মাহতাব উদ্দিন আহমেদ
Advertisement
যখন কোনো কোম্পানি আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন সাধারণত পরিকল্পনার পেছনের যুক্তিই প্রথমে বলির শিকার হয়। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বাজেট পর্যালোচনার ঘোষণা দেন। অর্থ বিভাগ করুণ সব চিত্র নিয়ে হাজির হয়। তারপর প্রতিটি বিভাগ তাদের আবেগঘন উপস্থাপনা দেওয়া শুরু করে। বিপণন বলে, যেকোনো ধরনের কাটছাঁট ব্র্যান্ড, বিক্রি ও সম্ভবত জাতীয় মনোবলকেও ধ্বংস করে দেবে। অপারেশন বিভাগ জোর দিয়ে জানায়, এক টাকা কমে গেলেও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। মানবসম্পদ বিভাগ সতর্ক করে দেয় যে, এতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং কর্মীরা দুপুরের খাবারের আগেই তাদের লিংকডইন প্রোফাইল আপডেট করা শুরু করবে। প্রতিটি বিভাগের বাজেট কেন অলঙ্ঘনীয়, সে বিষয়ে তাদের থেকে ১০০টি করে কারণ শোনার পর, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রায়শই করপোরেট ইতিহাসের সবচেয়ে অলস সমাধানের দিকে যায়: সবাই সমান কাটছাঁটের শিকার হবে। সবার জন্য এক সমাধান। কৌশলের ভান করে শ্রেফ অঙ্কের ব্যবহার।
বাংলাদেশও জ্বালানি নীতিতে অনুরূপ কিছু করার ঝুঁকি নিচ্ছে। ইরান ঘিরে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, আর সবচেয়ে সহজ রাজনৈতিক সমাধান হলো সবার জন্য জ্বালানির দাম সস্তা রাখা। এটি শুনতে সহানুভূতিশীল মনে হয়। স্পষ্ট সিদ্ধান্তমূলক লাগে। কিন্তু এটি গভীর অলসতাও বটে, যদি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়- কোন জ্বালানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোনটির ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে ও কোনটির চাহিদা প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব। বাংলাদেশের উচিত মানুষকে রক্ষা করা, জ্বালানির দাম নয়।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। যে ডিজেল সেচ, পণ্য পরিবহন, বাস ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখে আর ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহৃত পেট্রোল এক নয়। তারপরও সব জ্বালানিতে ঢালাও ভর্তুকি নৈতিকভাবে সমান বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু তা তো নয়। একজন কৃষক, একজন বাসচালক ও একজন বিলাসবহুল এসইউভি গাড়ির মালিকের রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান উদারতা পাওয়া উচিত নয়। পণ্যে ভর্তুকি দেবেন না। ব্যবহারকারীকে ভর্তুকি দিন।
Advertisement
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরও একটি বিপদ রয়েছে। যখন অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে সীমান্তের ওপারের তুলনায় সস্তা রাখা হয়, তখন সেই ভর্তুকি খুব বেশিদিন উপহার হিসেবে থাকে না। এটি পাচার হতে শুরু করে। যখন ভর্তুকির তেল গোপনে সীমান্ত পার হয়ে যায়, তখন ঢালাও জ্বালানি ভর্তুকি সামাজিক সুরক্ষার কারণ না হয়ে চোরাকারবারিদের পাচার বৃদ্ধি করে। সেটি কোনো সঠিক অর্থনীতি নয়। বরং এটি আত্মপ্রবঞ্চনার এক অত্যন্ত ব্যয়বহুল রূপ।
সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ হলো কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ। যদি কিছু সহায়তা বজায় রাখতেই হয়, তবে সেটি সে জায়গাগুলোতেই কেন্দ্রীভূত করা উচিত যেখানে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। গণপরিবহন, কৃষি, পণ্য পরিবহন, মৎস্য খাত ও জরুরি সেবাগুলোতে ব্যবহৃত ডিজেল অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ঐচ্ছিক ভোগের জন্য ব্যবহৃত পেট্রোল এবং অকটেন সমান সুরক্ষা পাওয়ার দাবি রাখে না।
কিন্তু বাংলাদেশের এমনকি এক বিশাল নীতিগত সুযোগ রয়েছে, যা অনেক দেশেরই নেই। এর গ্যাস আছে। বাংলাদেশের এই সুযোগ হারানো উচিত হবে না। যেখানে জ্বালানি সংকটের মুখে থাকা অনেক দেশেরই স্বল্পমেয়াদি বিকল্প ব্যবস্থা সীমিত পরিসরে রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের এরই মধ্যে একটি সিএনজি ইকোসিস্টেম আছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলকে কৃত্রিমভাবে সাশ্রয়ী রাখার পরিবর্তে সরকারের উচিত বাস, তিন-চাকার যান, সরবরাহ যান ও বাণিজ্যিক ব্যবহারকারী- যারা সিএনজিতে রূপান্তরিত হতে চায় বা এতে আছে- তাদের জন্য গ্যাসের অর্থনৈতিক সুবিধাকে রক্ষা এবং আরও শক্তিশালী করা।
ঠিক এখানেই চাহিদাকেন্দ্রিক কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত জ্বালানি ভর্তুকি হলো সেটি, যা নীরবে জ্বালানির চাহিদা কমিয়ে আনে। জ্বালানি সংকটের মুখে থাকা দেশগুলো প্রায়ই শুধু দাম চেপে রাখার ওপর নির্ভর করে না। সেই সঙ্গে তারা উন্নত পণ্য পরিবহন পরিকল্পনা, অপ্রয়োজনে যান চালু না রাখা, রুট উত্তমভাবে সাজানো, রাইড-শেয়ারিং, দক্ষ গণপরিবহন, কোভিডের দিনগুলোর মতো বাসা থেকে অফিস ও স্কুল পরিচালনা এবং যেখানে সম্ভব সেখানে বিকল্পের ব্যবহারের মাধ্যমেও জ্বালানি ভোগ কমিয়ে আনে। বাংলাদেশও একই কাজ করতে পারে।
Advertisement
সরাসরি সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও কোনো রহস্যময় বিষয় নয়। একটি বাস কোম্পানি বাজারদরে জ্বালানির দাম পরিশোধ করতে পারে, কিন্তু সিএনজিভিত্তিক জ্বালানির ক্ষেত্রে নয়। এই যাচাইকৃত ডাটাবেজ বিআরটিএর কাছে রয়েছে। সেচ রেকর্ডের ভিত্তিতে কৃষকরা মৌসুমি সহায়তা পেতে পারেন। মৎস্যজীবী এবং পণ্য পরিবহনকারীরা অডিট হওয়া চাহিদার ভিত্তিতে ডিজিটাল ভাউচার অথবা সরাসরি ব্যাংক/এমএফএস লেনদেনের মাধ্যমে সহায়তা পেতে পারেন। নিম্ন আয়ের যাত্রীদের পরিবহন সহায়তার মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া যেতে পারে। এভাবেই নীতি অপচয়কে উৎসাহিত করা বন্ধ এবং প্রয়োজনীয়তাকে সুরক্ষা দেওয়া শুরু করতে পারে।
সংক্ষেপে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অভিঘাত লাঘবে বাংলাদেশকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে কৌশলের মাধ্যমে, আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। সব ব্যবহারকারীর মধ্যে বাছবিচার ছাড়াই সহায়তা বিলানো কাগজে-কলমে ন্যায়সঙ্গত মনে হতে পারে, তবে বাস্তবে, এটি সাধারণত সহমর্মিতার মুখোশ পরা এক ধরনের নীতিগত আলস্য।
লেখক: বিল্ডকন কনসালটেন্সি লিমিটেড এবং বিল্ডনেশনস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা।
(লেখাটি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ইংরেজি থেকে অনূদিত)