ফিচার

বাঁশ-বেতের শিল্পে পাহাড়ের প্রাণ, টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম লাকি চাকমার

পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এখানকার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও জীবনধারার জন্যও অনন্য। পাহাড়ের বুকে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্রে লুকিয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাদের তৈজসপত্র। যা শুধু ব্যবহারিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও শক্তিশালী প্রতীক। সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হারিয়ে যেতে বসেছে এসব ঐতিহ্যবাহী তৈজসপত্রের ব্যবহার।

Advertisement

নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় এক ভিন্ন রকম উদ্যোগ নিয়ে লড়াই করছেন রাঙ্গামাটির লাকি চাকমা। প্রশিক্ষণ নিয়ে গড়ে তুলেছেন ঐতিহ্যবাহী তৈজসপত্রের এক বিশাল সম্ভার। নারী উদ্যোক্তা লাকি চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর তৈজসপত্রের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা নিজেরাই তৈরি করে আসছি আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। কিন্তু বর্তমানে দৈনন্দিন প্রয়োজনে এসব তৈজসপত্রের ব্যবহার হয় না বললেই চলে। বর্তমানে শুধু উৎসব আর বিবাহের সময় কিছু জিনিসের ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। আমি ২০১৬ সালে বিসিক থেকে ৩ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের ঐতিহ্যবাহী এসব তৈজসপত্র বানাতে শুরু করি এবং পাশাপাশি স্থানীয় কারিগরদের মাধ্যমেও তৈরি করে থাকি।’

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, চাক, রাখাইন প্রতিটি জনগোষ্ঠীর তৈজসপত্রে রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যেমন চাকমাদের বাসনপত্রে দেখা যায় সরলতা, মারমাদের মধ্যে রয়েছে কারুকাজের ছোঁয়া, আর ম্রোদের জিনিসপত্রে ফুটে ওঠে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।

পাহাড়ি তৈজসপত্রের কথা বললে প্রথমেই আসে বাঁশের কথা। বাঁশ যেন তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রান্নার পাত্র থেকে শুরু করে ফসল রাখার ঝুঁড়ি, মাছ ধরার ফাঁদ, সবকিছুতেই বাঁশের ব্যবহার চোখে পড়ে। চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী তৈজসপত্রের মধ্যে রয়েছে বাঁশ ও বেতের তৈরি হাল্লোং, ফুর বারেং, দুলো, পিদে হাল্লোং, হুরুম, লুই, সাম্মো, ফুলো আদা, নাদেং, পেরাবা, মেজাং। বাঁশের তৈজসপত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর হালকা ওজন এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব।

Advertisement

স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও অনলাইনে ব্যাপক সাড়া মিলছে বাঁশের তৈরি এসব পণ্যের। তবে কারিগর ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নিয়মিত এসব পণ্য তৈরি করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্যোক্তা লাকি চাকমার জন্য। তিনি বলেন, ‘এখানে এখন প্রশিক্ষিত দক্ষ কারিগরের খুব অভাব। যারা আছেন তারাও বয়সের ভারে ক্লান্ত। আমার সঙ্গে কাজ করেন বর্তমানে পাঁচজন কারিগর। তাদের মধ্যে দুজন বয়স্ক এবং দক্ষ। আমার নকশাযুক্ত বড় কাজগুলো তাদের মাধ্যমে করে থাকি এবং বাকি ৩ জন নকশাবিহীন সাধারণ কাজগুলো করে থাকেন। কারিগর কম কাজের চাহিদা বেশি। তাই চাহিদামতো যোগান দেওয়াটা কঠিন হয়ে যায়। কারিগরদের সরকারিভাবে পৃষ্টপোষকতা করলে এই খাতে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হবে এবং প্রশিক্ষিত নতুন কারিগর গড়ে উঠবে।’

