ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি সিরামিক কারখানায় টানা সাত বছর কাজ করেছেন প্রদীপ কুমার। প্রতিদিন সকাল ৯টায় কাজে যোগ দিয়ে তিনি মাটি, কোয়ার্টজ ও বালু চুল্লিতে ঢোকাতেন এবং সারাদিন তাপ ও ধুলার মধ্যে কাজ করতেন।
Advertisement
কখনো কাঁচামাটি মেশিনে দিতেন, কখনো আধা-প্রস্তুত পণ্য আগুনে পোড়ানোর জন্য সরিয়ে নিতেন প্রদীপ। কাজ ছিল একঘেয়ে ও কষ্টসাধ্য। উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে কাজ করলেও গ্লাভস বা মাস্কের মতো কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হতো না।
তিনি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, গ্রীষ্মকালে কাজ করা খুব কঠিন হয়ে যেতো, কারণ তখন তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকতো।
কিন্তু ১৫ মার্চ তিনি হঠাৎই চাকরি হারান। তার বা কারখানার কোনো ভুলের কারণে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ শুরু হয় ও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে তার জীবনে।
Advertisement
যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই গ্যাস সংকটে তার কর্মস্থল কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। মোরবি শহরের এই কারখানাসহ পুরো সিরামিক শিল্পই প্রোপেন ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
ভারতের সিরামিক শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মোরবি শহরে ৪ লাখেরও বেশি মানুষ কাজ করেন। এদের অর্ধেকের বেশি শ্রমিকই উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মতো দরিদ্র অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসী।
চাকরি হারানোর পাঁচ দিনের মাথায় ২৯ বছর বয়সী প্রদীপ কুমার তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে উত্তর প্রদেশের হারদোই জেলায় ফিরে যান। বলেন, যতদিন অন্য শ্রমিকরা ফিরে না আসছেন, ততদিন আমরা এখানেই থাকবো। আমরা আর করোনা মহামারির সময়ের মতো কষ্ট পেতে চাই না। তিনি ২০২০-২১ সালে লকডাউনের সময় লাখো শ্রমিকের পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার কথা স্মরণ করেন।
৬০০ কারখানার মধ্যে ৪৫০ বন্ধ
Advertisement
মোরবিতে ৬০০টির বেশি কোম্পানি ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ সিরামিক পণ্য- টাইলস, টয়লেট, বাথটাব ও বেসিন তৈরি করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি ঘিরে অচলাবস্থার কারণে অন্তত ৪৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে যুদ্ধ চলছেই। যুক্তরাষ্ট্র রোববার (১৯ এপ্রিল) একটি ইরানি কার্গো জাহাজ জব্দ করেছে, যদিও একই সঙ্গে তারা পাকিস্তানে নতুন করে আলোচনার আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে জাহাজ জব্দের পর ইরান আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এক মাসের সংঘর্ষের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বুধবার শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় ইরান হরমুজ প্রণালীতে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়ে তেলের দাম বেড়েছে।
মোরবির তৃতীয় প্রজন্মের ব্যবসায়ী সিদ্ধার্থ বোপালিয়া বলেন, সব কারখানাই চুল্লি চালাতে প্রোপেন ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। প্রোপেন তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানা এটি ব্যবহার করে।
মোরবি সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোজ আরভাদিয়া জানান, তারা ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রেখেছিলেন, আশা ছিল ততদিনে সংকট কেটে যাবে। কিন্তু এখনো মাত্র ১০০টির মতো কারখানা চালু হয়েছে, তাও বেশিরভাগ উৎপাদন শুরু করেনি। অন্তত আরও ১৫ দিন একই অবস্থা থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
