দিনে তীব্র গরম, সঙ্গে রাতে অন্ধকার। এ দুটোই যেন এখন নিত্যসঙ্গী নওগাঁর রাণীনগর উপজেলাবাসীর। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সময়ই থাকছে না বিদ্যুৎ। টানা লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ।
Advertisement
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই সপ্তাহ ধরে অসহনীয় মাত্রায় লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুতের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তারা। অনেক এলাকায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। আবার কোথাও দিনে-রাতে মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকছে লোডশেডিং। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর রাণীনগর জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই জোনের আওতায় মোট গ্রাহক সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৯টি। এর মধ্যে ৫৭ হাজার ৫৫২টি আবাসিক, ৪ হাজার ২৪৯টি বাণিজ্যিক, ৬৮৫টি গভীর ও অগভীর নলকূপ, ৬০৪টি শিল্প, ৮৬৭টি দাতব্য এবং ৫৩টি নির্মাণ সংযোগ রয়েছে। এসব সংযোগের বিপরীতে দৈনিক গড়ে বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ মিলছে গড়ে মাত্র ১০ মেগাওয়াট, কখনো কখনো এরও কম। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হচ্ছে লোডশেডিং।
রাণীনগরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুতের এই সংকট এখন সর্বত্রই তীব্র আকার ধারণ করেছে। উপজেলার কালীগ্রাম, আবাদপুকুর, কাশিমপুর, রাণীনগর সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। অনেক এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফা লোডশেডিং হচ্ছে। আবার সন্ধ্যার পর শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে গরমে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বা বারান্দায় সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
Advertisement
বিদ্যুতের এই অনিয়মিত সরবরাহের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবাগুলোতেও বিঘ্ন ঘটছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎচালিত পানির পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় দেখা দিয়েছে সেচ সংকট। এতে বিপাকে পড়েছেন বোরো ধান চাষিরা। মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া থেকে শুরু করে ইন্টারনেট ব্যবহার সবকিছুতেই বাড়ছে ভোগান্তি। ভ্যাপসা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা।
স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। বাজারের দোকানপাটে বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত পণ্য। অনেক দোকান নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিদ্যুতের এই দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং সব এলাকাতেই মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে মারাত্মকভাবে।
উপজেলার কসবাপাড়া গ্রামের বিদ্যুৎচালিত গভীর নককূপের অপারেটর আনিছুর খান বলেন, তার নলকূপের আওতায় প্রায় ২৯০ বিঘা জমির বোরো ধান রয়েছে। প্রায় ১৫ দিন ধরে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে জমিতে সময়মতো সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর কয়েক দিন যদি এমন অবস্থা থাকে, তাহলে ধানের মারাত্মক ক্ষতি হবে। কৃষকরা খুবই উদ্বিগ্ন।
শুধু কৃষিই নয়। ক্ষতির মুখে পড়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। আবাদপুকুর বাজারের বিসমিল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী হোসাইন আহমাদ বলেন, প্রতি এক ঘণ্টা পর পর এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। কখনো তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ঠিকমতো কাজ করা যাচ্ছে না। সময়মতো গ্রাহকদের মালামাল দিতে পারছি না। শ্রমিকদেরও বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।
Advertisement
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম ও সংকটের কারণে এলাকায় ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের ঘাটতিতে পর্যাপ্ত চার্জ দিতে না পেরে এসব ভ্যানের চালকরাও বিপাকে।
কালীগ্রাম এলাকার ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চালক ফেরদৌস হোসেন বলেন, পুরো চার্জ দিতে না পারায় রাস্তায় ভ্যান নামাতে পারছি না। আবার ব্যাটারিও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। আয়-রোজগার একেবারেই কমে গেছে।
নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর রাণীনগর জোনাল অফিসের এজিএম তাহসিন ইলিয়াস বলেন, আমাদের আওতায় ৬৪ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছেন। তাদের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে গড়ে মাত্র ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। কখনো এর চেয়েও কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ঢাকা থেকে স্ক্যাডা অপারেশনের কারণেও অতিরিক্ত লোডশেডিং যুক্ত হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
আরমান হোসেন রুমন/এফএ/এএসএম