২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন রাফিনহা ব্রাজিল ছেড়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তিনি ছিলেন নেহাতই এক অচেনা কিশোর। এক দশক পর ২৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে পা রাখতে যাচ্ছেন বর্তমান সময়ের অন্যতম ভয়ংকর এবং বিশ্বসেরা একজন স্ট্রাইকার হিসেবে। দীর্ঘ অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়তা, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা এবং নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের এক অনন্য গল্পের নাম রাফিনহা।
Advertisement
রিও গ্রান্দে দো সুলের পোর্তো অ্যালেগ্রেতে জন্ম নেওয়া রাফিনহা এমন এক অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন, যেখান থেকে বিশ্বকাপজয়ী তারকা যেমন দুঙ্গা, ক্লদিও তাফারেল, ব্রাঙ্কো ও রোনালদিহোর মত ফুটবলাররা উঠে এসেছেন।
তবে অন্যদের মতো রাফিনহার পথটা মসৃণ ছিল না। সহজে নিজের জায়গাটা তৈরি করতে পারেননি। শারীরিক গড়ন ছোট হওয়ায় শুরুর দিকে কোচ ও ক্লাব কর্মকর্তাদের সংশয়ের মুখে পড়তে হয় তাকে। এমনকি একসময় ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাল ছাড়েননি। পর্তুগালের ভিতোরিয়া দে গুইমারায়েস ও স্পোর্টিং লিসবন, ফ্রান্সের রেনে, ইংল্যান্ডের লিডস ইউনাইটেড এবং স্পেনের বার্সেলোনার হয়ে খেলে তিনি আজকের মহাতারকায় পরিণত হয়েছেন।
মাঠে রাফিনহার বহুমুখি প্রতিভা বা ভার্সাটিলিটি অসাধারণ। বার্সেলোনার হয়ে এক মৌসুমে তাকে দুই উইং ও প্লেমেকার- তিন ভূমিকাতেই খেলানো হয়। সব অবস্থানেই তিনি গোল করে দলকে সাফল্য এনে দিয়েছেন। ২০২৩ ও ২০২৫ সালে বার্সার লা লিগা জয়ে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছেন এবং ২০২৫-২৬ মৌসুমেও তার দল শিরোপার খুব কাছে। তার ঝুলিতে আরও আছে ২০২৪-২৫ কোপা দেল রে, তিনটি সুপারকোপা ডি এসপানা শিরোপা এবং ২০১৯ সালে স্পোর্টিংয়ের হয়ে ডাবল শিরোপা।
Advertisement
তবে তার সেরা মৌসুম ছিল ২০২৪-২৫, যখন তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং প্রথম ব্রাজিলিয়ান হিসেবে লা লিগার ‘প্লেয়ার অফ দ্য সিজন’ নির্বাচিত হন। ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’ পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও ছিল তার নাম।
রাফিনহাকে নিয়ে প্রশংসাহান্সি ফ্লিক (বার্সেলোনা কোচ): ‘আমি তার মতো খেলোয়াড় আগে কখনো পাইনি। বল পায়ে বা বল ছাড়া- দুই অবস্থাতেই সে অবিশ্বাস্য ডাইনামিক। বার্সেলোনায় আমি যে ধরণের ফুটবল দেখতে চাই, রাফিনহা ঠিক তারই উদাহরণ।’
কার্লো আনচেলত্তি (ব্রাজিল কোচ): ‘এই মুহূর্তে সে বিশ্বের অন্যতম সেরা। তার উপস্থিতি আমাদের আক্রমণভাগে অনেক সুযোগ তৈরি করে। সে আমাদের জন্য সত্যিকারের গেম চেঞ্জার।’
ভিনিসিয়াস জুনিয়র (ব্রাজিল সতীর্থ): ‘তার খেলার মান দারুণ। তার পাশে খেললে আমার কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।’
Advertisement
মার্কুইনহোস (ব্রাজিল অধিনায়ক): ‘রাফিনহা এক বিস্ময়। জাতীয় দলে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই তার পরিশ্রম ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা দেখে আসছি। সে সবসময় বড় দায়িত্ব নিতে জানে।’
