জাতীয়

‘গ্যাস নিতেই চলে যায় ৭-৮ ঘণ্টা, সিএনজি চালামু কখন?’

কয়েক সপ্তাহ ধরে সারাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট। বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা জ্বলছে না, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম, দীর্ঘলাইনের কারণে যানবাহনে ঠিকমতো গ্যাস নিতে পারছেন না চালকরা। বিশেষ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। আয় কমলেও গাড়ির জামানতের টাকা দিতে হচ্ছে নিয়মিত। এ অবস্থায় সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে তাদের।

Advertisement

তেমনই এক সিএনজিচালক আশরাফুল। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চারজনের সংসার তার। সিএনজি চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করেন তিনি। তবে টানা গ্যাস সংকটের কারণে উপার্জন কমেছে। দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় চলে যায় পাম্পে গ্যাস নিতে। প্রতিদিন ভোর থেকে ঘণ্টাচারেক অপেক্ষার পর ১০০ থেকে ১৫০ টাকার গ্যাস নিতে পারেন। দুপুর পর্যন্ত চালিয়ে পাম্পের সামনে ফের সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আরও তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। দিনশেষে আয়-রোজগার যাই হোক সিএনজির মালিককে ১ হাজার ২০০ টাকা গুনে দিতে হয়।

আরও পড়ুন গ্যাস নিতে ফিলিং স্টেশনেই ‘দিনপার’, চুলা জ্বলে না বাসায়

রাজধানীর মগবাজার মোড়ে আশরাফুলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে প্রায় আধঘুম অবস্থা তার।

আশরাফুলকে ডাক দিতেই চোখ মুছে কথা বলেন, জানালেন আক্ষেপের কথা। এই সিএনজিচালক জাগো নিউজকে বলেন, ‘চুরি-ডাকাতি তো করি না। সিএনজি চালায়ে খাবো সেই অবস্থাও নেই। টানা এতদিন এভাবে গ্যাসের সমস্যা থাকে নাই কখনো। এভাবে আর কতদিন চলবে কে জানে।’

Advertisement

গ্যাসের জন্য ফিলিং স্টেশনে সিএনজিচালকদের দীর্ঘলাইন/ছবি: জাগো নিউজ

আয় কমায় সংসারের দুরবস্থার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষরে আর দ্যাখে কে! এই যে গ্যাসের সমস্যা চলতাছে...ভোর ৫টায় এসে লাইনে দাঁড়ায়ে একবার গ্যাস নিছি। চাপ নেই, ১০০-১৫০ টাকার গ্যাস ঢোকে। দুই ঘণ্টা চালাতেই গ্যাস শেষ। দুপুরে আইসা আবার সিরিয়াল। প্রায় ৩ ঘণ্টা হলো বসে আছি। গ্যাস পাইতে আরও ঘণ্টাখানেক লাগবে। দিনে যদি ৭-৮ ঘণ্টা গ্যাস নিতেই চলে যায় তাইলে সিএনজি চালামু কখন?’

আশরাফুল বলেন, ‘ইনকাম না থাকলেও মালিককে রাতে ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়, কম রাখে না। বাসায় বৌ-বাচ্চা আছে। এখন ডেইলি খরচা কামানোই কষ্ট, সংসারের খরচ তো আছেই। কার কাছে অভিযোগ করবো? আমাগো দিন প্যাটে-ভাতেই যাইবো।’

আরও পড়ুন গ্যাসের স্বল্পচাপ, এক খাবার রান্না করতেই চলে যায় কয়েক ঘণ্টা

শুধু আশরাফুল নন, ঢাকাসহ সারাদেশে সিএনজিচালকদের একই অবস্থা। গ্যাস নেই। সংকটে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঠিক কবে নাগাদ এই সংকট কাটবে তাও বলতে পারছে না সরকার। এতে একদিকে সিএনজিচালকদের যেমন আয় কমেছে। বাসাবাড়িতেও গ্যাস নেই। চুলা জ্বলছে না অনেক গৃহিণীর। আবার সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার উৎপাদনে ধস নেমেছে।

Advertisement

রাজধানীর শাহবাগে কথা হয় সিএনজিচালক মতিয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগে তিন হাজারের বেশি ইনকাম করতাম। এখন ১ হাজার ৫০০ টাকা ইনকাম করতেই টেনশন লেগে যায়। গ্যাস পাই না। দিনের বেশিরভাগ সময় পাম্পে সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকি। গাড়ি চালানোর সময়ই তো পাই না। এই অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকা লাগবে।’

বকশিবাজার এলাকায় সিএনজিচালক মজনু মিয়া বলেন, ‘সংসার কষ্টে চলতাছে। আয়-রোজগার নাই। গ্যাস নাই, তো আয় আসবো কোত্থেকে! পাম্প বেশিরভাগই বন্ধ। যে কয়টা খোলা লম্বা সিরিয়াল। কখন গ্যাস নেবো আর কখন গাড়ি চালাবো।’

যে কারণে সংকট তীব্র

মহেশখালীতে স্থাপিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে দেশের সার্বিক গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘাটতির প্রভাব রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়েছে।

আরও পড়ুন গ্যাস সংকটে স্থবির আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল, শিপমেন্ট নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা

তবে এই এফএসআরইউ ঠিক কবে নাগাদ ঠিক হবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। আর এফএসআরইউ মেরামত শেষে গ্যাস সরবরাহ শুরু না করলে সংকট কাটবে না।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। কবে নাগাদ মেরামত সম্পন্ন হবে তা বলা যাচ্ছে না। কোনো দিন-তারিখ আমাদের এখনো জানায়নি, কাজ চলছে।’

দীর্ঘমেয়াদে সমাধান কী?

গ্যাসের সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদে সমাধান জানতে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমামের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন-অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। এটা ছাড়া সমাধানের কোনো উপায় নেই। সরকার বলছে পরিকল্পনা নিচ্ছে, ১০০ কূপ খনন করছে। বাস্তবে তা করছে না। সরকারের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই।’

আরও পড়ুন বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন, বাসায়ও জ্বলছে না চুলা

মালয়েশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়ে সরকার চিন্তা করছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এতে খরচ বাড়বে। আমাদের তো নিজস্ব গ্যাস আছে। সেগুলো অনুসন্ধান করে উৎপাদন করলেই হয়। এটাই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

এদিকে এর আগে চলতি সপ্তাহে গ্যাস সংকট পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বরে জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এছাড়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানান তিনি। তবে সেই পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।

মেইন লাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক পাম্পে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে/ছবি: জাগো নিউজ

গ্যাস সংকট পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের পক্ষ থেকে সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি বাসা-বাড়িতে মা-বোনেরা, গৃহিণীরা সংসারের রান্নার কাজে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ অনুভব করছেন। ইন্ডাস্ট্রিগুলোর প্রোডাকশন কম্প্রোমাইজড হয়েছে। এই কারণে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি জনগণের কাছে।’

আরও পড়ুন আগামী সপ্তাহে গ্যাস সংকট পরিস্থিতির উন্নতি হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

তিনি বলেন, ‘বলতে কোনো দ্বিধা নেই এটা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি নয়। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু, স্টিল তারা দেশের এই সাপ্লাইটা এনসিওর করে। আমরা তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। আমরা এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারছি না, এটা আমাদের সীমাবদ্ধতা। আমরা এজন্য বারবার দুঃখপ্রকাশ করছি। কিন্তু, একেবারে ২৪/৭ আমাদের টিম তাদের সঙ্গে একান্তভাবে কাজ করছে। আমরা যেটা বললাম, আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে ইনশাআল্লাহ।’

এনএস/ইএ