দেশজুড়ে

কুয়াকাটা সৈকতে ১৪ দিনে ভেসে এলো ৩ মৃত কচ্ছপ-ডলফিন

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে গত ১৪ দিনে ভেসে এসেছে বিরল প্রজাতির মৃত ৩টি সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং ৩টি ডলফিন। সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে এসব প্রাণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

Advertisement

জানা গেছে, গত ৩ এপ্রিল দুপুরে জোয়ারে সৈকতের মাঝি পয়েন্ট এলাকায় একটি কচ্ছপ, ৫ এপ্রিল সী-ভিউ সংলগ্ন এলাকায় ভেসে আসে ৮ ফুট লম্বা মৃত ইরাবতী ডলফিন। এর একদিন পর অর্থাৎ ৬ এপ্রিল ফের একটি কচ্ছপ ভেসে আসে একই স্থানে। এরপরে গত ১১ এপ্রিল লেম্বুরবন এলাকায় আবার একটি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে যার দৈর্ঘ্য প্রায় দশ ফুট। এছাড়া ১৫ এপ্রিল সকালে দেখা মিলে একটি সামুদ্রিক কচ্ছপের, যার আনুমানিক ওজন ৩৫ কেজি।

সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল সকালে সৈকতের জিরো পয়েন্ট এলাকায় জোয়ারে ভাসতে দেখা যায় একটি ৯ ফুট লম্বা ইরাবতী ডলফিনের।

পরে উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) সদস্য মো. জলিলুর রহমান ডলফিনটি দেখেন। পরে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং বনবিভাগকে খবর দিলে বন বিভাগের সদস্যরা এসে ডলফিনটিকে মাটি চাপা দেয়।

Advertisement

বাংলাদেশ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)-এর সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম বাচ্চু জানান, আজকে উদ্ধার হওয়া ডলফিনটি একটি পুরুষ ডলফিন এবং বিশ্বব্যাপী বিপন্ন প্রজাতির তালিকাভুক্ত।

তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর উপকূলের কুয়াকাটা এলাকায় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম শুরু হলে মাঝে মধ্যে মৃত কচ্ছপ ভেসে আসে গত ৩-৪ বছরে বেশীরভাগ সময়ে শুশুক, ইরাবতী ডলফিন , বোতল-নাক ডলফিন, স্পিনার ডলফিন সমুদ্রে ভেসে এসেছে। এছাড়াও বাংলাদেশে মূলত ৫-৬ প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ দেখা যায়, যার মধ্যে জলপাইরঙা বা অলিভ রিডলে, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ, হকসবিল কচ্ছপ, লগারহেড কচ্ছপ, চামট বা লেদারব্যাক কচ্ছপ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি উদ্বেগজনক। এর পেছনে জলদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা জেলেদের জালে আটকা পড়ার মতো কারণ থাকতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে গবেষণা প্রয়োজন।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৩ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত মোট ৫০টি বিভিন্ন প্রজাতির মৃত ডলফিন এবং শতাধিকের বেশি কচ্ছপ ও রাজ কাঁকড়া ভেসে এসেছে। ভেসে আসা এই ডলফিন ও কচ্ছপের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করা সম্ভব না হলেও জেলেদের অসচেতনতা, সমুদ্রে পরিবেশ নষ্টকেই দায়ী করছেন অনেকে। তবে পরিবেশবাদীরা এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে এগুলো বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপের দাবি করেন।

ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, উপকূলীয় এলাকায় একের পর এক সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। কচ্ছপ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের সংখ্যা কমে গেলে পুরো খাদ্যচক্রে প্রভাব পড়ে। তাই দ্রুত এ বিষয়ে সমন্বিত গবেষণা, নজরদারি এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

Advertisement

তিনি আরও বলেন, আমাদের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৩ সালে ১৫টি, ২০২৪ সালে ১০টি এবং ২০২৫ সালে ১৭টি এবং ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৮টি মৃত্যু ডলফিন এবং অসংখ্য কচ্ছপের দেখা মিলছে। এ মধ্যে অনেক ডলফিন অসুস্থ অবস্থায় তীরে আসলে আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সমুদ্রে অবমুক্ত করেছি। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে চেষ্টা করে আসলেও সরকারিভাবে এটা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ কিংবা গবেষণা নেই। কিন্তু এটা জরুরি।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই আমরা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে কচ্ছপ-ডলফিন উদ্ধার করি। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে এগুলোর দেহে পচন ধরে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে পৌরসভা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে এগুলোকে নির্ধারিত স্থানে মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আবার অনেক সময়ে আমরা স্যাম্পল সংগ্রহ করে বিভিন্ন গবেষকদের পাঠাই।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স, মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, কুয়াকাটা সৈকতে কচ্ছপ (বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপ) মারা যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। ট্রলার ও জেলেদের জালে কচ্ছপ আটকে যায়, ফলে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলে শ্বাস নিতে না পেরে মারা যায়। নৌযানের আঘাত (স্পিডবোট, ট্রলার) কচ্ছপকে ধাক্কা দেয় অনেক সময় সিল ভেঙে যায় বা ক্ষতি হয়। শিল্প বর্জ্য, তেল, এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ সমুদ্রে মিশে কচ্ছপের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। সৈকতে ভেসে আসা মৃত কচ্ছপের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব কারণগুলো জড়িত।

তিনি আরও বলেন, কচ্ছপ মারা যাওয়া সমুদ্রের পরিবেশের জন্য একটি খারাপ লক্ষণ। কারণ, কচ্ছপকে সমুদ্রের স্বাস্থ্যকর বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে ধরা হয়। তাই তাদের মৃত্যু সমুদ্রের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক দূষণ কমানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা কেএম. মনিরুজ্জামান জানান, উপকূলীয় এলাকায় মাঝেমধ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় জেলেদের জালে আটকা পড়ে কিংবা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কচ্ছপ মারা যায়। বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং মৃত কচ্ছপ-ডলফিনের খরব পেলে দ্রুত মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থাসহ সার্বিকভাবে তাদের সহযোগিতা করা হয়।

আসাদুজ্জামান মিরাজ/এনএইচআর/এএসএম