চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে ঘুরছে শিশুরা। এতে করে এলাকায় রোগটি আরও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে একাধিক শিশুর জ্বর, সর্দি, কাশি ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা গেছে। অনেকেই প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর মনে করে অবহেলা করায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
Advertisement
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে দুর্বলতা ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। তবে সচেতনতার অভাব ও যথাসময়ে চিকিৎসা না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সরজমিনে শিবগঞ্জ উপজেলার রানিহাটি, ঘোড়াপাখিয়া, মনাকষা, শ্যামপুর ইউনিয়ন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই শিশুরা হামের উপসর্গ নিয়ে ভুগছে। তবে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার তেমন প্রবণতা নেই।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশুদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া জরুরি। সময়মতো টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
Advertisement
‘কয়েকদিন থেকেই হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম। হাম আক্রান্ত কি না পরীক্ষা করিনি। তবে হামের উপসর্গ আছে। তাই গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছে দেখিয়ে ওষুধ খাওয়াচ্ছি।’
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের গোলাপের হাট এলাকার বাসিন্দা আলি হাসানের ৪ বছর বয়সি ছেলে আব্দুর রহমান। গত ৮ দিন ধরে হামের উপসর্গ নিয়ে ভুগছে। কিন্তু তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। হামের ফুসকুড়িসহ নানা উপসর্গ নিয়ে ঘুরছে শিশুটি। নেওয়া হচ্ছে না হাসপাতালে, দেওয়া হচ্ছে স্থানীয় চিকিৎসা।
আরও পড়ুন- হাম উপসর্গে রামেক হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছাড়ালোবান্দরবানে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুহাম যে পর্যায়ে আছে, কমতে সময় লাগবে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
শিশুটির মা রুমেলা বেগম বলেন, কয়েকদিন থেকেই হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম। হাম আক্রান্ত কি না পরীক্ষা করিনি। তবে হামের উপসর্গ আছে। তাই গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছে দেখিয়ে ওষুধ খাওয়াচ্ছি।
Advertisement
ওই গ্রামে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ফাতিমা খাতুন নামে ১০ মাস বয়সি এক শিশু। গ্রামের অধিকাংশ শিশুই হামের উপসর্গে ভুগছে। তবুও শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন না অভিভাবকরা। হামের উপসর্গ নিয়ে খেলে বেড়াচ্ছে শিশুরা।
গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি গ্রামেই হামের প্রকোপ বেড়েছে। তবে হাসপাতালে সঠিকভাবে চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ জেলা সদর হাসপাতালে পা রাখার মতো জায়গা নেই। শয্যা না পেয়ে অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কেউ কেউ মেঝেতেও জায়গা না পেয়ে সিঁড়িতে ঠাঁই নিচ্ছেন। এ কারণে অনেক অভিভাবক হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছেই হামের চিকিৎসা নিচ্ছেন।
‘আশপাশের এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই হাম আক্রান্ত শিশু রয়েছে। এমনকি সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।’
হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার হারুন আলী-সোনিয়া দম্পতির ১০ মাস বয়সি শিশু ফাতিমা খাতুন।
আরও পড়ুন- ঠেলাঠেলিতে ৩ বছর পার, শত মৃত্যুর পরও চালু হয়নি রাজশাহী শিশু হাসপাতালহাম প্রতিরোধে গলিতে গলিতে প্রচারণা চালাতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রীমায়ের কোলেই নিশ্বাসের লড়াই, হাম উপসর্গ নিয়ে ঘণ্টায় এলো ১৩ শিশুরামেকে আইসিইউ সংকটে মার্চেই ২২৯ মৃত্যু, শিশু ৯১
সোনিয়া খাতুন বলেন, আশপাশের এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই হাম আক্রান্ত শিশু রয়েছে। এমনকি সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, হামে উপসর্গ দেখা দিলে স্থানীয় কবিরাজ কিংবা গ্রামে চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে। এতে করে হামের প্রকোপ আরও বাড়ছে।
‘জেলায় হামের রোগী দিন দিন বাড়ছে এবং সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, জেলায় হামের রোগী দিন দিন বাড়ছে এবং সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক সংকট রয়েছে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে প্রতিনিয়ত গড়ে প্রায় ৭০০ জন রোগী ভর্তি থাকছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দিন বলেন, সংক্রমণ রোধে আক্রান্তদের আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং শিশুদের ভিড় এড়িয়ে চলা জরুরি। কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক। গ্রামের বিষয়টি আমরা নজরে রেখেছি। সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়া এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
গত তিন মাসে জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ৭৭৪ জন। এসময় মারা গেছে ৮ শিশু। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৩২ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোট ৮৪ জন রোগী।
এফএ/এএসএম