লামিন ইয়ামাল (বার্সেলোনা সতীর্থ): ‘সে আমার কাছে অনেক বড় কিছু। প্রথম দলে আসার পর থেকে সে আমাকে অনেক সাহায্য করছে এবং সে তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য বড় উদাহরণ।’
রাফিনহা সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য১. ব্রাজিলের হয়ে ক্লাব ফুটবল খেলেননি: রাফিনহা ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগে কোনো পেশাদার ম্যাচ খেলেননি। তিনি আভাই ক্লাবের যুব দলে ছিলেন, এরপর ২০১৬ সালে মাত্র ৬ লাখ ইউরোতে পর্তুগালে পাড়ি জমান।
২. রোনালদিনহোই আদর্শ: রাফিনহার শহর এবং প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনা- সবখানেই রোনালদিনহোর পদচিহ্ন রয়েছে। এমনকি রোনালদিনহোর সাথে তার পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে।
৩. সঙ্গীতের সাথে যোগসূত্র: রাফিনহার বাবা রাফায়েল (মানিনহো) ছিলেন একজন সঙ্গীতশিল্পী। তিনি ‘সাম্বা ত্রি’ ব্যান্ডের হয়ে বাজাতেন। রোনালদিনহো যখন গ্রেমিওতে খেলা শুরু করেন, তখন থেকেই মানিনহোর সাথে তার বন্ধুত্ব। রাফিনহা নিজেও গান বাজনায় পারদর্শী, বিশেষ করে ‘তান-তান’ (এক ধরণের ড্রাম) বাজাতে পছন্দ করেন।
রাফিনহার পরিসংখ্যানচ্যাম্পিয়নস লিগ রেকর্ড: ২০২৪-২৫ চ্যাম্পিয়নস লিগে রাফিনহা মোট ২২টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন (১৩টি গোল ও ৯টি অ্যাসিস্ট), যা ২০১৩-১৪ মৌসুমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর করা রেকর্ডের সমান।
বার্সার নির্ভরতা: চলতি মৌসুমে রাফিনহা যে ৩১টি ম্যাচে খেলেছেন, তার মধ্যে বার্সা হেরেছে মাত্র ২টিতে। অথচ তাকে ছাড়া ১৭টি ম্যাচের মধ্যে তারা ৬টি হেরেছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে নিউক্যাসলের বিপক্ষে ৭-২ গোলের ঐতিহাসিক জয়ে তিনি ২টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট করেন।
লিডস ও রেনে: বার্সায় আসার আগে তিনি লিডস ইউনাইটেডের (২০২১-২২) হয়ে ১১ গোল করে শীর্ষ গোলদাতা হয়েছিলেন।
বিশ্বকাপে রাফিনহা২০২৬ বিশ্বকাপ হবে তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে কাতারে সার্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় তার। তখন মাত্র ১২ ম্যাচ খেলেই জাতীয় দলে জায়গা পাকাপোক্ত করেছিলেন তিনি।
যদিও ওই আসরে তিনি তুলনামূলক আত্মত্যাগী ভূমিকায় খেলেছিলেন, তবুও সব ম্যাচে ছিলেন প্রথম একাদশে- বিশেষ করে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের হতাশাজনক বিদায় পর্যন্ত।
২০২৬ বিশ্বকাপের স্বপ্ন২০২৬ বিশ্বকাপে রাফিনহাকে ঘিরে ব্রাজিলের স্বপ্ন অনেক বড়। গত বিশ্বকাপের পর তার ক্যারিয়ার আরও উর্ধ্বমুখী হয়েছে। বর্তমানে তিনি বার্সেলোনার তৃতীয় অধিনায়ক। কার্লো আনচেলত্তি অধীর আগ্রহে রাফিনহার ইনজুরি থেকে সেরে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছেন। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে এই বিস্ফোরক উইঙ্গারই পারবেন ব্রাজিলকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বাদ পাইয়ে দিতে।
আইএইচএস/