দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ একটি অভ্যাস ‘পানি পান’। কিন্তু এই সহজ কাজটি নিয়েই রয়েছে নানা মত, বিশ্বাস আর বিতর্ক। বিশেষ করে দাঁড়িয়ে পানি পান করা নিয়ে আমাদের সমাজে বহুদিন ধরেই একটি ধারণা প্রচলিত, এভাবে পানি খাওয়া নাকি শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
Advertisement
অনেকে বলেন, এতে হজমে সমস্যা হয়, কেউ বলেন কিডনির ক্ষতি হতে পারে, আবার কেউ এটাকে সম্পূর্ণ মিথ বলে উড়িয়ে দেন। তাহলে সত্যিটা কী? দাঁড়িয়ে পানি পান করা কি সত্যিই ক্ষতিকর, নাকি এটি শুধুই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা?
কোথা থেকে এলো ধারণাটি?দাঁড়িয়ে পানি পান না করার পরামর্শ অনেকেই পেয়েছেন পরিবার থেকে, বিশেষ করে বড়দের কাছ থেকে। এর পেছনে মূলত দুটি উৎস কাজ করে, প্রাচীন স্বাস্থ্যচর্চা (যেমন আয়ুর্বেদ) এবং ধর্মীয় কিছু দৃষ্টিভঙ্গি। আয়ুর্বেদে বলা হয়, বসে পানি পান করলে শরীর তা ধীরে ধীরে গ্রহণ করতে পারে, যা হজম প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে। অন্যদিকে দাঁড়িয়ে পানি পান করলে তা দ্রুত নিচে নেমে গিয়ে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, এমনটাই বিশ্বাস করা হয়।
আরও পড়ুন: তাড়াহুড়ো করে খাবার খাওয়ার অভ্যাস কি আপনারও? গর্ভাবস্থায় ঠান্ডা পানি পান, ভুল করছেন না তো? আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কী বলা হয়?আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, দাঁড়িয়ে বা বসে পানি পান করার মধ্যে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই, যা সরাসরি বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। পানি যখন আমরা পান করি, তা মুখ থেকে খাদ্যনালী হয়ে পাকস্থলীতে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়া মূলত মাংসপেশির সংকোচন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আপনি দাঁড়িয়ে থাকুন বা বসে থাকুন এই প্রক্রিয়াটি একইভাবে কাজ করে। ফলে দাঁড়িয়ে পানি পান করলে পানি ‘ভুল পথে’ চলে যায় বা শরীরে সমস্যা সৃষ্টি করে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
Advertisement
যদিও দাঁড়িয়ে পানি পান করা সরাসরি ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু অভ্যাসগত বিষয় আছে, যা সমস্যার কারণ হতে পারে।
দ্রুত পানি পান করার প্রবণতা: দাঁড়িয়ে পানি পান করলে আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে পানি খাই। এতে একসাথে অনেক পানি ঢুকে যেতে পারে, যা হজমে অস্বস্তি বা পেট ফাঁপা অনুভূতির কারণ হতে পারে। শরীরের প্রতি অমনোযোগী হওয়া: বসে পানি পান করলে আমরা একটু ধীর হই, মনোযোগ দিয়ে পানি পান করি। এতে শরীরের তৃষ্ণা ও প্রয়োজন বোঝা সহজ হয়। দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে হাঁটতে পানি পান করলে সেই সচেতনতা কমে যায়। অ্যাসিডিটি বা অস্বস্তি: কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দ্রুত পানি পান করলে বা ভুল ভঙ্গিতে পান করলে অ্যাসিডিটি বা বুক জ্বালাপোড়া বাড়তে পারে। যদিও এটি দাঁড়িয়ে পান করার কারণে সরাসরি হয় না, বরং পান করার গতি ও অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিডনি বা জয়েন্টের ক্ষতি, মিথ না সত্য?অনেকেই দাবি করেন, দাঁড়িয়ে পানি পান করলে কিডনি ঠিকভাবে পানি ছেঁকে নিতে পারে না বা জয়েন্টে পানি জমে যায়। তবে এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিডনি তার কাজ করে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে, পানি পান করার ভঙ্গি তার ওপর প্রভাব ফেলে না। একইভাবে জয়েন্টে পানি জমার ধারণাটিও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
তাহলে কীভাবে পানি পান করা উচিত?সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কীভাবে আপনি পানি পান করছেন, সেটি নয়; বরং কতটা নিয়মিত এবং সচেতনভাবে পান করছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবুও কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে উপকার পেতে পারেন। যেমন-
ধীরে ধীরে, ছোট চুমুকে পানি পান করুন খুব বেশি তাড়াহুড়ো করে পানি খাবেন না শরীরের তৃষ্ণার সংকেতের দিকে মনোযোগ দিন সম্ভব হলে বসে আরাম করে পানি পান করুন, এতে মনোযোগ বাড়ে বাস্তবতা বনাম অভ্যাসদাঁড়িয়ে পানি পান করা নিজে থেকে কোনো বড় ক্ষতির কারণ নয়, এটা পরিষ্কার। তবে বসে ধীরে ধীরে পানি পান করার অভ্যাস শরীরের জন্য আরামদায়ক এবং মানসিকভাবে বেশি সচেতন করে তোলে। তাই এটি একটি ভালো অভ্যাস হতে পারে, যদিও বাধ্যতামূলক নয়।
Advertisement
আমাদের জীবনে অনেক অভ্যাস আছে, যেগুলো আমরা প্রশ্ন না করেই মেনে চলি। দাঁড়িয়ে পানি পান করা নিয়ে প্রচলিত ধারণাটিও অনেকটা সেরকমই। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ক্ষতিকর নয়, তবে সচেতনভাবে পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপনি দাঁড়িয়ে পান করুন বা বসে সবচেয়ে জরুরি হলো, আপনার শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করা। কারণ সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি এখানেই।
তথ্যসূত্র: অনলি মাই হেলথ, হেলথ শ্যুট
জেএস/