এই বন্ধের কারণে প্রায় ২ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার এক-চতুর্থাংশের বেশি নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
ভারতের সিরামিক শিল্পের বাজারমূল্য প্রায় ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ পণ্য মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপে রপ্তানি হয়, যার মূল্য ১.৫ বিলিয়ন বা ১৫০ কোটি ডলার। কিন্তু গত এক মাসের উৎপাদন সংকটের কারণে রপ্তানি বিলম্বিত বা বন্ধ হয়ে গেছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে।
গ্যাসের দাম ও কারখানা চালুর অনিশ্চয়তা
প্রোপেননির্ভর কারখানাগুলো এখনো বন্ধ রয়েছে। যদিও প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তবুও নতুন সংযোগের দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই এতে যেতে পারছেন না। বর্তমানে নতুন সংযোগের জন্য প্রতি কেজি গ্যাসের দাম ৯৩ রুপি, যেখানে পুরনো ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন প্রায় ৭০ রুপিতে।
ওয়াশবেসিন প্রস্তুতকারক খুশিরাম সাপারিয়া বলেন, কারখানা খুলবো কি না, তা ঠিক করার আগে আমি এই মাসটা অপেক্ষা করবো। কারণ শত শত শ্রমিককে আবার ডেকে আনতে হবে।
‘মোরবি রোগ’ নিয়ে বাড়ি ফেরা
গত মাসে মোরবি ছাড়াদের মধ্যে ২৭ বছর বয়সী অঙ্কুর সিংও আছেন। তিনি বলেন, চাকরি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি ‘মোরবি রোগ’ নিয়েও ফিরেছি- সিলিকোসিস।
তিনি জানান, আগে জ্বর ও কাশি হলেও গুরুত্ব দেননি। কিন্তু পাটনার কাছে নিজের বাড়িতে ফিরে পরীক্ষার পর জানতে পারেন তিনি সিলিকোসিসে আক্রান্ত।
সিলিকোসিস একটি নিরাময়যোগ্য নয় এমন ফুসফুসের রোগ, যা সিলিকা ধুলা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণের ফলে হয়। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম পেশাগত রোগগুলোর একটি ও প্রতিবছর হাজারো মানুষের মৃত্যু ঘটায়।
গুজরাটের শ্রম অধিকারকর্মী চিরাগ চাভদা বলেন, মোরবিতে এই রোগ ব্যাপক, কারণ শ্রমিকরা নিয়মিত সিলিকা ধুলার সংস্পর্শে থাকেন। যারা সরাসরি চুল্লিতে কাজ করেন না, তারাও খারাপ বায়ু চলাচলের কারণে এই ধুলা শ্বাসে নিচ্ছেন।
চাভদার অভিযোগ, বেশিরভাগ কারখানাই শ্রমিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সরকারি নিয়ম মানে না।
৪০ বছর বয়সী হরিশ জালা, যিনি দুই বছর আগে সিলিকোসিসে আক্রান্ত হন, বলেন তিনি কোনো সহায়তা পাননি। তার বাবাকে কারখানায় গেলে অপমান ও হুমকিও দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রতিটি কারখানায় প্রতি বছর অন্তত একজন শ্রমিক সিলিকোসিসে মারা যায়।
হরিশ জালা আরও জানান, অনেক কোম্পানি শ্রমিকদের কোনো নিয়োগপত্র বা বেতন স্লিপ দেয় না, যাতে তারা ভবিষ্যতে শ্রম অধিকার দাবি করতে না পারে। গুজরাটের চিরাগ চাভদা বলেন, এর ফলে শ্রমিকরা সামাজিক নিরাপত্তা থেকেও বঞ্চিত হন ও নিয়োগের কোনো প্রমাণ না থাকায় আইনি সুরক্ষাও পান না।
না ফিরেও টিকে থাকার লড়াই
মোরবিতে এমন শ্রমিকও আছেন, যারা এখনো ফিরে যাননি। তাদের একজন ৫৬ বছর বয়সী সুশমা দেবী। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন এখানে আছি, কারণ বাড়ি ফেরার খরচ বাঁচাতে চাই। অন্তত এখানে খাবারের ব্যবস্থা আছে।
তিনি প্রতিদিন জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে রান্না করেন ও আশা করছেন দ্রুত কারখানা চালু হবে। তার স্বামী দেবেন্দর ও ছেলে অঙ্কিত একটি ছোট কক্ষে থাকেন, যা কোম্পানি দিয়েছে। ১০টি পরিবারের জন্য একটি শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়।
অন্যদিকে, প্রদীপ কুমারের সঞ্চয় ফুরিয়ে আসছে। তিনি এখন হারদোইতে দিনমজুর হিসেবে কাজ খুঁজছেন ও ঋণের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা করছেন। তিনি বলেন, শুরুর দিকে সঞ্চয় থেকে খরচ চালিয়েছি। কিন্তু বাড়ি মেরামতের জন্য ২০ হাজার রুপি ধার নিতে হয়েছে। কখন বা কীভাবে শোধ করব, জানি না।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