দেশজুড়ে

‘বাপুরে, ১০০ মণ ধান পেতাম এখন এক মণও পামু না’

‘বাপুরে, দেড় একর জমিতে ১০০ মণ ধান পেতাম। এখন ১ মণও পামু না। একেবারে খুন কইরা ফালাইছে। এবার খামু কী? আর সামনে আবাদ কী দিয়ে করমু? চিন্তায় মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এই খারাপ অবস্থা ভেজাল ধান বীজের কারণে। আর কৃষি অফিসার এদিকে আসে না। পাকা রাস্তা থেকেই ঘুরে চলে যায়।’

Advertisement

ক্ষোভ নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নের চতল বন্ধভাটপাড় গ্রামের কৃষক আব্দুল আযাদ।

একই অবস্থা উপজেলার প্রায় তিন শতাধিক কৃষকের। ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ও নলকুড়াসহ আশেপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের কৃষকরা ব্রী-৯৬ মোড়কে ভেজাল বীজধান আবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, চলতি বোরো মৌসুমে ঝিনাইগাতী বাজারের মেসার্স নুরুল এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সাব্বির বীজ ভাণ্ডার থেকে মধুপুরের মিরন সিড কোম্পানির নামে উচ্চ ফলনশীল ব্রী-৯৬ বীজধানের মোড়কে তাদের কাছে ভেজাল বীজ বিক্রি করা হয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনের কাছে প্রতিকার চেয়ে কৃষকেরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

Advertisement

ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের দিঘির পাড়, আহাম্মদ নগর, চতল, বন্ধভাটপাড়, রামনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সবুজ ধানের মাঠে ব্রী-৯৬ বীজের চাষকৃত ধান গাছে শীষ আসার সময় হলেও শীষ না এসে অনেক খেতের ফসল নষ্ট হতে শুরু করেছে। আবার এ জাতের যেসব জমিতে শীষ এসেছে তারও আবার পাতা, কাণ্ড পচে মরে গেছে। সেসব জমিতে ধানতো নেই-ই, খড়ও হবে না। ঋণ নিয়ে আবাদ করে বিপাকে পড়েছেন অনেক কৃষক।

এমতাবস্থায় চোখে অন্ধকার দেখলেও কৃষি বিভাগকে পাশে না পাওয়ার অভিযোগ কৃষকদের। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, কৃষি অফিসার পাকা সড়ক পর্যন্ত এসেই ঘুরে চলে যান৷ এদিকে কাদামাটি থাকায় তিনি আসেন না। তাই অনেক কীটনাশক দোকান থেকে এনে প্রয়োগ করেছি, তবুও কোনো সাড়া পাইনি।

তারা আরও বলেন, একর প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। এখন সরকারি সহযোগিতা ছাড়া সংসারের, পরিবারের ভাত জোগাড় করা মুশকিল হয়ে যাবে।

ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া মোড়ের আব্দুল হক বলেন, আমার ১৪ কাঠা জমিতে ৯৬ নম্বর ধান লাগিয়েছিলাম। এখনতো সর্বনাশ। খেতে গেলে মাথা চক্কর দেয়।

Advertisement

রামনগরের সোহেল রানা বলেন, আমার ভাই ও চাচা ৯৬ জাতের ধান লাগিয়েছিল। পুরো জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ১ মণ ধানও আসবে না। তারা ঋণ করে আবাদ করছিলেন, এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন। তাই সরকারের সহযোগিতা জরুরি।

বন্ধভাটপাড়ের ৬০ বছর বয়সি সুরুজ জামান বলেন, আমি দোকানে গিয়ে বলেছিলাম এটা কেমন ধানের বীজ দিয়েছ। তারা বলে আগামী ১৫ দিন পরে নতুন করে ধানের শীষ বের হবে। আবাদ করতে করতে জীবন পার করে দিলাম, আমারে মূলা বুঝ দেয়। আমি সঠিক বিচার চাই।

দিঘিরপাড় গ্রামের কৃষক আরশাদুল হক বলেন, ব্রী-৯৬ বীজ কিনে ৭৫ শতক জমিতে আবাদ করেছি। এতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন ধান হওয়ার সময় হলেও উল্টো ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ স্বীকার করে মেসার্স নুরল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. নুরল আমিন বলেন, আমি ৯০’র দশক থেকে বীজের ব্যবসা করছি। দীর্ঘদিনে এমন একটা অভিযোগও আসেনি, এবারই প্রথম। ৯৬ জাতের বীজটা টাঙ্গাইলের মধুপুরের মিরন সীড কোম্পানি আমাকে দিয়েছি। এমন ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাদের অভিযোগ করেছি। আমি জমিতেও গিয়েছি। আর যারা আমার কাছ থেকে বীজ নিয়েছে তারা সবাই আমার পরিচিত এবং কোনো না কোনোভাবে আত্মীয়।

তবে সাব্বির বীজ ভাণ্ডারে গিয়ে মালিক মো. শহিদুল্লাহকে পাওয়া যায়নি।

জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক সাখওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ঝিনাইগাতীতে হাইবিড ব্রী-৯৬ বীজধান নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগও এসেছে। মাঠ পর্যায়ে তদন্ত চলছে। পাশাপাশি বীজ উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দেখা হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

মো. নাঈম ইসলাম/এফএ/এএসএম