সাহিত্য

মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের পাঁচটি কবিতা

ভাঙা টবে চূর্ণ নিঃশ্বাস

হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে নষ্ট ঘড়িতে বেলা-অবেলারভালো-মন্দ, জন্ম চূর্ণ করে সেই কবে থেকে ধ্বংসেরঅপেক্ষায় বুড়ো প্রাচীন পৃথিবী।স্মৃতির হাওয়ায় শ্যাওলা জমে, আকাশে জল ছিটিয়েপ্রতিদিন, প্রতিরাতে আরও করুণ চোখে তাকায়জলাশয়, কানামাছি।হাত থেকে পড়ে গেলে টব,মাটির নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মৃত মানুষেরকষ্ট-স্মৃতি এক করে গজিয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ শিকড়;হাত থেকে পড়ে গেলে টব,প্রতিবার ভ্রূণ-পৃথিবী চোখের কেতু সরাতে সরাতেদু’হাত সরিয়ে নিজের বুকে মৃত ভূমিষ্ঠ হয়;হাত থেকে পড়ে গেলে টব,স্মৃতির হাওয়ায় সব ভেঙে-চুরেঅন্ধকার বোতলে চূর্ণ হয়;ভুল হয়, দুঃখ হয়—রাতে ঘুমানোর আগে আয়নায় দেখি না; একটা কিছুমনে করতে গিয়ে যদি আরও বেশি মন খারাপ হয়?

Advertisement

****

আমার সব বোঝাপড়া পৃথিবীর সাথে

আমার সব বোঝাপড়া পৃথিবীর সাথে। আমার সব বোঝাপড়াপোড়া পৃথিবীর কালো বুক ঝাপটে ধরে। যে বুকের নর্দমা জলেপ্রতিদিন ডোবে—গতকাল, সত্য, সততা। এখানে কুয়াশা, কুকুর,কাঁদামাটি—কোনো কিছুই চোখ এড়িয়ে যায় না। মিথ্যা চুরিরঅপরাধে যে লোকটিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে,আমার বোঝাপড়া তার সাথে। কনডেম সেলে যে নিরাপরাধমানুষগুলো দিন-রাত অপেক্ষায় থাকে স্বজনের,আমার বোঝাপড়া তাদের সাথে।

ক্ষিপ্ত মেঘের ফাঁকে যতবার উঁকি দেয় আকাশ—সূর্যটাততবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। সব অভিযোগ অস্বীকার করে,জমিনের আইল ধরে শ্রমের ঘাম দিয়ে আগাছা এঁকে যায়আদিম কৃষি-রেখা। আমার সব বোঝাপড়া বালুর কঙ্কাল হয়েদাঁড়িয়ে থাকা লোকটির সাথে, মৃত্যুর আগে কবরখানায়যার জন্য ঘুণপোকারা এঁকেছিল হৃদয়ের আকৃতি।

Advertisement

সময়ের শুকনো অস্থিতে দিন ফুরিয়ে আসে দ্রুত—কেমনদম বন্ধ বন্ধ লাগে। সাদা চুল, রক্তে ভেজা বাতাসে ধুয়ে যায়পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি, কাঁচা ধানের সৌরভ, চেনা পথটাওকেমন অচেনা হয়ে যায়—ভ্রূ কুঁচকে অরণ্যের গহীনে।বনে বাঘের চিহ্ন দেখে সোনা-দানা, সম্পদ ফেলে যায় লুটেরা।আকাশের সুতো ছিঁড়ে তারারা ঝরে পড়ে—শূন্যে শূন্যে ধাক্কা লেগে পুরো দুনিয়া জ্বলে-পুড়ে চেঁচিয়ে ওঠেমহাবিশ্ব, ভেঙে পড়ে ভেঙে যায় ভেতরটা—ভেঙে যায়স্বপ্নের সমারোহ। জলের আয়নায় ঘোলা করেএভাবেই বদলে যায় পৃথিবী।এ সংসারে বহু মানুষের ছদ্মনাম—বেদনা।এ সংসারে বহু মানুষ সারাটা জীবন ঋষি হয়ে খুঁজে বেড়ায়শান্তি—একটুখানি শান্তির পরশ। বিনিময়ে বন্দি পাখিরা পৃথিবীরকান্না চোখে নিয়ে উড়ে যায়।আমার সব বোঝাপড়া তো পৃথিবীর সাথে।

****

ছুঁয়ে যায় মায়াজাল

পোড়াদিঘির ধারেছায়া পেছনে দাঁড়িয়ে,চোখগুলো কেমন ভীত—কীভাবে আটকাবোআমার নশ্বর ঘোলাটে ছায়া—অনন্ত দীক্ষার দ্বারে,যে পিছু নেয় অবিরত।

জনারণ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে,কৈলাশ টিলার করতলে নেমেএতদূর এলাম—বেদনা-বিধুর মরণারণ্যে;