পাহাড়ি তৈজসপত্র তৈরিতে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাঁশ ও বেতের কাজগুলোতে নারীদের দক্ষতা চোখে পড়ার মতো। তারা খুব যত্ন ও ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিটি জিনিস তৈরি করেন। একটি ঝুড়ি বা ডালা তৈরি করতে কখনো কখনো কয়েকদিন সময় লেগে যায়। কিন্তু তাতে তারা কোনো ক্লান্তি অনুভব করেন না, কারণ এটি শুধু তাদের কাজ নয় এটি তাদের ঐতিহ্য, তাদের পরিচয়।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটির পাহাড়ি নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ‘সাবাংগী নারী উদ্যোক্তা সমিতি’র সভানেত্রী ত্রিশিলা চাকমা বলেন, ‘লাকি চাকমার বাঁশ বেতের যে কাজ, সেটা নিঃসন্দেহে প্রকৃতিবান্ধব কিন্তু যথেষ্ঠ চ্যালেঞ্জিং, এই কাজে কর্মী সীমিত তাই তাদের ধরে রাখতে বড় পুঁজির দরকার পড়ে এবং নির্দিষ্ট জাতের বাঁশ লাগে যা দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, শুধু প্যাশনের কারণে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে লেগে থাকা যায়। তবে আমি মনে করি লাকিকে যদি বাঁশের সিজনিং শেখানো যায় এবং ভালো ট্রেইনার দিয়ে বাঁশের তৈরি আরো নান্দনিক পণ্য বানানো শেখানো যায়, তাহলে সে এই পেশায় আরও অনেককে সংযুক্ত করতে পারবে।’

এই নারী উদ্যোক্তা আরও বলেন, ‘একসময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিত্য ব্যবহারের উপকরণ ছিল এসব বাঁশ বেতের তৈজসপত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। বর্তমানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানে এসব তৈজসপত্রের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিয়ে এবং সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব যেমন চাকমাদের ‘বিজু’, মারমাদের ‘সংগ্রাই’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’ এই উৎসবগুলোতে ঐতিহ্যবাহী বাসনপত্রের ব্যবহার অপরিহার্য। বিয়ের গহনা ও পোশাক বহন বিশেষ খাবার পরিবেশন, অতিথি আপ্যায়ন, ধর্মীয় আচার সব ক্ষেত্রেই এই তৈজসপত্রের উপস্থিতি থাকে। এগুলো শুধু ব্যবহারিক নয়, বরং উৎসবের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।’

Advertisement

বর্তমান সময়ে আধুনিকতার প্রভাবে পাহাড়ি তৈজসপত্রের ব্যবহার অনেকটা কমে যাচ্ছে। প্লাস্টিক ও স্টিলের সহজলভ্যতা এবং কম দামের কারণে অনেকেই ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। তবে এর ফলে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে এই ঐতিহ্য। নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না এসব তৈজসপত্র তৈরির কাজে।

রাঙ্গামাটির নারী উন্নয়নকর্মী নুকু চাকমা বলেন, ‘আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী কিছু তৈজসপত্র ছিল আদিকাল থেকে যেগুলো এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে আগামী প্রজন্মের জন্য এগুলো সংরক্ষণ করে রাখা আমাদের কর্তব্য।এরমধ্যে কিছু তৈজসপত্রর আবেদন ভূমিকা অন্যরকম। যেমন ফুর বারেং। আগেরকার দিনে চাকমা আদিবাসীরা এতে কাপড় চোপড় নিয়ে বউ আনতে যেতো। এখন এটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এছাড়াও বাড়িতে ধান এবং চাল সংগ্রহ করে রাখার জন্য ছিল বাঁশের তৈরি বড় গোলা। এখন সেগুলো আর দেখা যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবুও আশার কথা হলো, এখন অনেকেই আবার এই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। পর্যটন শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি তৈজসপত্রের চাহিদাও বাড়ছে। অনেক উদ্যোক্তা এখন এসব ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্রকে আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে মিলিয়ে বাজারজাত করছেন। এতে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি সংরক্ষিত হচ্ছে ঐতিহ্য।’

পাহাড়ি তৈজসপত্রের ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ। প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা, বাজারজাতকরণ এসব ক্ষেত্রে সহায়তা পেলে এই শিল্প আরও বিকশিত হতে পারে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করানো জরুরি।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর তৈজসপত্র শুধু দৈনন্দিন জীবনের উপকরণ নয়, এগুলো তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি বাঁশ ও বেতের তৈরি হাল্লোং, ফুর বারেং, ফুলো আদা সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে একেকটি গল্প। এই গল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। কারণ একটি জাতির ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় তার পরিচয়, তার শিকড়। পাহাড়ের এই ঐতিহ্য ও শিল্প যেন হারিয়ে না যায় এই প্রত্যাশাই সবার।

আরও পড়ুনচৈত্রসংক্রান্তি: মর্মান্তিক ইতিহাস-হারিয়ে যাওয়া বাংলার উৎসবপহেলা বৈশাখ: বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চিরন্তন আত্মপরিচয়

আরমান খান/কেএসকে