লাইফস্টাইল

রমজানে ওজন বৃদ্ধি ও বদহজম এড়াতে যা খেতে পারেন

রমজানে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার কারণে অনেকেরই খাবারের ধরনে হঠাৎ পরিবর্তন আসে। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর ইফতারের টেবিল যখন ভরে ওঠে নানা পদের খাবারে, তখন প্রথম লোকমাটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আনন্দের। কিন্তু সেই আনন্দের মুহূর্তেই অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেশি খাওয়া হয়ে যায়।

Advertisement

ইফতার ও সেহেরিতে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত বা মিষ্টি খাবার গ্রহণ করলে খুব দ্রুত ওজন বাড়তে পারে এবং বদ হজম হয়। অথচ সঠিক খাবার বেছে নিলে রোজার মাসেও ওজন নিয়ন্ত্রণও এবং বদ হজম কমানো সম্ভব। সুষম ও পরিমিত খাবারই হতে পারে সুস্থ ও ফিট থাকার মূল চাবিকাঠি।

রোজার পর আমরা কেন অতিরিক্ত খাই-দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই কিছু জৈবিক পরিবর্তন ঘটে। রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়, আর ক্ষুধার হরমোন গ্রেলিন বেড়ে যায়। শরীর তখন দ্রুত শক্তির খোঁজে থাকে। ফলে ইফতারে উচ্চ-চিনি ও উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়।

দুবাইয়ের ডায়েটিশিয়ান ডা. জাসিরা মণিপারাম্বিলের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ না খাওয়ার পর খুব দ্রুত খাবার খেলে শরীরের ‘পূর্ণতা’ সংকেত দেরিতে কাজ করে। ফলে মস্তিষ্ক তৃপ্তির বার্তা পাওয়ার আগেই আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলি। এর সঙ্গে যোগ হয় আবেগ পারিবারিক আড্ডা, ঐতিহ্য মিলিয়ে অতিরিক্ত খাওয়া হয়।

Advertisement

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কীভাবে রোজা ভাঙছেন। ধীরে শুরু করাই মূল চাবিকাঠি। পানি ও একটি বা দুটি খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করে কিছুক্ষণ বিরতি নিলে শরীর প্রস্তুত হওয়ার সময় পায়। এরপর স্যুপ, ফল বা হালকা সালাদের মতো খাবার নেওয়া যেতে পারে। মূল খাবারের আগে অল্প বিরতি রক্তে শর্করা স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে এবং পেটকে ভারী খাবার গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে। ধীরে ধীরে এবং ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া পূর্ণতার অনুভূতি বাড়ায় এবং অতিরিক্ত খাওয়া কমায়।

অনেকেই ইফতারকে দিনের প্রধান ও বড় খাবার হিসেবে ধরে এক প্লেটে সবকিছু তুলে নেন। কিন্তু খাবার ভাগ করে নেওয়া শরীরের জন্য বেশি আরামদায়ক।

হালকা ইফতারের পর কিছু সময় বিরতি দিয়ে সুষম রাতের খাবার এবং পরে পুষ্টিকর সেহেরি গ্রহণ করলে হজম প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং শক্তির মাত্রা স্থিতিশীল থাকে। রমজানে যে ক্লান্তি অনেকেই অনুভব করেন, তা প্রায়ই রোজার কারণে নয়, বরং ইফতারে অতিরিক্ত ভারী খাবারের ফল।

শুধু খাবারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে খাবারের গঠনের ওপরও। ফাইবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘ সময় তৃপ্ত রাখে এবং রক্তে শর্করার ওঠানামা কমায়। শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মাছ, ডিম, চর্বিহীন মাংস, গোটা শস্য এবং দইয়ের মতো খাবার প্লেটে রাখলে তা পেট ভরায় কিন্তু অযথা ক্যালোরি বাড়ায় না।

Advertisement

প্লেটের অর্ধেক সবজি, একটি অংশ প্রোটিন এবং নিয়ন্ত্রিত শস্য রাখার অভ্যাস দ্রুত শক্তি ওঠানামার চক্র কমাতে সাহায্য করে। ছোট প্লেট ব্যবহার করা এবং আগে থেকেই অংশ নির্ধারণ করে নেওয়া অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমাতে কার্যকর হতে পারে।

মনোযোগ সহ খাওয়াঅতিরিক্ত খাওয়া সবসময় শারীরিক ক্ষুধার ফল নয়। অনেক সময় এটি অভ্যাস, সামাজিক প্রভাব বা মানসিক আরামের অংশ। তাই মনোযোগী খাওয়া জরুরি। ধীরে খাওয়া, খাওয়ার সময় স্ক্রিন এড়িয়ে চলা এবং পেট ভরা অনুভূতির দিকে খেয়াল রাখা অতিরিক্ত খাবার থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে।

মিষ্টি ও ভাজা খাবার কি একেবারে বাদ?রমজানের মিষ্টি ও ভাজা খাবার ঐতিহ্যের অংশ। সেগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে ভারসাম্য রাখা জরুরি। ইফতার শুরু করা উচিত সুষম ও পুষ্টিকর খাবার দিয়ে, যাতে অতিরিক্ত ক্ষুধা কমে। ভাজা খাবারের বদলে বেকড বা গ্রিলড বিকল্প বেছে নেওয়া যেতে পারে। প্রধান খাবারের পর অল্প পরিমাণ মিষ্টি গ্রহণ করা ভালো, আর ভারী সিরাপজাত মিষ্টির বদলে ফল, দই বা কম চিনিযুক্ত ঘরোয়া ডেজার্ট স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে।

সেহেরি কখনো বাদ দেবেন নাসেহেরি বাদ দেওয়া উচিত নয়। সেহরি এড়িয়ে গেলে সারাদিনের ক্ষুধা আরও তীব্র হয় এবং ইফতারে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। প্রোটিন, ফাইবার ও পর্যাপ্ত পানি সমৃদ্ধ সেহরি সারাদিন শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।

রমজানে টেবিল ভরে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনার প্লেটও ভরতেই হবে। সংযম মানে আনন্দ হারানো নয়, বরং সচেতনভাবে উপভোগ করা। ধীরে শুরু করা, সুষম নির্বাচন এবং মনোযোগী খাওয়ার অভ্যাসই রমজানে ওজন বৃদ্ধি ও বদহজম এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সূত্র: গালফ নিউজ

 

আরও পড়ুন:রোজার আগে ইফতারের সঠিক প্রস্তুতির টিপস রোজায় নতুন মায়েদের যত্ন নেবেন যেভাবে 

এসএকেওয়াই/