সাহিত্য

ছোটগল্প ‘দাফন’: দায়বদ্ধতা ও সমাজ বাস্তবতা

মাসুমুর রহমান মাসুদ

Advertisement

‘দাফন’ গল্পটি সমসাময়িক মনস্বী কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল (জ. ১৯৬০) রচিত রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার অনুষঙ্গে গভীর অনুভূতি উপস্থানের আখ্যান। দেশের প্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক সংবাদের ‘স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা-২০২৬’-এ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শমসের আলির জীবনের খণ্ডিত সময়ের কথা সংক্ষিপ্ত পরিসরে উঠে আসে। বাম হাত প্যারালাইজড ও বাম পা অচল একজন মুক্তিযোদ্ধার বেঁচে থাকার লড়াই এবং সংকটপূর্ণ জীবনের এমন এক অবস্থা বর্ণিত হয়েছে; যেখানে আলোকিত দিনগুলো যেন ঢাকা পড়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।

দেশের কোথাও তার নামে একখণ্ড জমি নেই, ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে দিন গুনছেন। লেখক বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘ভোরের আলো মনে হচ্ছে আটকা পড়ে আছে কুয়াশার চাদরে।’ এই মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী রাহেলা বেগম। স্বামীর এই অসহায় ও দুঃসময়ে পাশে থেকে সেবা-যত্ন করে যাচ্ছেন আপ্রাণ। অর্থনৈতিক সংকটে আগামী দিনের স্বপ্নের অস্তিত্ব যখন হারিয়ে যায়, মানুষ তখন জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং বেঁচে থাকার ইচ্ছেও কমে যায়। একমাত্র মৃত্যুই তার কাম্য বস্তু হয়। হুইল চেয়ার নিয়ন্ত্রণে অক্ষম শমসের আলির ব্লাডার নিয়ন্ত্রণক্ষমতাও কমে গেছে। তলপেটে ব্যথা হচ্ছে। এমন রোগাক্রান্ত, একসময়ের সাহসী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শমসের আলি ভবিষ্যতের ভালো কোনো সম্ভবনা দেখতে না পেয়ে মৃত্যু পথযাত্রী। তাঁর সামনে ভেসে ওঠে ‘একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় দাফনের সম্মান জানানোর দৃশ্য।’ জীবিত থাকতে যিনি মাথা উচুঁ করে বাঁচতে পারছেন না, মৃত্যুর পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো, কেবলমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। এমন প্রাণহীন জীবনে স্ত্রীর ভালোবসাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

দুই১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বিশ্বমানচিত্রে খচিত হয় বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ড চিত্র। বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ ও উন্নত এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। বেঁচে ফিরবেন এমন কল্পনাও অনেক মুক্তিযোদ্ধার ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ ও সরকারের নিকট থেকে তেমন কিছুই পায়নি। অবশ্য বিনিময় পাবেন, এমন ইচ্ছেও তাদের কখনোই ছিল না। তবুও দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দেশের এবং দেশের জনগণেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। জীবন বাজী রেখে যারা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন; তাদের প্রতি অবহেলা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

Advertisement

এই শমসের আলির মতো মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলে, তাদের চেতনাকে পুঁজি করে অনেকেই রাজনীতি অব্যাহত রেখেছেন। আগামী দিনগুলোতেও এই ধারা চলমান থাকবে। গল্পে উঠে আসে এমন চিত্র। স্বার্থ চরিতার্থ করতে নির্বাচনের সময় এবং বিভিন্ন সুবিধাজনক সময়ে অনেক রাজনীতিকই তাঁর নিকট এসেছেন। স্বার্থসিদ্ধি হওয়ার পর আবার কেটে পড়েছেন। দুঃসময়ে কেউ কারো পাশে থাকে না। লেখক বিষয়টিকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন, ‘সুদিনে সবাই এসেছে, নানা তদ্বির নিয়ে এসেছে এলাকার নেতারাও। দোয়া নিতে এসেছে সবাই। দুঃসময়ে কেউ নেই।’ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীও সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী। স্বামীকে সে সাহস জোগায়। উন্নত চিকিৎসা পাওয়া শমসের আলির হক বলে সে মনে করে। শুধু শমসের আলি কেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকেরই সঠিক ও উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

আরও পড়ুনউৎসব ও মেলার বাংলা: ঋতুর আবর্তে মানুষের মিলন 

দেশে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যেসব বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রচলিত রয়েছে; সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বিনা মূল্যে কিছু কিছু রোগের সেবা দেওয়া হলেও মরণ ব্যাধির ক্ষেত্রে সেসব অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। আবার বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার কিছু ফি মওকুফ পাওয়া গেলেও সেসব প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময় সাপেক্ষ। চিকিৎসার জন্য নগদ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলেও সেগুলো পেতে যে পথ অতিক্রম করতে হয়, তা পরিবারের সদস্যদের পক্ষে অনেকাংশেই অসুবিধাজনক।

তিনকথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল পেশায় মনোচিকিৎসক। কর্মজীবনে হাজার-হাজার মানুষের চিকিৎসা দিয়েছেন। পড়ে নিয়েছেন সেসব বহুবিচিত্র মানুষের মনের কথা। আর সেই কথাগুলো শব্দের শক্তিমান দ্যোতনায় তুলে ধরেছেন কথাসাহিত্যের পরতে পরতে। ‘দাফন’ গল্পে মুক্তিযোদ্ধা শমসের আলির মেয়ে সানজানা, ঢাকায় থাকে। পার্টটাইম জব নিয়েছে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে। সেখানে পিতার চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলেছে। সবাই তার পিতাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছে। এ বিষয়ে স্বামীকে আশ্বস্ত করে স্ত্রী রাহেলা। মেয়েটি তার শ্রেণিবন্ধু সম্রাটকে নিয়ে গ্রামে আসে পিতাকে শহরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু গ্রামের পথে দূরত্ব রেখে হাঁটার পরামর্শ দেয় তেজস্বী মনোবলের সানজানা। না হলে দুর্নাম ছড়াবে মুক্তিযোদ্ধার মেয়ের নামে। কথাসাহিত্যিক বলেন, ‘এটা গাঁয়ের রাস্তা, দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাক। বেশি কথা বাড়াসনে আর। শেষে নানা কুৎসা রটে যাবে। গ্রামের রোকে বলে বেড়াবে, শমসের আলি কমান্ডারের মেয়ে বেগানা পুরুষ ধরে নিয়ে এসেছে! নষ্ট হয়ে গেছে!’ বাক্যগুলো পাঠের পর যে কারো মনে হবে গ্রামের চিরায়ত এসব বানিয়ে বানিয়ে বা বাড়িযে বলা মানুষগুলোর কথা।

পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন (১৯০৩-১৯৭৬) তাঁর ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (১৯২৯) কাহিনিকাব্যে দেখিয়েছেন, পল্লিগ্রামে এমন কুরটনার জন্য কিছু মানুষ থাকে। তারা তিলকে তাল করে দেয়। যা ঘটেনি তাও বানিয়ে বলে ঘটনাকে অঘটনে পরিণত করে। সেখানে নায়ক রুপাই ও নায়িকা সাজু। তাদের সম্পর্কে গাঁয়ের এক বুড়ি রুপাইয়ের মাকে জানায়, ‘ও-পাড়ার ও ডাগর ছুঁড়ী, শেখের বাড়ির ‘সাজু’,/ তারে নাকি তোর ছেলে সে গড়িয়ে দেছে বাজু।’ রুপাইয়ের মাও সেই বুড়ির কথার পাল্টা জবাব দেয়। কারণ সেও একজন নারী। মা বলে, ‘রুপা আমার এক-রত্তি ছেলে,/ আজও তাহার মুখ শুঁকিলে দুধের ঘিরাণ মেলে।/ তার নামে যে এমন কথা রটায় গাঁয়ে গাঁয়ে,/ সে যেন তার বেটার মাথা চিবায় বাড়ি যায়ে।’

Advertisement

একইভাবে কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার (জ. ১৯৫৩) তাঁর আলাওল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘প্রতিমা উপাখ্যান’ (১৯৯২)-এ মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আবহমান সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন। এতে রূপবতী ব্রাহ্মণকন্যা প্রতিমা এবং গরিব চাষিপুত্র আহমেদ বিএসসির কথিত প্রেমকে ঘিরে কাহিনি আবর্তিত হয়। তাদের প্রেমের বিষয়টি গ্রামে বিষবৃক্ষের মতো যে ডালপালা ছড়ায়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশের সমাজ-বাস্তবতার পটভূমিতে মধ্যবিত্ত এক হিন্দু পরিবারকে কেন্দ্রে রেখে রচিত এ উপন্যাসে মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপন্নতাবোধ। মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু চেতনা নিয়েও নিজ পরিবারের দেশত্যাগের ট্র্যাজেডি রুখতে ব্যর্থ হয় প্রতিমার ভাই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা রণজিৎ। যার পরম বন্ধু ছিল আহমেদ। অথচ প্রতিমা ও আহমেদ বিএসসির প্রেমের কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনা, প্রমাণ কিছুই পায়নি গ্রামের লোকজন। তবুও কুরটনার শেষ নেই। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির উত্থান হয়, সেই শক্তির নিকট মুক্তিযোদ্ধা রণজিতের পরিবার ধরাশায়ী হয়। অপবাদ দিয়ে প্রতিমার পরিবারের ভিটে-মাটি দখল করে নেয়। দেশত্যাগে বাধ্য হয় প্রতিমার পরিবার।

আরও পড়ুনআধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা 

চার‘দাফন’ গল্পে মুক্তিযোদ্ধা শমসের আলির মেয়ে সানজানা গ্রামে পৌঁছে বাবাকে শহরে নেওয়ার ইচ্ছে আর পূরণ হয় না। গাঁয়ের মেঠোপথে সে হাঁটতে থাকে নিজের বাড়ির দিকে। ‘ঘাসের সবুজ কার্পেটে এভাবে বসে যায় দাগ। জীবন চলবেই। দাগও বসবে। জানে সানজানা। জানা বাস্তবতা নিয়ে আবার তাকাল আকাশের দিকে, তাকিয়েই রইল।’ সে বিউগলে সানাইয়ের সুর শুনে আর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মুক্তিযোদ্ধা শমসেরের লাশ দাফনের চিত্র দেখতে পায় কল্পনায়। তার মনে প্রশ্ন জাগে ‘এই শূন্যতা কি আর পূরণ হবে এক জীবনে?’ ক্রমশ তা মিলিয়ে যায় আকাশের শূন্যতায়।

এভাবে নিভে যায় একজন মুক্তিযোদ্ধার বেঁচে থাকার আলো। এই আলো নিভে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান আমাদের করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা যেমন আছে; ঠিক তেমনই রাষ্ট্রে বসবাসকারী মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি প্রতিটি নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। বৈষম্য দূর করে সবার জন্য বসবাস উপযোগী সমাজ তথা রাষ্ট্র গঠন এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা, চান্দিনা, কুমিল্লা।

এসইউ