স্বাস্থ্য

ফিরছে পল্লি চিকিৎসক, এগোবে না পেছাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা?

গ্রামাঞ্চলে জ্বর, সর্দি কিংবা ছোটখাটো কাটাছেঁড়ার প্রাথমিক চিকিৎসায় ‘পল্লি চিকিৎসক’ দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় নাম। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ার আগে গ্রামীণ মানুষের কাছে তারাই ছিলেন প্রধান ভরসা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সহজলভ্যতা এবং সময় বাঁচানোর কারণে এখনো অনেকেই তাদের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট হন।

Advertisement

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সহজলভ্য পল্লি চিকিৎসকের ঘোরবিরোধী। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে পল্লি চিকিৎসকরা সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন, এমনকি সাধারণ জ্বর সর্দিতেও অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ভালো করে ফেলেন ঠিকই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বিপাকে পড়ে রোগী। রোগ নির্ণয় ছাড়াই ভুল চিকিৎসায় অসংখ্য পঙ্গু কিংবা মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ না করা এবং পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার— এসব কারণে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ফলে আগে সহজে নিরাময়যোগ্য সংক্রমণও এখন মারাত্মক হয়ে উঠছে।

আইসিডিডিআর, বি-এর তথ্যমতে, শহরের সাধারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ফার্স্ট-লাইন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর থাকছে না, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।

Advertisement

অলিগলিতে স্বল্পমেয়াদি কোর্স করে ‘ডাক্তার’ পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনা বাড়তে থাকায় গত বছরের ১২ মার্চ হাইকোর্ট রায় দেন— এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন না। চার বছর মেয়াদি সমমানের কোর্স করা হোমিও, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানালেও তা বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং সরকার এখন পল্লি চিকিৎসাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পল্লি চিকিৎসকদের ফিরিয়ে আনার পথে হাঁটছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গ্রামীণ চিকিৎসা পেশাজীবীদের উন্নয়নে সরকার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যেখানে ‘পল্লি ডাক্তার’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, এসব পল্লি ডাক্তার স্থানীয় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও পরিবার পরিকল্পনা (এলএমএএফ) কোর্সের আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবেন। বর্তমানে এলএমএএফ কোর্স স্থগিত থাকলেও নতুনভাবে কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার (সিএইচডব্লিউ) সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা হয়েছে, যা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।আরও পড়ুনহামের টিকা না দিয়ে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে বিগত সরকার: প্রধানমন্ত্রীফোড়া অপারেশনে ‘রক্তক্ষরণ’ দেখে পালালেন চিকিৎসক, পরে রোগীর মৃত্যুবিএমডিসি সনদ জট কাটিয়ে ৪৮তম বিসিএসে নিয়োগের পথে ১৯০ চিকিৎসক

সরকারের প্রস্তাবিত পল্লি চিকিৎসক প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর উদ্যোগকে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন উল্লেখ করে এর বিরোধিতা জানিয়েছে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।

Advertisement

এক যৌথ বিবৃতিতে ১১ এপ্রিল সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ এবং মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল এ অবস্থান তুলে ধরেন এবং উদ্যোগটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

ড্যাবের শীর্ষ নেতারা বলেন, এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন না— এ বিষয়ে গত বছরের ১২ মার্চ হাইকোর্টের রায় রয়েছে। অতীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পল্লি চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

তাদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসার কারণে বহু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কোর্স পুনরায় চালু হলে চিকিৎসা পেশা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

ড্যাব নেতারা বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক মানহীন মেডিকেল কলেজের মানোন্নয়ন ও কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে পল্লি চিকিৎসক প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এবং এটি স্বাস্থ্যখাতকে পিছিয়ে দিতে পারে।

তাদের মতে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য ইতোমধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তাই আলাদাভাবে পল্লি চিকিৎসক প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রয়োজন নেই।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. এসএএ শাফী বলেন, পল্লি চিকিৎসকরা মূলত লেমেন ওয়ার্কের মতো কাজ করেন, যাদের ডাক্তারি শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ১৫ দিন বা এক দুই মাস ট্রেনিং দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়।আরও পড়ুনযন্ত্র সংকটে ধুঁকছে বিশেষায়িত ইউনিট, সেবা পাচ্ছে না নবজাতকঢামেক থেকে অন্য ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, দালাল আটকভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ, হাসপাতালে উত্তেজনা

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা যে পর্যায়ে গেছে, আমরা যেখানে সারাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সে ভুগছি এই পল্লি চিকিৎসকদের এলোমেলো চিকিৎসার কারণে। অন্ধকারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পল্লি চিকিৎসক কী সেন্সে বলা হচ্ছে জানি না। তবে আগের পদ্ধতির পল্লি চিকিৎসক ফিরে আনা উচিত হবে না। বলছিলেন ডা. এসএএ শাফী।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের উপদেষ্টা,  জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, পল্লি চিকিৎসকদের পুনরায় স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করার উদ্যোগটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বা নেতিবাচক— দুই ধরনের প্রভাবই ফেলতে পারে। বিষয়টি মূলত নির্ভর করবে তাদের ভূমিকা নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ এবং সঠিক তদারকির ওপর। আমি মনে করি, যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে তাদের কাজে লাগানো গেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তিনি বলেন, দেশে এরই মধ্যে হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মাঠকর্মী কাজ করছেন। অতীতে পুষ্টিকর্মী ও ট্র্যাডিশনাল বার্থ অ্যাটেনডেন্টরাও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাই পল্লি চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হলে তাদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে বিদ্যমান স্বাস্থ্য কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করাতে হবে। প্রয়োজনে তাদের মাল্টিপারপাস ভলান্টিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, মাঠপর্যায়ে এখনো বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে। অনেক পদ শূন্য থাকায় এবং বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় আরও জনবল দরকার। বিশেষ করে মহামারি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়া, জ্বরাক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এসব কর্মীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি সতর্ক করে বলেন, পল্লি চিকিৎসকরা যদি আবার স্বাধীনভাবে প্রেসক্রিপশন দেওয়া বা ফার্মেসি পরিচালনা শুরু করেন, তাহলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের কাজের পরিধি সীমিত রেখে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এবং জটিল রোগীদের দ্রুত চিকিৎসকের কাছে রেফার নিশ্চিত করা জরুরি।

ডা. মুশতাক বলেন, পল্লি চিকিৎসকদের অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে হবে। সঠিক প্রশিক্ষণ, কার্যকর তদারকি এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলে তারা দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সহায়ক শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

এসইউজে/এমএএইচ/এমএমএআর