দেশজুড়ে

জনবল সংকটে পড়ে আছে হাসপাতালের ৪৮ কোটি টাকার ছয়তলা নতুন ভবন

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চিকিৎসা সেবার প্রসারে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ করেছে সরকার। এসব অত্যাধুনিক ভবনে রয়েছে লিফটের ব্যবস্থাসহ আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিট। কিন্তু জনবল সংকটে চালু হয়নি ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালের ৬তলা নতুন ভবন।

Advertisement

গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি) রাঙ্গামাটি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচির (৪র্থ এইচপিএনএসপি)’ আওতায় রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের জন্য ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করে সরকার। ১১তলা ভিতবিশিষ্ট ৬তলা ভবনটি নির্মাণে প্রকল্প (প্রথম পর্যায়) ব্যয় ছিল মোট সাড়ে ৪৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে ভৌতখাতে ৩৪ কোটি এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি খাতে ব্যয় ছিল সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। ভবনটিতে ১ হাজার ৬০০ কেজি ধারণসক্ষমতা সম্পন্ন দুইটি লিফট, ১ হাজার কেজি ওজন সক্ষমতা সম্পন্ন আরও দুইটিসহ মোট চারটি লিফট রয়েছে। এছাড়া সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের জন্য পাইপলাইন।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ৫ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। তবে রাঙ্গামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এটি হস্তান্তর করা হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে। নির্দিষ্ট সময়ে ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও এক বছরের অধিক সময় পর ভবন বুঝে নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে এখনো পর্যন্ত হাসপাতালের নতুন ভবনে সেবা প্রদান কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিডব্লিউডি রাঙ্গামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী শর্মি চাকমা বলেন, ‘রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের ২৫০ শয্যার ১১তলা ভিতবিশিষ্ট ৬তলা ভবনটি এরই মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ভবন বুঝে নিলেও এখনো সেবা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি বলে জেনেছি। ভবন নতুন নির্মিত হলেও সেটি যদি অব্যবহৃতভাবে থাকে, সেক্ষেত্রে লিফটসহ অন্যান্য যেসব ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী রয়েছে সেগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

Advertisement

রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল ও পিডব্লিউডি সূত্রে জানা গেছে, ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ফার্মেসি, স্টোর রুম, টিকিট কাউন্টারসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হবে। দ্বিতীয় তলায় ২০ শয্যার আইসিইউ ও আইসোলেশন কক্ষ রয়েছে। তৃতীয় তলায় বিশেষত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত প্যাথোলজিক্যাল ল্যাব, এক্স-রে, এমআরআই ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট হবে। চতুর্থ তলা জুড়ে অপারেশন থিয়েটার (ওটি), পঞ্চম তলায় পোস্ট অপারেটিভ ইউনিট (অপারেশনের পর রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার কক্ষ) এবং ষষ্ঠ তলায় রোগীদের জন্য ওয়ার্ড ও কেবিন থাকবে।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে প্রতিনিয়ত ১০০ এর অধিক রোগী ভর্তি থাকেন। বিভিন্ন সময় সিট বরাদ্দ না পেয়ে অনেক রোগীকে থাকতে হয় হাসপাতালের মেঝে ও করিডোরে। মেঝে ও করিডোরে গাদাগাদি করে থাকা রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে। নতুন অত্যাধুনিক ভবনে কিছু বিভাগ ও রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওয়ার্ড ও কেবিন স্থানান্তর করা হলে এ সংকট লাঘব হবে। তবে ১০০ শয্যার বর্তমান হাসপাতালটিতে রোগীদের সেবা প্রদানকারী জনবল পর্যাপ্ত না থাকায় নতুন ভবনে স্থানান্তর হতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

চিকিৎসকরা বলছেন, পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটি অন্যান্য জেলার চেয়ে চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে। তবে এ জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন, উপজেলাকেন্দ্রিক আধুনিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং জেলার একমাত্র জেনারেল হাসপাতালের উন্নীতকরণের ফলে স্বাস্থ্য সেবায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। উপজেলাকেন্দ্রিক উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না থাকা এবং চিকিৎসক সংকটের কারণে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল রেফার্ড হাসপাতাল হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এখানকার উপজেলাগুলো দুর্গম হওয়ার কারণে উপজেলার প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেকটাই ‘শেষ ভরসা’ রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) শওকত আকবর বলেন, জনবল সংকট, ফার্নিচার ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি না পাওয়ায় এখনো নতুন ভবনে চিকিৎসা সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। আমরা পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়েছি। উনিও চেষ্টা করছেন এ বিষয়ে সহযোগিতা করার।

Advertisement

রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন ও ১০০ শয্যা বিশিষ্ট রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূয়েন খীসা বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগ আমাদের গত বছরের শেষদিকে ১১তলা ভিত বিশিষ্ট ছয়তলার হাসপাতাল ভবনটি হস্তান্তর করে। নতুন ভবনটিতে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা থাকলেও আমরা শুধুমাত্র জনবল সংকটের কারণে কার্যক্রম শুরু করতে পারছি না। ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের জন্য অনুমোদন নিতে হবে। আমরা যদি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক অনুমোদন পেতাম, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জনবলের জন্য চাহিদাপত্র দিতে পারতাম। দাপ্তরিক কাজ হলে একই ব্যক্তি দুইটা উপজেলায়ও একই সঙ্গে দায়িত্বপালন করতে পারেন। কিন্তু এখানে দুইটা আউটলেট একই জনবল দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। সে কারণে আমাদের সেবা প্রদানে হিমশিম খেতে হলেও পুরোনো ভবনেই কার্যক্রম চলছে।’

এফএ/এমএস