একটা সময় ছিল যখন ঘরের মাঠে বাংলাদেশের বোলিং মানেই ছিল ‘স্পিন।’ এক ঝাঁক স্পিনারকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো টিম বাংলাদেশের বোলিং শক্তি। হোক তা টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি—ঢাকা স্টেডিয়াম, শেরে বাংলা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া, সিলেট আর ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম। বাংলাদেশের অগণিত ম্যাচ জয়ের রূপকার স্থপতিই ছিলেন একঝাঁক স্পিনার—এনামুল হক মনি, মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসান, আরাফাত সানি, ইলিয়াস সানি, মানজারুল রানা, এনামুল জুনিয়র আর সোহরাওয়ার্দী শুভরা। তাদের হাত ধরেই বহু ম্যাচ জিতেছে টাইগাররা।
Advertisement
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার আগে সেই আশির দশকের মাঝামাঝি জিএম নওশের প্রিন্স, নাজমুল হোসেন শান্ত, আনিসুর রহমান আর সাইফুল ইসলাম ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটে পেসারের সংখ্যাই ছিল হাতে গোনা।
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর মঞ্জুরুল ইসলাম, মাশরাফি বিন মুর্তজা, শাহাদাত হোসেন রাজিব, মোহাম্মদ রুবেলরা উঠে আসলেও বোলিং ‘ট্রাম্পকার্ড’ বলতে মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসানকেই বোঝানো হতো। তারাই থাকতেন ম্যাচ জয়ের নায়ক।
২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচটিতে তিন তরুণ তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম আর সাকিব আল হাসানের ফিফটিতে ভারতের রান টপকে যাওয়া সম্ভব হলেও ঐ তিন অর্ধশতকই শেষ কথা নয়। সে ম্যাচে পেসার মাশরাফি (৩/৩৮), আর দুই স্পিনার রাজ্জাক (৩/৩৮) ও রফিকের (৩/৩৫) অবদানও অনেক বেশি। একইভাবে ঐ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে সুপার এইটের লড়াইয়ে মোহাম্মদ আশরাফুলের অসাধারণ ব্যাটিং শৈলী (৮৩ বলে ৮৭) জয়ের ভিত রচনা করলেও জয় ধরা দেয় তিন স্পিনার—রাজ্জাক (৩/২৫), রফিক (১/২২), আর সাকিবের (২/৪৯) ঘূর্ণিতে।
Advertisement
ধীরে ধীরে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের আগে দিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান এবং তার পরপরই তাসকিন আহমেদের অন্তর্ভুক্তির পর থেকে স্পিন নির্ভরতা অনেকটা কমে আসতে থাকে। মাশরাফির পাশাপাশি রুবেল, শাহাদাত রাজিব, তাসকিন ও মোস্তাফিজরাও হয়ে ওঠেন আশার প্রদীপ।
এরপর যত সময় গড়িয়েছে ততই বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের মান দিনকে দিন উন্নত হয়েছে। স্পিন নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পেসারদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। আর ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশের পেসাররাই হয়ে ওঠেন বোলিংয়ের মূল চালিকাশক্তি।
দেশের বাইরে পেসারদের বোলিং কার্যকারিতা বাড়তে থাকে। পেসাররা প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের চোখে চোখ রেখে বল হাতে বারুদ ঝড়াতে শুরু করেন। পাশাপাশি ঘরের মাঠেও পেসারদের হাত ধরে সাফল্য রচিত হতে থাকে।
