আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায়ও গতিশীল চীনের অর্থনীতি

ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও বছরের প্রথম তিন মাসে বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক পণ্যের শক্তিশালী রপ্তানি চীনের অর্থনীতি ত্বরান্বিত করেছে। এই প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

Advertisement

তবে সামনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ‘অস্থির’ বলে সতর্ক করেন কর্মকর্তারা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল করে দিচ্ছে ও রপ্তানিনির্ভর চীনের অর্থনীতির জন্য এটি ঝুঁকি তৈরি করছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (এনবিএস) জানায়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে গত বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। সংস্থাটি এই প্রবৃদ্ধি ‘দৃঢ় সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করলেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম বড় অর্থনীতি হিসেবে প্রথম প্রান্তিকের জিডিপি তথ্য প্রকাশ করলো চীন।

Advertisement

এক সংবাদ সম্মেলনে এনবিএসের উপকমিশনার মাও শেংইয়ং বলেন, বহির্বিশ্বের পরিস্থিতি আরও জটিল ও অস্থির হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে শক্তিশালী সরবরাহ ও দুর্বল চাহিদার মতো কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা এখনো স্পষ্ট।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) প্রকাশিত অর্থনৈতিক তথ্য দেখাচ্ছে, এই যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কাঁচামালের খরচ বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে। এতে চীনের ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে, যারা ২০২১ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি রিয়েল এস্টেট সংকটের কারণে আগেই ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে।

রপ্তানির ওপর নির্ভরতা

চীন দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খাতের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। ফলে গত বছর দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়নে (১ ট্রিলিয়ন= ১ লাখ কোটি) পৌঁছায়।

Advertisement

তবে বিপুল তেল ও গ্যাস মজুত এবং বহুমুখী সরবরাহ উৎস থাকার কারণে জ্বালানি ধাক্কা থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও রপ্তানির ওপর নির্ভরতা এখন বড় দুর্বলতা হয়ে উঠছে।

কিছু উদ্বেগজনক ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। বছরের প্রথম দুই মাসে রপ্তানি ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়লেও মার্চে তা কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহন ধীর হয়ে যায় এবং লজিস্টিক খরচ বেড়ে যায়।

আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সেএর চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ জিচুন হুয়াং বলেন, চীনের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও এটি ক্রমেই বহির্বিশ্বের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ইরান যুদ্ধ এই প্রবণতা আরও বাড়াতে পারে, যদিও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে এর প্রভাব সীমিত হতে পারে।

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মার্চের পতনের পেছনে চীনা নববর্ষের মৌসুমি প্রভাবও রয়েছে। পুরো প্রান্তিকে রপ্তানি এখনও ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের ৫ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি।

চীনের শক্তির জায়গা হলো উচ্চমূল্য সংযোজন ও উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এবং সবুজ প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা। বৈশ্বিক তেল সংকট এসব পণ্যের চাহিদা আরও বাড়াতে পারে।

হুয়াং আরও বলেন, জ্বালানির দামের ধাক্কা সত্ত্বেও সেমিকন্ডাক্টর ও সবুজ প্রযুক্তির শক্তিশালী চাহিদার কারণে আগামী প্রান্তিকগুলোতে রপ্তানি ভালো অবস্থায় থাকবে।

প্রথম প্রান্তিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি ও উইন্ড টারবাইন পণ্যের রপ্তানি যথাক্রমে ৭৮ শতাংশ, ৫০ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ বেড়েছে বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ভোগব্যয় হতাশাজনক

এদিকে, চীনের রপ্তানি ও উৎপাদন খাত ভালো করলেও ভোগব্যয় অর্থনীতিবিদদের হতাশ করেছে।

শিল্প উৎপাদন আগের দুই মাসের তুলনায় কিছুটা ধীর হলেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি, বছরে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু খুচরা বিক্রি মার্চে কমে বছরে ১ দমমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বছরের প্রথম দুই মাসে ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্লেষক ইয়িং ঝাং বলেন, ভর্তুকির প্রভাব কমে আসা ও গাড়ির চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় খুচরা বিক্রির গতি কমছে। তিনি আরও বলেন, গঠনমূলক সংস্কারের অভাবে ২০২৬ জুড়েই ভোগব্যয় দুর্বল প্রবৃদ্ধির চালক হয়ে থাকবে।

এদিকে, পণ্যমূল্য, বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে তিন বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো কারখানা পর্যায়ের মূল্য সূচক ইতিবাচক হয়েছে।

উৎপাদক মূল্য সূচক (পিপিআই) বছরে ০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা সেপ্টেম্বর ২০২২-এর পর প্রথম ইতিবাচক প্রবণতা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার কারণে চীনের শিল্প খাত তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে, যা অর্থনীতিতে মূল্যপতনের চাপ তৈরি করেছিল।

দীর্ঘদিন ধরে মূল্যপতন কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে চীন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ‘খরচ-চালিত মূল্যস্ফীতি’ কাঙ্ক্ষিত সমাধান নয়।

কারণ উৎপাদন খরচ বাড়ার ফলে পণ্যের দাম বাড়লে তা ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াবে, যারা এরই মধ্যে কম খরচ করছে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: সিএনএন

এসএএইচ