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, সরকারি নিবন্ধন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রম তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে শ্রমিক ও নিয়োগদাতা উভয়েই উপকৃত হবেন। এতে শ্রমিকদের কাজ পাওয়ার সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করাও সহজ হবে।

ত্রিশালের এই শ্রমিকের হাটের দৃশ্য যেন দেশের লাখো অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবী মানুষের প্রতিদিনের জীবনের প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রতিটি সকাল শুরু হয় আশায়, আর বিকেল শেষ হয় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কেউ দিনের আয় নিয়ে বাড়ি ফেরেন, কেউ ফেরেন শূন্য হাতে। পরদিন ভোর হলেই আবার একই জায়গায় এসে দাঁড়ান তারা। কারণ জীবন থেমে থাকে না, থেমে থাকে না পেটের দায়ও।

শ্রমিকের হাটে সূর্য একটু ওপরে উঠতেই ভিড় ধীরে ধীরে কমে আসে। যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে, তারা ছড়িয়ে পড়েন নির্মাণস্থল, কৃষিজমি কিংবা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে। আর যাদের সেদিন কাজ মেলে না, তারা নীরবে বাড়ির পথে হাঁটেন। তাদের চোখে থাকে পরের দিনের অপেক্ষা। হয়তো আগামীকাল ভাগ্য বদলাবে, হয়তো আগামীকাল মিলবে এক দিনের রুটি-রুজি। একই আশাতে প্রতিদিন বসে এই শ্রমিকের হাট, যেখানে বিক্রি হয় মানুষের শ্রম, আর কেনাবেচা হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

হোসাইন সুলভ/কেজে/এএসএম