এই বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে এসে মার্চ ও এপ্রিলে পরপর দুই ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ সিরিজ জিতেছে মূলত পেসারদের হাত ধরে। গত মাস মার্চে পাকিস্তানের সাথে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে টাইগাররা ২-১ ব্যবধানে জয় পায় তিন দ্রুতগতির বোলার—নাহিদ রানা (৮ উইকেট), তাসকিন (৬) ও মোস্তাফিজের (৫) হাত ধরে।
Advertisement
আর সর্বশেষ নিউজিল্যান্ডের সাথে সিরিজেও মেহেদী হাসান মিরাজের দলের সিরিজ বিজয়ের মূল রূপকার দুই ফাস্ট বোলার—নাহিদ রানা ও মোস্তাফিজুর রহমান। নাহিদ রানা (৫/৩৮) আর মোস্তাফিজ (৫/৪৩) দুইদিন বল হাতে আগুন ঝড়ান। সে আগুনে পুড়ে ছারখার কিউই ব্যাটিং।
প্রশ্ন উঠতে পারে, নাহিদ রানা আর মোস্তাফিজের কথা শুধু বলা কেন? শরিফুলও তো কম যাননি। প্রথম ম্যাচে এ বাঁহাতি ফাস্ট বোলারও তো ৪ উইকেট দখল করেছেন। কিন্তু সে ম্যাচে দল জেতেনি। তাই বলে শরিফুলের বোলিং দক্ষতা ও কারিশমাকে খাটো করে দেখার কোনোই উপায় নেই। সে ম্যাচে ব্যাটাররা ভালো করতে পারেননি। তাই দল জেতেনি।
আসল কথা হলো, পাকিস্তান আর নিউজিল্যান্ডের সাথে পরপর দুই সিরিজে একটি সত্যের দেখা মিলেছে। তা হলো, এখন ঘরের মাঠে টাইগারদের সাফল্যের অন্যতম রূপকার ও স্থপতি হচ্ছেন ফাস্ট বোলাররা। তারাই গড়ে দিচ্ছেন জয়ের ভিত। সাথে ব্যাটাররা যেদিন নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকমতো পালন করেছেন, সে দুই দিনই জয়ের হাসি নিয়ে মাঠ ছেড়েছে মিরাজের দল।
প্রথম ম্যাচে শরিফুল ৪ উইকেট দখল করলেও কিউইদের করা ২৪৭ রান টপকানো সম্ভব হয়নি। কারণ সে ম্যাচে ব্যাটিং ভালো হয়নি। একজনও দায়িত্ব নিয়ে বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। তাই ২৬ রানের পরাজয় সঙ্গী হয়।
দ্বিতীয় খেলায় নাহিদ রানা একাই কিউই ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দিলে টম ল্যাথামের দল থেমে যায় ১৯৮ রানের মামুলি সংগ্রহে। তানজিদ তামিম আর নাজমুল হোসেন শান্ত জোড়া হাফ সেঞ্চুরি উপহার দিলে বাংলাদেশ পায় ৬ উইকেটের অনায়াস জয়। খেলা শেষ হয় ৮০ বল আগে।
চট্টগ্রামে শেষ ম্যাচেও ঘটলো তাই। তবে এদিন প্রথম অংশেই নাজমুল হোসেন শান্তর অনবদ্য শতক (১১৯ বলে ১০৫), লিটন দাস (৯১ বলে ৭৬) আর তাওহিদ হৃদয় (২৯ বলে ৩৩*) ব্যাট হাতে জ্বলে উঠে ২৬৫ রানের লড়াইযোগ্য পুঁজি গড়ে দলকে এগিয়ে দেন অনেকটা পথ। পেসার মোস্তাফিজ (৫/৪৩) শেষ অংশে ৫ কিউইকে সাজঘরে ফেরত পাঠিয়ে দলকে ৫৫ রানের জয় উপহার দেন।
সব মিলিয়ে পেসার আর ব্যাটারদের যৌথ প্রচেষ্টায় সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। এই দুই সিরিজে পরিষ্কার হয়েছে, স্পিনারদের এখন আর প্রধান ভূমিকা নেওয়ার দরকার নেই। অধিনায়ক মেহেদি মিরাজ, রিশাদ হোসেনরা সহায়ক ভূমিকা পালন করলেই চলে।
তবে ফাস্ট বোলার, বিশেষ করে নাহিদ রানা, মোস্তাফিজ, তাসকিন আর শরিফুলরাই বল হাতে সাফল্যের ভিত গড়ে দিয়েছেন। সাথে ব্যাটাররা জ্বলে উঠলেই ধরা দিয়েছে সাফল্য।
ওপরে আলোচনা, তথ্য-উপাত্ত আর ছোট পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার—দেশের মাটিতেও এখন বাংলাদেশ পেসারদের হাত ধরেই জিততে পারে। ফাস্ট বোলাররাও এখন জয়ের ভিত রচনা করতে পারেন। সাথে ব্যাটারদের জ্বলে ওঠা—বিশেষ করে দুই ওপেনারের অন্তত একজন এবং তিন থেকে ছয় নম্বরে নামা অন্তত দুইজনের ব্যাট কথা বললেই সেদিন প্রতিপক্ষ নাস্তানাবুদ হয়, জেতে বাংলাদেশও।
এআরবি/এমএমআর