পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব, আমাদের আত্মপরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই দিনে আমরা খুঁজি শেকড়, খুঁজি সংস্কৃতির গভীরতা। বাংলা নববর্ষ বরণের অন্যতম আকর্ষণ পান্তাভাত ও ইলিশ, যা বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। তবে পান্তা-ইলিশের সেই আগের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ পহেলা বৈশাখের সহজ-সরল, প্রাণবন্ত ঐতিহ্যও।
Advertisement
একসময় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পান্তাভাত, কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, আর পান্তার স্বাদ বাড়িয়ে দিতে পাতে যুক্ত করা হতো বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচামরিচের সঙ্গে ইলিশ ভাজার সুবাস মিলেই তৈরি হতো এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আর মাটির বাসনে পরিবেশনে এই খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দিতো।
পান্তা-ইলিশ ঐতিহ্যের অংশএই সাধারণ অথচ হৃদয়ছোঁয়া খাবারটি শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, ছিল ঐতিহ্যের অংশ। পহেলা বৈশাখের দিনে পান্তাভাতের আয়োজেন মাধ্যমে বাংলা বর্ষকে বরণ করে নেওয়া হতো। গ্রামে গ্রামে দিনব্যাপী পান্তাভাতের আয়োজন চলতো। শুধু তাই নয় শহরের অনেকে ঘরেও পান্তাভাতের আয়োজন করা হতো। যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মাটির গন্ধ, গ্রামীণ জীবনের সহজ সুখ, আর একধরনের নির্ভেজাল আনন্দ।
সেই সময়ে হাটবাজারে হরহামেশাই মিলত ইলিশ মাছ। নদীমাতৃক এই বাংলায় ইলিশ ছিল সহজলভ্য, আর তাই পহেলা বৈশাখের পান্তাভাত মানেই ছিল ইলিশের ঘ্রাণে ভরা এক সকাল। দিনের প্রথম প্রহরেই প্রতিটি বাড়িতে শুরু হতো বৈশাখ বরণের প্রস্তুতি মাটির হাঁড়িতে ভিজে থাকা ভাত, পাশে গরম গরম ইলিশ ভাজা, আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ।
Advertisement
শুধু পারিবারিক পরিসরেই নয়, পান্তা-ইলিশ ছিল সামাজিক বন্ধনেরও এক অনন্য মাধ্যম। গ্রামে দলবদ্ধভাবে আয়োজন করা হতো পান্তা-ইলিশের ভোজ। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে বসত একসঙ্গে। কেউ কেউ আবার পিকনিকের আমেজে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করতেন। শুধু তাই নয়, দেশের অনেক গ্রামেই চলত পান্তা-ইলিশের মেহমানদারি। বড় বড় হাঁড়িতে করে খাবার নিয়ে রাস্তার পথিকদেরকেও খাওয়ানো হতো। যা শুধু খাবার ভাগাভাগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল সম্পর্কের উষ্ণতা বিনিময়ের এক অপূর্ব উপলক্ষ। অথচ আজকের বাংলাদেশে সেই পান্তা ইলিশের জনপ্রিয়তা হারিয়ে যাচ্ছে।
ইলিশ কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্তের পকেটে টানতবে কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হাজারো কথা মাথায় ঘুরপাক খায়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে সেই ইলিশ এখন আর সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নেই। দেশের নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়লেও বাজারে এর দাম আকাশছোঁয়া। ফলে নিম্নবিত্ত তো বটেই, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষেও ইলিশ কেনা অনেকটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন একটি ইলিশ মাছ কিনতেই একজন সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়, তখন পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই প্রথা থেকে সরে আসছেন। এটি শুধু একটি খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নয় বরং একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন আর অর্থনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে পান্তা-ইলিশের সেই ঐতিহ্যের জনপ্রিয়তা দিন দিন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।
নামিদামি রেস্তোরাঁয় ‘স্পেশাল বৈশাখী মেনু’ আয়োজন থাকেবর্তমানে পহেলা বৈশাখ মানেই অনেকের কাছে রেস্তোরাঁয় গিয়ে ‘স্পেশাল বৈশাখী মেনু’ খাওয়া। যেখানে পান্তাভাত থাকলেও তা হয়ে উঠেছে বিলাসবহুল একটি আইটেম সাজানো প্লেটে, বাড়তি দামে। অথচ এই পান্তাভাতের মূল সৌন্দর্য ছিল তার সরলতায়, তার সহজলভ্যতায়। এক কথায় পহেলা বৈশাখকে আমরা অনেকটা ‘ইভেন্ট’ বানিয়ে ফেলেছি সেলফি, নতুন পোশাক, ঘোরাঘুরি আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করার প্রতিযোগিতা।
বাংলা নববর্ষ বরণে পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নিতবুও আশার কথা হলো বাংলা নববর্ষ বরণে পান্তাভাতের এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখনো দেশের অনেক গ্রামে, এমনকি শহরের কিছু পরিবারেও পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তাভাত খাওয়ার আয়োজন হয়। কেউ ইলিশের পরিবর্তে অন্য মাছ ব্যবহার করছেন, কেউবা শুধু পেঁয়াজ-মরিচ দিয়েই পান্তাভাত খেয়ে সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
Advertisement
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় নতুন করে শুরু করতে, পুরোনোকে মূল্য দিতে। আর সেই পুরোনোর ভাঁজেই লুকিয়ে আছে পান্তা-ইলিশের হাজারো স্মৃতি যা শুধু একটি খাবারের স্মৃতি নয় বরং একটি সংস্কৃতির, একটি জীবনবোধের প্রতিচ্ছবি। পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশের সেই স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে গ্রামীণ সংস্কৃতি টিকে রাখতে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। নদী ও জলাশয়ের সুরক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ, সঠিক ব্যবস্থাপনা এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ইলিশ ধীরে ধীরে আরও দুর্লভ হয়ে উঠবে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের সংস্কৃতির ওপর।
করণীয়একইসঙ্গে ইলিশের দামও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে রাখতে হবে। যদি এই মাছটি কেবল উচ্চবিত্তের খাবার হয়ে যায়, তাহলে পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্যও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে কিছু নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই গ্রামীণ সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা যেন শুধু বইয়ের পাতায় বা ছবিতে পান্তা-ইলিশ না দেখে বরং নিজেরা সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। না হলে একসময় সত্যিই হয়তো এমন দিন আসবে, যখন বাংলা বর্ষ বরণে পান্তা-ইলিশ আর দেখা যাবে না থাকবে শুধু স্মৃতি, গল্প আর আফসোস।
আরও পড়ুনপহেলা বৈশাখ কি আগের স্বকীয়তা ধরে রাখতে পেরেছে?বাংলা দিন, মাস-বছর গণনা কে, কবে শুরু করেকেএসকে