Advertisement

মরণের কবচ খেয়েশত আলোকবর্ষে পুড়ে,মহাকাশ ভেঙে এখনো—আছড়ে পড়ি নীল জলারণ্যে।

বিনাশের পদরেখা টেনেতীরে ফিরে সর্বনাশী ঢেউ,ব্রহ্মাণ্ডের জ্বালামুখে দাঁড়িয়ে—মৃত মমির কণ্ঠে নীল তিমি ডাকে,অতল দুঃখ তুমুল।

ঝাউবনের বুক ঘেঁষে ভুবন উল্টেজাগে অতলান্ত নীল, জাগে জোয়ার।বিদায়, বিদায় বলে,চোখ লাল করে—অন্তর্জাগরণ করতে করতেউড়ে যায় নির্বাণ চিল।

ছুঁয়ে যায় মায়াজাল,ছুঁয়ে যায় নক্ষত্র,ছুঁয়ে গেলে নির্বস্তুতা—নক্ষত্রপুত্র ছাড়া আমায়দেখার আর কেউ নেই।

****

বাহান্নটা বকুলের নীরবতা

জ্বলতে জ্বলতে চোখ কচলে ব্রিজের পাঁজর থেকেবাহান্নটা এলোমেলো বকুল নীরবে ঝরে,নীলিমার যমজ চোখে তাকিয়ে ফোটে অন্ধকার,নির্জনতা আসে একা লঙ্কা বনে সংগোপনে।উত্তরের হাওয়া কেটে বৃক্ষ বেয়ে নামে রৌদ্রের চুল,দুঃখের কাঁটা বনে—মীন পতঙ্গের হিম মুদ্রাগুলোদেখো না কতটা মিহি, শোকাহত।বিষণ্ন বেদুইন প্রেম ত্রুশবিদ্ধ করে বুকেঘুমায় রাতের তারা—আর কতটা খুন, নিস্তব্ধ হবে নিশীথে।ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকতে ডাকতে একবার সরে আসেকাছে, একবার সরে যায় দূরে—ফাল্গুনের জীবন্ত দৃশ্যগুলো পুড়িয়ে বিমূর্ত শিল্পীরাচলে যায় মৌনতার মেট্রোপলিটন থেকে।তুলির আঁচড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক বেলুন যতই উড়ে দূরে যাক,পলাতক পাথরের কাছে—কাছে থাকার সাধ নিয়ে;আত্মকেন্দ্রিক চাঁদ ফুটো করে মধ্যরাতে তুরাগনদীর মুখে মুখ লুকিয়ে আসে হ্যাজাক প্রাইভেসি,হ্যালুসিনেশনের আঁকাবাঁকা পান্থপথে—চোখ কচলে কচলে ব্রিজটা জ্বলে গেলেনীলিমার বাগান থেকে বাহান্নটা এলোমেলো বকুলনিয়ে নির্জনতার বাল্যকাল একাই যায় লঙ্কাবনে।

****

কোথাও আলো পড়ে না, কোথাও ভোর হয় না

প্রতিদিন খবরের কাগজে, রাস্তায় চোখে পড়েঅযথা হট্টগোল, ট্রাফিক জ্যাম, শ্রমিকের পিঠে ধকলের ঘাম।রাজনীতির দৌড়ঝাঁপে প্রতিদিন ভাঙে, নষ্ট হয় নাগরিক ভালোবাসা-শৃঙ্খলা।প্রতিদিন ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কমে যায় আপনজনের ওপর আদর, আস্থা।

প্রতিদিন জুতা সেলাই করতে করতে মুচকি হাসে মুচি,দিনশেষে কালো ধোঁয়ায় চোখ কচলে মরে যাওয়া শহরের বাতাস,ডাস্টবিনের পচা উচ্ছিষ্ট খেয়ে পথশিশুর মতো ঘুমাতে যায় বিষণ্ন পৃথিবী।

বিদেশে বাহিরের আমি স্বচ্ছ, নিখুঁত, স্যুট-টাই পরা পরিপাটি,ভেতরের আমি অন্তঃসারশূন্য, ধারালো—হিংস্র ঠান্ডা হাসির আততায়ী;যেমন আল্পস পর্বতমালায় বিধ্বস্ত বিমানের যাত্রীরাজীবন বাঁচাতে হয়েছিল বিখ্যাত মানুষখেকো মাংসাশী।

অস্থিরতার কালো ক্লেদে আটকে পড়ে,স্বদেশে—বিদেশে,কোথাও আলো পড়ে না, কোথাও ভোর হয় না।সরে না ঘন অন্ধকার; খোল—অলক্ষী কাক,চিৎকার করে লালসার ডাক—অচিন্ত্য।পাখির ডাকে মুখরিত ভোর, শান্তি—শান্তি কোথায়মহাশূন্যের শূন্যতলে নাকি জন্ম জোসনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

এসইউ